জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক:
পুরুষেরা কেন নারীদের চেয়ে কম দিন বাঁচেন? আপনি হয়তো ভাবছেন ধূমপান, অতিরিক্ত মানসিক চাপ কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ জীবনযাপনই এর একমাত্র কারণ। কিন্তু জেনে অবাক হবেন, আসল সত্যিটা লুকিয়ে আছে আমাদের শরীরের একেবারে গভীরে-আমাদের রক্তের কোষে! বিজ্ঞানীরা এখন পুরুষের আয়ু কম হওয়ার পেছনে এমন এক অদৃশ্য কারণ খুঁজে পেয়েছেন, যা হয়তো আপনি কল্পনাও করেননি। আর তা হলো-পুরুষের শরীর থেকে অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্রোমোজোম হঠাৎ গায়েব হয়ে যাওয়া!
হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কিভাবে একটি পুরো ক্রোমোজোম শরীর থেকে হারিয়ে যেতে পারে? আর এই ক্রোমোজোম হারিয়ে গেলেই বা কেন পুরুষদের আয়ু আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়?
সাধারণভাবে মানুষের শরীরে এক জোড়া যৌন ক্রোমোজোম থাকে। নারীদের দুটি X ক্রোমোজোম, আর পুরুষদের একটি X এবং একটি Y ক্রোমোজোম। এতদিন ভাবা হতো Y ক্রোমোজোমের কাজ শুধু পুরুষের লিঙ্গ নির্ধারণ করা। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বিজ্ঞানীদের এই ধারণা পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক পুরুষের রক্তের কিছু নির্দিষ্ট কোষ থেকে এই Y ক্রোমোজোম হারিয়ে যেতে শুরু করে। যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় 'মোজাইক লস অব ওয়াই ক্রোমোজোম' বা mLOY।
কিন্তু সত্যি কি শুধু বয়স বাড়লেই এই ক্রোমোজোম হারিয়ে যায়? এখানে লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ চমক। ৭০ বছরের বেশি বয়সী পুরুষদের প্রায় ৪০ শতাংশের বেশি মানুষের রক্তে Y ক্রোমোজোম হারানোর এই প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, ধূমপানের মতো মারাত্মক অভ্যাস এই Y ক্রোমোজোম হারিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়!
তবে আসল ধাক্কাটা এখানে নয়, আসল রহস্য তো আরও গভীর। শরীর থেকে অতি ক্ষুদ্র একটি ক্রোমোজোম হারিয়ে গেলে পুরুষের বেঁচে থাকায় ঠিক কী প্রভাব পড়ে? একসময় ভাবা হতো এটি তেমন ক্ষতিকর কিছু নয়। কিন্তু গত এক দশকের গবেষণায় চোখ কপালে ওঠার মতো তথ্য উঠে এসেছে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, রক্তের কোষে Y ক্রোমোজোম হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে হৃদ্রোগ, ক্যানসার এমনকি আলঝেইমারসের মতো মারাত্মক সব রোগের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে!
২০২২ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, রক্তে Y ক্রোমোজোম হারিয়ে গেলে হৃদযন্ত্রের কার্যকারিতা ভীষণভাবে কমে যায় এবং টিস্যুতে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে, যা পুরুষের অকালমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় বহু গুণ। শুধু তাই নয়, ২০২৩ সালের একটি বিশ্বখ্যাত গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব মূত্রথলির ক্যানসার কোষে Y ক্রোমোজোম থাকে না, সেগুলো শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে অনায়াসে ফাঁকি দিয়ে আরও অনেক বেশি আগ্রাসী হয়ে ওঠে! এমনকি আলঝেইমারস বা স্মৃতিলোপ পাওয়ার মতো জটিল মানসিক রোগের পেছনেও এই ক্রোমোজোম হারিয়ে যাওয়ার ভূমিকা রয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠতে পারে, নারীদের ক্ষেত্রে কেন এমনটা ঘটে না? কারণ, নারীদের দুটি X ক্রোমোজোম থাকে। কিন্তু পুরুষদের একটিমাত্র X এবং একটি Y ক্রোমোজোম থাকায়, Y ক্রোমোজোম হারিয়ে গেলে সেটিকে রক্ষা করার মতো বিকল্প আর কোনো জিন পুরুষের শরীরে থাকে না!
তবে পুরো গল্পের সবচেয়ে মোড় ঘোরানো সত্যটি কিন্তু এখনও বাকি! শুধু কি এই ক্রোমোজোম হারিয়ে যাওয়াকেই পুরুষের কম আয়ুর প্রধান অপরাধী বলা যায়?
বিজ্ঞানীরা বলছেন-না, বিষয়টি ততটাও সহজ নয়। বিশ্বজুড়ে নারীদের গড় আয়ু পুরুষদের চেয়ে বেশি হওয়ার পেছনে জীবনযাপন ও সামাজিক কারণও আছে। যেমন আমাদের বাংলাদেশে জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, পুরুষের গড় আয়ু যেখানে প্রায় ৭২ বছর, সেখানে নারীদের আয়ু প্রায় ৭৭ বছর। তবে ক্রোমোজোমের এই জেনেটিক পরিবর্তনকে এখন বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, এটি জেনে হয়তো ভবিষ্যতে ক্যানসার বা হৃদ্রোগের মতো মারাত্নক রোগ আগেভাগেই প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।
তাহলে এখন আমাদের করণীয় কী? বার্তাটি খুব পরিষ্কার। বয়স বাড়া রদ করা না গেলেও, ধূমপানের মতো অভ্যাস ত্যাগ করে এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন মেনে চলে এই Y ক্রোমোজোম হারানোর ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
নারীদের চেয়ে পুরুষেরা কম বাঁচেন কেন জানেন?
পুরুষেরা কেন নারীদের চেয়ে কম দিন বাঁচে? ধূমপান বা মানসিক চাপই কি এর একমাত্র কারণ? নাকি আমাদের শরীরে লুকিয়ে আছে কোনো অদৃশ্য বিপদ? বিজ্ঞানীরা বলছেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরুষদের রক্তের কোষ থেকে Y ক্রোমোজোম হারিয়ে যেতে শুরু করে। আর এই Y ক্রোমোজোম হারিয়ে গেলেই বাড়ে হৃদরোগ, আলঝেইমারস এমনকি ক্যানসারের মতো প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি! অতিরিক্ত ধূমপান এই ক্রোমোজোম হারিয়ে যাওয়ার হার আরও বাড়িয়ে দেয়। তাই দীর্ঘায়ু পেতে আজই সচেতন হন।
নারীরা বেশি বাঁচেন, পুরুষের আয়ু কমে কেন?
বাংলাদেশে পুরুষদের গড় আয়ু যেখানে ৭২ বছর, সেখানে নারীদের আয়ু ৭৭ বছর! কেন নারীদের চেয়ে পুরুষেরা কম বাঁচেন? বিজ্ঞানীদের মতে, পুরুষের লিঙ্গ নির্ধারণকারী Y ক্রোমোজোম শুধু লিঙ্গই ঠিক করে না, বরং শরীরকে নানা মারাত্মক রোগ থেকেও বাঁচায়। কিন্তু বয়স বাড়লে রক্তকোষ থেকে এই Y ক্রোমোজোম উধাও হতে থাকে, চিকিৎসাবিজ্ঞানে যাকে বলে mLOY। নারীদের দুটি X ক্রোমোজোম থাকায় তারা সুরক্ষিত থাকলেও পুরুষেরা পিছিয়ে পড়ে। তবে ধূমপান ত্যাগ ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই পারে এই জেনেটিক ক্ষতি থামাতে।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি