নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম সুদ পাচ্ছেন, তাও ব্যাংকে টাকা রেখেছেন আমানতকারীরা। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহেও গতি না থাকায় আমানতকারীদের এই অর্থ অলস পড়ে আছে ব্যাংকে। দেশের ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য এখন ৪ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সঞ্চয়ের বিকল্প হিসেবে পুঁজিবাজার বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় ক্ষেত্র হতে পারত। কিন্তু আস্থার সংকটে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে সাড়া দিচ্ছে না মানুষ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৯ দশমিক ৪০ শতাংশ বেড়ে ৪ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। অথচ একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে আসে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে যা ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। অর্থাৎ ব্যাংকে অর্থের জোগান থাকলেও ব্যবসা সম্প্রসারণ ও নতুন বিনিয়োগের জন্য ঋণের চাহিদা দুর্বল।
অন্যদিকে শীর্ষ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর এক বছরমেয়াদি স্থায়ী আমানতের সুদের হার কমে প্রায় ৭ দশমিক ৫ থেকে ৮ শতাংশে নেমেছে। সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। ফলে কর ও অন্যান্য খরচ কাটার আগেই অনেক আমানতকারী মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম সুদ পাচ্ছেন। এতে তাদের সঞ্চয়ের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যেমন কেউ ১০ লাখ টাকা এক বছর মেয়াদে সাড়ে ৭ শতাংশ সুদে ব্যাংকে রাখলে বছরে মোট সুদ পাবেন ৭৫ হাজার টাকা। কিন্তু মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ থাকলে শুধু এই সুদ দিয়ে টাকার ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখা সম্ভব হবে না। উৎসে কর, আবগারি শুল্ক ও অন্যান্য চার্জ কাটার পর প্রকৃত আয় আরও কমতে পারে।
ব্যাংক আমানতে প্রকৃত আয় কমে যাওয়ায় বিকল্প বিনিয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে পুঁজিবাজারের প্রতি আগ্রহ বাড়ার সুযোগ রয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের পুঁজিবাজার ঘিরে আস্থাহীনতা রয়েছে। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ সম্পর্কে মানুষ পর্যাপ্ত সচেতন নয়। আর বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে বাজারে ভালো কোম্পানির শেয়ার, স্বচ্ছতা, সুশাসন ও আস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। এসব ছাড়া বিনিয়োগের জন্য পুঁজিবাজার মানুষের কাছে আকর্ষণীয় হবে না।
পুঁজিবাজারের লেনদেনে নেই গতি
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ২০২৬ সালের জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জুন ও জুলাইয়ে বাজারে চাঙাভাব থাকলেও আগস্ট থেকে সূচক ও লেনদেন কমতে শুরু করে। জুনে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৮ শতাংশ বেড়ে ৫ হাজার ৭৬৩ পয়েন্টে দাঁড়ায়। জুলাইয়ে তা আরও বেড়ে ৫ হাজার ৮৯৬ পয়েন্টে পৌঁছায়। ওই মাসে দৈনিক গড় লেনদেন ছিল প্রায় ১ হাজার ২৫৫ কোটি টাকা।
তবে আগস্টে বাজারের চিত্র পাল্টে যায়। এ মাসে ডিএসইএক্স সূচক ৫ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ কমে ৫ হাজার ৫৯৮ পয়েন্টে নেমে আসে। দৈনিক গড় লেনদেন কমে ৮৭৬ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। সেপ্টেম্বরে সূচক আরও কমে ৫ হাজার ৫৫০ পয়েন্টে নেমে আসে। একই মাসে দৈনিক গড় লেনদেন কমে ৬৫১ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। জুলাইয়ের তুলনায় সেপ্টেম্বরে দৈনিক গড় লেনদেন প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে।
