জাতিসংঘ কিভাবে কাজ করে

ফিচার ডেস্ক: জাতিসংঘ মূলত একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চ হিসেবে কাজ করে, যেখানে বিশ্বের ১৯৩টি দেশ একত্রে বসে বৈশ্বিক সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করে এবং যৌথ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তা সমাধান করার চেষ্টা করে। কোনো বৈশ্বিক সরকার না হলেও আন্তর্জাতিক আইন ও সনদের ভিত্তিতে এটি বিশ্বব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে।

জাতিসংঘের সামগ্রিক কার্যক্রম পরিচালনার মূল কাঠামো, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিচে বিস্তারিতভাবে দেওয়া হলো:

১. ৬টি প্রধান অঙ্গসংগঠনের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ
জাতিসংঘের কাজ মূলত এর ৬টি মূল শাখা বা অঙ্গসংগঠনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। প্রতিটির কাজ নির্দিষ্ট ও ভিন্ন:

•    সাধারণ পরিষদ: এটি জাতিসংঘের মূল আইনসভা বা ফোরাম। বিশ্বের সব দেশের (১৯৩টি) সমান প্রতিনিধিত্ব রয়েছে এখানে। এখানে বাজেট, নতুন সদস্য গ্রহণ এবং বৈশ্বিক সংকট নিয়ে বিতর্ক ও ভোট হয়। এর সিদ্ধান্তগুলো ‘সুপারিশ’ হিসেবে গণ্য হয়, যা মানা বাধ্যতামূলক নয়।
•    নিরাপত্তা পরিষদ: বিশ্বশান্তি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা রক্ষার মূল দায়িত্ব এর। এর নেওয়া সিদ্ধান্ত বা রেজোলিউশন বিশ্বের সব দেশ মানতে বাধ্য। প্রয়োজনে এটি কোনো দেশের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারে কিংবা সামরিক শক্তি প্রয়োগের অনুমোদন দিতে পারে।
•    অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ: বিশ্বজুড়ে দারিদ্র্য দূরীকরণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবাধিকারের মতো সামাজিক ও অর্থনৈতিক লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নের পরিকল্পনা ও সমন্বয় করে এই পরিষদ।
•    আন্তর্জাতিক আদালত: নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত এই আদালতটি বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যকার আইনি বিরোধের নিষ্পত্তি করে এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনকারীদের বিচার করে (যেমন: রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলা)।
•    সচিবালয়: এটি জাতিসংঘের প্রশাসনিক শাখা, যার প্রধান হলেন মহাসচিব। জাতিসংঘের দৈনন্দিন কাজ, গবেষণা, মাঠ পর্যায়ের তদারকি এবং সম্মেলন আয়োজনের কাজ করে এই বিভাগ।
•    ওপনিবেশিক পরিষদ: আগে পরাধীন বা ঔপনিবেশিক অঞ্চলগুলোর স্বাধীনতার জন্য এটি কাজ করত। ১৯৯৪ সালে সব অঞ্চল স্বাধীন হওয়ার পর এর কার্যক্রম বর্তমানে স্থগিত রয়েছে।
•    
২. আন্তর্জাতিক আইন ও সনদের প্রয়োগ
জাতিসংঘ কোনো দেশের নিজস্ব সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। তবে সদস্য রাষ্ট্রগুলো ‘জাতিসংঘ সনদ’ (UN Charter) স্বাক্ষর করার মাধ্যমে এর নিয়মাবলি মেনে চলতে বাধ্য থাকে। কোনো দেশ আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করলে অন্য দেশের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন বা অর্থনৈতিক অবরোধের মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

৩. মাঠ পর্যায়ে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন (উইংস ও তহবিল)
সাধারণ বা নিরাপত্তা পরিষদ কোনো নীতি পাস করলে, তা মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন করে জাতিসংঘের বিভিন্ন বিশেষায়িত সংস্থা ও তহবিল। উদাহরণস্বরূপ:
•    কোথাও যুদ্ধ হলে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠিয়ে সংঘাত থামানো হয়।
•    প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা যুদ্ধক্ষেত্রে ডব্লিউএফপি এবং ইউএনএইচসিআর খাবার ও আশ্রয় নিয়ে পৌঁছায়।
•    কোনো মহামারি দেখা দিলে ডব্লিউএইচও বিশ্বব্যাপী চিকিৎসা সহায়তার সমন্বয় করে।
•    
৪. টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা 
বর্তমানে জাতিসংঘের কাজের একটি বড় অংশ পরিচালিত হচ্ছে এসডিজিস বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অধীনে। ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবী থেকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য দূর করা, লিঙ্গ সমতা আনা এবং জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করার জন্য ১৭টি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে জাতিসংঘ কাজ করছে।

৫. অর্থায়ন বা বাজেট ব্যবস্থা
জাতিসংঘের নিজস্ব কোনো আয়ের উৎস নেই। এর কাজ চালানোর জন্য সদস্য দেশগুলোর চাঁদা ও অনুদানের ওপর নির্ভর করতে হয়। প্রতিটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার (জিডিপি) ওপর ভিত্তি করে এই চাঁদার হার নির্ধারিত হয়। বর্তমানে জাতিসংঘে সবচেয়ে বেশি অর্থায়ন করে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান ও জার্মানি।