যুক্তরাষ্ট্র থেকে এশিয়ায় তেল পরিবহনের ভাড়া বেড়েছে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক নৌপরিবহন বিঘ্ন হওয়ায় এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামতে পারে। প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে তেল পরিবহনের জন্য একটি ট্যাংকার ভাড়া নিতে খরচ বেড়ে রেকর্ড প্রায় ৮ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের তেলের জন্য এশীয় শোধনাগারগুলোর চাহিদা কমে গেছে।

ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বরে সরবরাহের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের ক্রয়াদেশ আগের মাসের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ কমে ২ কোটি ৪০ লাখ থেকে ২ কোটি ৬০ লাখ ব্যারেলে নেমেছে। প্রকাশ্যে মন্তব্য করার অনুমতি না থাকায় ব্যবসায়ীরা নাম প্রকাশ করতে চাননি।

জাহাজ চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলার ও ভর্টেক্সার তথ্য অনুযায়ী, ক্রয়াদেশের এই ধারা অব্যাহত থাকলে তা সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন হবে।
বাল্টিক এক্সচেঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় উপকূল থেকে চীন পর্যন্ত অপরিশোধিত তেল পরিবহনে ট্যাংকার ভাড়া গত বৃহস্পতিবার প্রায় ৬ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত শুরু হওয়ার পর এই ভাড়া তিন গুণের বেশি বেড়েছে। চলতি মাসের শুরুতে ভাড়া একপর্যায়ে ৭ কোটি ৯৬ লাখ ডলারে উঠেছিল, যা নজিরবিহীন। সংঘাত শুরুর আগের পাঁচ বছরে এই রুটে ট্যাংকার ভাড়া গড়ে ৮০ লাখ ডলারের কম ছিল।

ব্লুমবার্গ  জানিয়েছে, বর্তমানে সবচেয়ে বড় আকারের অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ ৩০ দিনের জন্য ভাড়া নিতে যে অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তা দিয়ে নতুন একটি জাহাজ নির্মাণের খরচের প্রায় অর্ধেক মেটানো সম্ভব। এর সঙ্গে তেলের দাম যুক্ত করা হয়নি। অপরিশোধিত তেলের দাম এখন ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০ ডলার।
ভ্যালেরো এনার্জির র‍্যান্ডি হকিন্স এক কনফারেন্স কলে বলেন, ‘এই মুহূর্তে বাজারের মূল আলোচনার বিষয় হলো জাহাজভাড়া।’ তার মতে, জাহাজভাড়া এতটাই বেড়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় উপকূল থেকে এশিয়ায় ব্যারেলপ্রতি অপরিশোধিত তেল পরিবহনে শোধনাগারগুলোকে ৩০ থেকে ৩৫ ডলার ব্যয় করতে হচ্ছে। ২০২৫ সালে এ খরচের তুলনায় যা সাত গুণ বেশি।

তবে নভেম্বরে সরবরাহের জন্য তেল কেনাবেচার নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়াই চূড়ান্ত কোনো সময়সীমা না। ফলে শেষ মুহূর্তেও ব্যবসায়ীদের পক্ষে তেল কেনার সুযোগ রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়সীমার পরও কেনাবেচার মাধ্যমে নভেম্বরে এশিয়াগামী যুক্তরাষ্ট্রের তেলের চালান ৪ কোটি ব্যারেল বাড়তে পারে। তবে ভর্টেক্সা মনে করছে, শিগগির এমন ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা কম। ভর্টেক্সার জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক রোহিত রাঠোর বলেন, ‘চালানের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে, এমন কোনো তাৎক্ষণিক প্রমাণ আমরা দেখতে পাচ্ছি না।’

এশিয়ায় চাহিদা কমে যাওয়ার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দামেও পড়ছে। লিংক ডেটা সার্ভিসেসের তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের পারমিয়ান বেসিন থেকে রপ্তানির জন্য নির্ধারিত অপরিশোধিত তেল ম্যাগেলান ইস্ট হিউস্টন কেন্দ্রে বেঞ্চমার্ক ফিউচারস চুক্তির দামের চেয়ে ব্যারেলপ্রতি মাত্র ২৫ সেন্ট বেশি দামে বিক্রি হয়েছে। ছয় সপ্তাহ আগে এই ব্যবধান ৩ ডলারের বেশি ছিল।

এদিকে মেক্সিকো উপসাগরের গভীর সমুদ্রের কূপ থেকে উত্তোলন করা মাঝারি ঘনত্বের ও সালফারসমৃদ্ধ মার্স গ্রেডের তেলের দামও কমেছে। মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত তেলের সঙ্গে এই তেলের বৈশিষ্ট্যের মিল রয়েছে। মার্চের শেষ দিকে ফিউচারস দামের তুলনায় ব্যারেলপ্রতি ১৭ ডলার ৫০ সেন্ট বেশি দামে বিক্রি হওয়া এই তেলের মূল্য ব্যবধান কমে এখন ৬ ডলারে নেমেছে।

হকিন্স বলেন, বিশ্ববাজারে ট্যাংকার সংকটের পেছনে একটি কারণ হলো পারস্য উপসাগর থেকে তেল সংগ্রহে ছোট জাহাজের ব্যবহার বেড়ে যাওয়া। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের হামলার ঝুঁকি এড়াতে এসব ছোট জাহাজ ব্যবহার করা হচ্ছে।

প্রণালি পেরিয়ে আসার পর ছোট জাহাজগুলোর তেল ওমান উপসাগরে অপেক্ষমাণ বড় জাহাজে স্থানান্তর করা হয়। হকিন্সের ভাষায়, ‘ওমান উপসাগরে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের এই অদক্ষ প্রক্রিয়া বৈশ্বিক নৌপরিবহন ব্যবস্থার সক্ষমতা আটকে রাখছে। একই পরিমাণ তেল পরিবহনে এখন আরও বেশি ট্যাংকার প্রয়োজন হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, বিমা ব্যয় বৃদ্ধি ও জ্বালানির উচ্চমূল্যও জাহাজভাড়া বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ভর্টেক্সার রাঠোর বলেন, ‘উচ্চ জাহাজভাড়াই এখন প্রধান সমস্যা। ফলে দূরপাল্লার রুটে এক বাজার থেকে কম দামে তেল কিনে অন্য বাজারে বেশি দামে বিক্রি কঠিন হয়ে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় উপকূল থেকে তেল কেনার ক্ষেত্রে এশীয় ক্রেতাদের আগ্রহও কমে গেছে।’