বাজারের এই দুর্বলতা অক্টোবরেও কাটেনি। গত ১৯ অক্টোবর ডিএসইতে ৫০৩ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন হয়। এর আগের দিন লেনদেন ছিল প্রায় ৩৬৬ কোটি টাকা। লেনদেনের এমন নিম্নমুখী প্রবণতা বাজারে বিনিয়োগের গতি দুর্বল থাকার ইঙ্গিত দেয়।
বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের আরেকটি সূচক বিও হিসাবের তথ্যেও ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি নেই। সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরুতে চালু বিও হিসাব ছিল প্রায় ১৬ লাখ ৪১ হাজার। জুনের শেষে তা বেড়ে প্রায় ১৬ লাখ ৭৫ হাজারে দাঁড়ায়। তবে ১৯ অক্টোবর তা কমে প্রায় ১৬ লাখ ৭২ হাজারে নেমে আসে।
পাশাপাশি শেয়ারশূন্য বিও হিসাবের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। জানুয়ারির শুরুতে এ ধরনের হিসাব ছিল প্রায় ৩ লাখ ৬৮ হাজার। জুনের শেষে তা বেড়ে প্রায় ৩ লাখ ৯৫ হাজারে দাঁড়ায়। ১৯ অক্টোবরও শেয়ারশূন্য হিসাব ছিল প্রায় ৩ লাখ ৯০ হাজার। অর্থাৎ জুনের তুলনায় এমন হিসাব কিছুটা কমলেও বিপুলসংখ্যক বিও হিসাবে কোনো শেয়ার নেই।
সিডিবিএলের হিসাবে, ইলেকট্রনিক ব্যবস্থায় সংরক্ষিত শেয়ারের সংখ্যা অক্টোবরের প্রথম দিক থেকে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত কিছুটা বেড়েছে। তবে শেয়ারের সংখ্যা বৃদ্ধি মানেই নতুন বিনিয়োগের অর্থ প্রবাহ নয়। বোনাস শেয়ার, রাইট শেয়ার বা নতুন শেয়ার যুক্ত হলেও মোট শেয়ারের সংখ্যা বাড়তে পারে। অন্যদিকে ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯ অক্টোবরের মধ্যে সিডিএসে সংরক্ষিত শেয়ারের মোট বাজারমূল্য প্রায় ৩ লাখ ১২ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকা থেকে কমে ৩ লাখ ৫ হাজার ৮২০ কোটি টাকায় নেমেছে। অর্থাৎ এই সময়ে বাজারমূল্য কমেছে প্রায় ৭ হাজার ১২৬ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টদের মতে, শেয়ারের দাম কমে যাওয়া এর একটি কারণ হতে পারে। ফলে সার্বিক বিবেচনায় বাজারে সক্রিয় বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ বাড়ার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায় না।
অর্থনীতির দুর্বলতা দায়ী
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, সরকারি বিনিয়োগ ও উন্নয়ন ব্যয় কমে যাওয়ায় অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নতুন কাজ ও ব্যবসার সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগ এবং সরকারি উন্নয়ন ব্যয়—দুই ক্ষেত্রেই ধীরগতির প্রভাব ব্যাংকঋণের চাহিদায় পড়েছে। ফলে ব্যাংকে অর্থের জোগান থাকলেও তা উৎপাদনশীল বিনিয়োগে ব্যবহৃত হচ্ছে না।
তার মতে, পুঁজিবাজারের সংকট দীর্ঘদিনের। গত দেড় থেকে দুই দশকে বাজারের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় নীতি, কৌশল ও সংস্কার যথাযথভাবে নেওয়া হয়নি। পাশাপাশি সুশাসনের ঘাটতি বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি হলেও বাজারকে শক্তিশালী করতে প্রয়োজনীয় নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এখনও যথেষ্ট নয়।
তিনি আরও বলেন, অর্থনীতি ভালো না থাকলে পুঁজিবাজারও তার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারে না। বাজারের মৌলিক দুর্বলতা ও আস্থার সংকট দূর করে প্রয়োজনীয় সংস্কার নিশ্চিত করা না গেলে টেকসইভাবে বিনিয়োগ বাড়ানো কঠিন। ব্যাংকে উদ্বৃত্ত অর্থ থাকলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুঁজিবাজারে চলে আসবে না। এ জন্য বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি।
ব্যাংকে আমানতের প্রকৃত আয় কমে যাওয়া এবং ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য বাড়লেও অর্থনীতির আরেক অংশ পুঁজিবাজারে নতুন বিনিয়োগের স্পষ্ট সাড়া নেই। লেনদেনের সংকোচন ও বিও হিসাবের প্রবণতা দেখাচ্ছে, বাজারে বিনিয়োগ বাড়েনি। সংশ্লিষ্টদের মতে, বাজারে আস্থা ফেরানো, ভালো কোম্পানির শেয়ারের জোগান বাড়ানো এবং সুশাসন নিশ্চিত করলেই কেবল পুঁজিবাজারে তারল্য প্রবাহ বাড়তে পারে।