কর-জিডিপি অনুপাতে এশিয়ায় সবার পেছনে বাংলাদেশ
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক:

 

ভ্যাটের হার বাড়ালেই কি সরকারের আয় বাড়বে? বাংলাদেশের বাস্তবতা বলছে, শুধু করহার নয়, করের আওতা, করছাড় ও প্রশাসনিক দক্ষতাও রাজস্ব আদায়ে বড় ভূমিকা রাখে। ১৫% ভ্যাটহার, তবু রাজস্ব আদায়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত নেমে আসে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সাময়িক হিসাবেও তা দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৮ শতাংশে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কর অব্যাহতির ব্যাপকতা, জটিল করকাঠামো এবং কর প্রশাসনের সীমাবদ্ধতা বাংলাদেশের রাজস্ব সংগ্রহের বড় বাধা।

আন্তর্জাতিক তুলনাতেও বাংলাদেশের অবস্থান উদ্বেগজনক। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার-ওইসিডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ছিল মাত্র ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। একই সময়ে ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় এই হার ১২ শতাংশের বেশি। ভুটানে ১৩ শতাংশের বেশি এবং নেপালে ১৬ শতাংশের বেশি। আর জাপানে এই হার ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশ।

এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কর-জিডিপি অনুপাতের গড় ছিল ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ। অন্যদিকে, ওইসিডিভুক্ত দেশগুলোর গড় ৩৪ দশমিক ১ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত আঞ্চলিক গড়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।

এ কারণে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-আইএমএফ বাংলাদেশকে ঋণ দেওয়ার আগে কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধির শর্ত দিয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে রাজস্ব ব্যবস্থা ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর সংস্কারের শর্ত। এর অংশ হিসেবে এনবিআরকে ভেঙে নীতি ও প্রশাসনকে পৃথক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ওইসিডির তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ছিল ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০১৭ সালে তা সর্বোচ্চ ৭ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত হয়। এরপর ওঠানামার মধ্য দিয়ে ২০২১ সালে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ, ২০২২ সালে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৭ দশমিক ২ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসে।

বাংলাদেশে ভ্যাটের সাধারণ হার ১৫ শতাংশ হলেও কর অব্যাহতি, বিশেষ ব্যবস্থা ও ভিন্ন করহারের কারণে সংকুচিত করভিত্তি তৈরি হয়েছে। ওইসিডির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভ্যাট-রাজস্ব অনুপাত বা ভিআরআর সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান শূন্য দশমিক ৩, যদিও গড় ভ্যাটহার ১৮ শতাংশ। একই হার থাকা আজারবাইজান ও জর্জিয়ার এই অনুপাত যথাক্রমে শূন্য দশমিক ৬ ও শূন্য দশমিক ৭৫। আর সর্বোচ্চ ভিআরআর কুক আইল্যান্ডসের, ১ দশমিক শূন্য ৮; অথচ দেশটির গড় ভ্যাটহার ১৫ শতাংশ।

বাংলাদেশে ভ্যাটের সাধারণ হার ১৫ শতাংশ হলেও কর অব্যাহতি, বিশেষ ব্যবস্থা ও ভিন্ন করহারের কারণে সংকুচিত করভিত্তি তৈরি হয়েছে। ওইসিডির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গড় ভ্যাটহার ১৮ শতাংশ হলেও বাংলাদেশের ভ্যাট-রাজস্ব অনুপাত মাত্র শূন্য দশমিক ৩। একই হার থাকা আজারবাইজান ও জর্জিয়ার এই অনুপাত যথাক্রমে শূন্য দশমিক ৬ ও শূন্য দশমিক ৭৫।

বিশ্বব্যাংকের নথি অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশে আয়কর, ভ্যাট ও শুল্কসহ সব ধরনের করছাড়ের আনুমানিক আর্থিক মূল্য ছিল জিডিপির ৬ দশমিক ৯ শতাংশ।

বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক লেনদেননির্ভর হওয়ায় ক্ষুদ্র ব্যবসা, নগদ লেনদেন ও সেবা খাতের অনেক কার্যক্রম করের আওতার বাইরে থেকে যায়। বিক্রির তথ্য গোপন, চালানে অসংগতি ও অনিবন্ধিত ব্যবসাও ভ্যাট আদায়ে বাধা তৈরি করে।

ওইসিডির প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ভ্যাট ঘাটতি আদায় করা রাজস্বের প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভ্যাট প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তর, করছাড় যৌক্তিকীকরণ এবং করনীতি ও কর আদায়ের দায়িত্ব পৃথক করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

ভ্যাটের হার বাড়ালে সাধারণ ভোক্তা, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের ব্যয় বাড়তে পারে। তাই করের আওতা সম্প্রসারণ, অপ্রয়োজনীয় করছাড় কমানো, ডিজিটাল চালান ও রিটার্ন ব্যবস্থা কার্যকর করা এবং কর প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা কাটাতে শুধু ভ্যাটের হার বাড়ানো যথেষ্ট নয়। বরং করজাল সম্প্রসারণ, অপ্রয়োজনীয় করছাড় কমানো এবং কর প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। অর্থনীতির সম্ভাব্য রাজস্বের কতটা সরকারি কোষাগারে আনা যাচ্ছে, সেটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

—জা. অর্থনীতি/এলএটি