ড. এম আব্দুল মোমিন: খাদ্য ঘাটতির দেশে বাড়তি উৎপাদন কীভাবে সম্ভব হলো সে গল্প কি আমরা জানি? খাদ্যনিরাপত্তা এ দেশে চালের নিরাপত্তার সমার্থক। দিনে দুই থেকে তিনবার যে জাতির পাতে ভাত ওঠে তার ভাতের হিসাব মেলানোর দায়িত্ব যে প্রতিষ্ঠানের কাঁধে সেটি বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)। বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার অতন্দ্র প্রহরী ব্রি ১ অক্টোবর ৫৭তম বর্ষে পদার্পণ করেছে। ১৯৭০ সালের ১ অক্টোবর ‘পূর্ব পাকিস্তান ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট’ নামে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠান স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের সংসদীয় আইনে নতুন নাম পায়। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই শুভদিনে ব্রির কয়েকটি যুগান্তকারী সাফল্যের গল্প পাঠকের সামনে তুলে ধরতে এই আয়োজন।
গত সাড়ে পাঁচ দশকে ব্রির সবচেয়ে বড় সফলতা হচ্ছে চালের উৎপাদন চার গুণেরও বেশি উন্নীতকরণ। ব্রি ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ১৯৭১-৭২ অর্থবছরে দেশে মোট চালের উৎপাদন ছিল ৯ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০ দশমিক ৬৩ মিলিয়ন টনে অর্থাৎ চালের উৎপাদন গত সাড়ে পাঁচ দশকে বেড়েছে চার গুণেরও বেশি। এই সময়ে জনসংখ্যা বেড়েছে প্রায় তিনগুণ, আবাদি জমি কমেছে। তাই উৎপাদন বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে উন্নত জাত ও প্রযুক্তির হাত ধরে। বর্তমানে মোট উৎপাদনের ৫৩ শতাংশ আসে বোরো মৌসুম থেকে, ৪০ শতাংশ আমন থেকে এবং ৭ শতাংশ আউশ থেকে। কৃষকের মাঠেও এর প্রতিফলন স্পষ্ট। ব্রির তথ্যমতে আউশ মৌসুমে ব্রি জাতের গ্রহণযোগ্যতা ৭৩ দশমিক ৩১ শতাংশ, আমনে ৫৮ দশমিক ৪৩ শতাংশ ও বোরোতে ৫৭ দশমিক ২৯ শতাংশ। ব্রির জাত চাষ করে কৃষকের ফলন ৪০ শতাংশ এবং আয় ৮৫ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে।
দেশি জাতের স্বল্প ফলন থেকে ব্রি উদ্ভাবিত উফশী জাত বৈচিত্র্যে এসেছে এই কাঙ্ক্ষিত সমাধান। ব্রি এ পর্যন্ত ১২৭টি ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে যার মধ্যে ১১৭টি ইনব্রিড ও ১০টি হাইব্রিড। এর মধ্যে জলবায়ুর ঘাতসহনশীল ৪০টি, পুষ্টিসমৃদ্ধ ৩০টি, সুগন্ধি ও প্রিমিয়াম মানের ১৪টি, জিংক সমৃদ্ধ সাতটি, স্বল্প গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের লো-জিআই চাল চারটি এবং রোগ প্রতিরোধী দুটি। ব্রি উদ্ভাবিত ২৩টি জাত ১৪টি দেশে চাষ হচ্ছে যা দেশের গবেষণার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ।
ব্রি উদ্ভাবিত কয়েকটি জাত দেশের কৃষির চেহারা বদলে দিয়েছে। বিআর৩ ও বিআর১১, ৪৯, ৮৭, ১০৩ আমনে এবং ব্রি ধান২৮, ২৯, ৮৮, ৮৯, ৯২, ১০২, ১০৮ এবং ব্রি হাইব্রিড ধান৮ বোরোতে দশকের পর দশক ধরে দেশের খাদ্যনিরাপত্তায় বড় ভূমিকা রেখেছে। উত্তরাঞ্চলের মঙ্গা মোকাবিলায় আগাম পাকা ব্রি ধান৩৩ গরিব চাষির জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। ড্রাম সিডার দিয়ে সরাসরি বপন করলে এটি ১০০ দিনের মধ্যেই পাকে, যা মঙ্গা দূরীকরণে জাদুর কাঠি হিসেবে কাজ করেছে।
সাম্প্রতিক জাতগুলোতেও বৈচিত্র্য চোখে পড়ে। ব্রি ধান১১৪ ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী। ব্রি ধান১১৫ ভিটামিন-ই ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্টসমৃদ্ধ। ব্রি ধান১১৬ গড়ে হেক্টরপ্রতি ৮ দশমিক ৬ টন ফলন দেয়। লবণসহিষ্ণু ব্রি ধান১১৭ উপকূলে হেক্টরপ্রতি ৮ দশমিক ৬ টন ফলন দিতে পারে এবং সম্পূর্ণ জীবনচক্রে ১০ ডিএস/মি. লবণাক্ততা সহ্য করে। হাওড়াঞ্চলের জন্য ঠান্ডাসহিষ্ণু ও আগাম জাত ব্রি ধান১১৮ উদ্ভাবিত হয়েছে। এ বছর আগাম বন্যায় প্রায় ১৪ থেকে ১৫ লাখ টন বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এই জাতের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। হাইব্রিডের মধ্যে ব্রি হাইব্রিড ধান৮ হেক্টরপ্রতি ১০ দশমিক ৫ থেকে ১১ টন এবং লবণসহিষ্ণু ব্রি হাইব্রিড ধান১০ অনুকূল পরিবেশে ৯ দশমিক ৭ থেকে ১০ দশমিক ৭ টন ফলন দিতে সক্ষম।
ব্রি এখন ধানের জাত উদ্ভাবনে প্রজনন কর্মসূচিতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। ৩২টি টার্গেট প্রোডাক্ট প্রোফাইল তৈরি হয়েছে এবং প্রজনন চক্র সাড়ে তিন থেকে চার বছর কমানো হয়েছে। প্রায় ৪ হাজার জেনোটাইপের পূর্ণ জিনোম ফিঙ্গারপ্রিন্টিং সম্পন্ন হয়েছে। ৪ লাখেরও বেশি ফিক্সড লাইন উদ্ভাবিত হয়েছে যা ভবিষ্যৎ জাতের ভাণ্ডার হিসেবে কাজ করবে।
সম্পদ সাশ্রয় ও পরিবেশ রক্ষায়ও সরাসরি বপন পদ্ধতিতে (ডিএসআর) জলমগ্ন পদ্ধতির তুলনায় মিথেন নির্গমন ৩৪ শতাংশ হ্রাস করছে। যদিও ধান চাষে গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমনের চেয়ে প্রশমন হয় বেশি। ব্রির দানাদার ইউরিয়া প্রয়োগ যন্ত্রে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ সার সাশ্রয় হয়, ফলন ৫ থেকে ১২ শতাংশ বাড়ে এবং গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন ৭ শতাংশ পর্যন্ত কমে। সেচে সেন্সর ও স্বয়ংক্রিয় এডব্লিউডি ব্যবস্থা কৃষকের খরচ সাশ্রয় করছে।
কৃষি যান্ত্রিকীকরণে ব্রি এ পর্যন্ত ৫৪টি যন্ত্র উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বীজ বপন, রোপণ, আগাছা দমন ও মাড়াই যন্ত্র এবং কম্বাইন হারভেস্টার। বীজ বপনের পাওয়ার সিড সোয়ারের দাম প্রায় ৮০ হাজার টাকা এবং তা দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে দেশীয় কারখানায় তৈরি হচ্ছে। এতে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে আমদানিনির্ভরতা কমেছে। যন্ত্র উৎপাদনে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের যুক্ত হওয়ার সুযোগও তৈরি হয়েছে।
ডিজিটাল সেবায়ও ব্রি এগিয়েছে অনেকখানি। মাঠের পোকামাকড় ও রোগ পর্যবেক্ষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক মনিটরিংব্যবস্থা চালু হয়েছে। রয়েছে ধানের জাতের স্মার্ট প্রোফাইলিং অ্যাপ ও বাংলাদেশ রাইস নলেজ ব্যাংক। ব্রির অ্যাগ্রোমেট সেবা ও কল সেন্টারে জুন থেকে জুলাই ২০২৬ সময়ে মোট ১ হাজার ৬৫৭টি কল এসেছে যার বেশির ভাগই সহায়তা ডেস্কসংক্রান্ত। সার ব্যবস্থাপনা, রোগ ও পোকামাকড় নিয়েও কৃষকরা প্রশ্ন করেছেন।
ভালো জাত মাঠে পৌঁছাতে চাই মানসম্পন্ন বীজ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্রি ১৩০টি জাতের নিউক্লিয়াস বীজ সংরক্ষণ করেছে এবং ২৩২ টন ব্রিডার বীজ উৎপাদন করেছে। এর মধ্যে ১ হাজার ১২৫টি সিডনেট অংশীদারকে প্রায় ২০০ টন বীজ প্রতি বছরই বিতরণ করা হচ্ছে। ধান বিজ্ঞানের আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে গত পাঁচ বছরে ব্রি মোট ৫১ হাজার ৪২০ জন অংশীজনকে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়েছে যার মধ্যে কৃষক ৪২ হাজার ২০৪ জন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ব্রি মোট ২৯টি পুরস্কার ও পদক অর্জন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে স্বাধীনতা পদক, একুশে পদক, জাতীয় কৃষি পুরস্কার (স্বর্ণ) এবং ব্র্যাক ব্যাংক ইমপ্যাক্ট অ্যাওয়ার্ডস। ব্রির অবদান অর্থনৈতিক বিচারেও লাভজনক। ধান গবেষণায় বিনিয়োগের প্রতিদান নিয়ে পাঁচটি গবেষণা হয়েছে। সেগুলোর হিসাবে প্রতি এক টাকা বিনিয়োগে ফেরত এসেছে ২৬ থেকে ৫৪ টাকা।
দেশের জনসংখ্যা বাড়ছে বছরে ১ দশমিক ১২ শতাংশ হারে, আবাদি জমি কমছে শূন্য দশমিক ২৪ শতাংশ হারে আর তাপমাত্রা বাড়ছে প্রতি দশকে প্রায় শূন্য দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ব্রির ভাষায়, খাদ্যনিরাপত্তা কোনো স্থায়ী অর্জন নয়, একে টেকসই করতে নিরন্তর প্রচেষ্টা দরকার। ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে উৎপাদনশীলতা দ্বিগুণ করার তাগিদও রয়েছে। তাই ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তা সুসংহত করার জন্য ব্রি কয়েকটি কৌশল হাতে নিয়েছে। কৃষকের গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৫ টন ধরে দেশের চাহিদা মেটাতে অন্তত ৬ দশমিক ২৯ মিলিয়ন হেক্টর নিট আবাদি জমি রক্ষার কৌশল নিয়ে কাজ করছে ব্রি। ব্রির মতে, জেনেটিক গেইনের গতি বছরে অন্তত ৪৪ কেজি/হেক্টর হারে বাড়ানো দরকার। ২০৫০ সালের মধ্যে ১ দশমিক ৩৮ মিলিয়ন হেক্টর পতিত জমিতে ধান চাষ করে বাড়তি ১ দশমিক শূন্য ৬ মিলিয়ন টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণের পাশাপাশি ৪ দশমিক ৪৯ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে উন্নত শস্যবিন্যাস চালু করে আরও ৪ দশমিক শূন্য ৪ মিলিয়ন টন বাড়তি ধান উৎপাদনের সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
গবেষণার অগ্রাধিকারে রয়েছে স্পিড ব্রিডিং, জিনোমিক প্রেডিকশন ও হ্যাপলোটাইপভিত্তিক প্রজননের মতো আধুনিক কৌশল। এছাড়া রয়েছে পুষ্টিসমৃদ্ধ ও স্বাস্থ্যকর জাত, জলবায়ু সহনশীলতা, যান্ত্রিকীকরণ ও ডিজিটাল প্রযুক্তির সম্প্রসারণ। চলমান গবেষণায় সি৪ রাইস, জিনোম এডিটিংয়ের মাধ্যমে লবণাক্ততা সহনশীলতা ও ব্লাস্ট প্রতিরোধ এবং টু-লাইন হাইব্রিড প্রজনন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। উচ্চআয়ের জন্য মূল্য সংযোজিত ধানজাত পণ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাইস ভ্যালু চেইন গড়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
দিনে দিনে প্রতিষ্ঠানটির পরিধিও বাড়ছে। বর্তমানে ১৯টি গবেষণা বিভাগ এবং সদর দপ্তরের বাইরে ১১টি আঞ্চলিক কার্যালয় রয়েছে। এছাড়া দিনাজপুর, টাঙ্গাইল, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার, নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জে আরও ছয়টি আঞ্চলিক কার্যালয় এবং ছয়টি স্যাটেলাইট স্টেশন স্থাপনের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এতে স্থানভিত্তিক ধানের জাত উদ্ভাবন ও কৃষকের সমস্যার সমাধান আরও সহজ হবে।
তবে কিছু সীমাবদ্ধতার কথা না বললেই নয়! এর মধ্যে অপর্যাপ্ত জনবল, পদোন্নতি ও চাকরির মেয়াদসংক্রান্ত জটিলতা এবং গবেষণা বরাদ্দের অপ্রতুলতা উল্লেখযোগ্য। ব্রির অনুমোদিত ৩১৮টি বিজ্ঞানী পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২৭১ জন। যে প্রতিষ্ঠানের প্রতি টাকার বিনিয়োগ বহুগুণ হয়ে ফেরে, তার গবেষণা ও জনবলে বিনিয়োগ বাড়ানোই দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। ৫৬ বছর আগে যে প্রতিষ্ঠান কয়েকজন বিজ্ঞানীর প্রচেষ্টায় যাত্রা শুরু করেছিল, আজ তা দেশের কোটি মানুষের পাতে ভাত পৌঁছানোর নেপথ্য শক্তি। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ব্রির সব বিজ্ঞানী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও কৃষককে অভিনন্দন। জলবায়ু পরিবর্তন ও জমি সংকটের যুগে ব্রির ওপর প্রত্যাশা আরও বাড়বে আর সেই প্রত্যাশা পূরণে প্রয়োজন সময়োপযোগী রাষ্ট্রীয় সহায়তা।
কৃষিবিদ ও ঊর্ধ্বতন যোগাযোগ কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), গাজীপুর