এআইয়ের যুগে প্রাইভেট মিডিয়া: বাংলাদেশে প্রস্তুতি কতটা?

মশিউর রহমান শাওন: রাজনীতি, অর্থনীতি অথবা শিক্ষা। সবক্ষেত্রে এখন ব্যবহার হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। প্রত্যেকটি করপোরেট প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তির সর্বোচ্চ সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে। ফলে এমন সময় বিশেষভাবে পরিচালনা করতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের প্রাইভেট মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো।

করপোরেট ক্ষেত্রে প্রাইভেট মিডিয়া বলতে বোঝানো হচ্ছে, প্রতিষ্ঠান যে মাধ্যমে গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ করে। অর্থ্যাৎ সেটি হতে পারে ফেসবুক পেজ, ইউটিউব চ্যানেল, ওয়েবসাইট অথবা ডিজিটাল ব্রোশিওর। গ্রাহকের অভিযোগ অথবা সংকটে এই মাধ্যমগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারলে সংকটে তৈরি হয় সংকট। ফলে এখন কনটেন্ট তৈরির পাশাপাশি বিশেষ নজর রাখতে হয় যোগাযোগ কৌশলেও।

প্রতিষ্ঠানকে মূলত দুটি কাজ করতেই হয়। প্রথমত, গ্রাহক ধরে রাখা, দ্বিতীয়ত, নতুন গ্রাহক তৈরি করা। এই কাজে প্রতিষ্ঠান পরিচালিত সব মিডিয়াতে একই বার্তা নিশ্চিত করা আবশ্যক। ভুল অথবা আলাদা আলাদা বার্তা দেওয়া মানেই নতুন সংকট তৈরি। এই সংকট সমাধানে এআই ব্যবহার হতে পারে সেরা অপশন।

প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেই যোগাযোগ সমৃদ্ধ হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে ধারাবাহিকতা অথবা ব্র্যান্ড ভ্যালু ধরে রাখতে প্রযুক্তি ব্যবহারের বিকল্পও নেই। অবশ্য এর আগে পরিকল্পনায় বড় পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে প্রতিষ্ঠানগুলোকে।

প্রতিষ্ঠান যত বড় হবে গ্রাহকের অভিযোগের সংখ্যা তত বাড়বে। অভিযোগ বৃদ্ধি মানেই সংকট তৈরির সম্ভাবনাও বেশি। তাই সংকট তৈরির আগে গ্রাহকের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, অভিযোগ সামলানো এবং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তৈরিতে প্রাইভেট মিডিয়া কার্যকরী ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

প্রতিষ্ঠানের জন্য এআই ঠিক এই জায়গায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কেননা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মন্তব্য বিশ্লেষণ করে গ্রাহকের সাধারণ প্রশ্নগুলো শনাক্ত করা যায়। সেই তথ্য কাজে লাগিয়ে ওয়েবসাইটের প্রশ্নোত্তর বিভাগ উন্নত করা সম্ভব। ভিডিওর দর্শক কোন বিষয়ে বেশি আগ্রহী, তা বুঝেও পরবর্তী কনটেন্টের পরিকল্পনা করা যায়।

অর্থাৎ, নিজস্ব মিডিয়া শুধু তথ্য প্রকাশের জায়গায় না থেকে গ্রাহকের প্রয়োজন বোঝার মাধ্যমও হয়ে উঠতে পারে। তবে এমন পরিবর্তনের কার্যকারিতা নির্ভর করবে তথ্যের মান এবং বিশ্লেষণের যথাযথ ব্যবহারের ওপর।

বিশ্বজুড়ে সফল প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের এআই পলিসি তৈরি করছে। বাংলাদেশের করপোরেট জগতে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে এআই। তবে প্রযুক্তির এই ব্যবহারে এখনও পিআর পেশাজীবীদের মধ্যে বিশেষ ঘাটতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

২০২৫ সালে Society & Sustainability সাময়িকীতে প্রকাশিত Artificial Intelligence and Public Relations Synergy: A Study in the Context of Bangladesh শীর্ষক গবেষণায় বাংলাদেশের জনসংযোগ পেশাজীবীদের মধ্যে এআই ব্যবহারের বর্তমান অবস্থা ও এ প্রযুক্তি সম্পর্কে জ্ঞানের ঘাটতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

আলোচনা থেকে বোঝা যায়, এআই ব্যবহারের সুযোগ থাকলেই প্রতিষ্ঠান সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারবে না। প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিতে তাই প্রয়োজন দক্ষ কর্মী, উপযুক্ত পরিকল্পনা এবং প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা বোঝার সক্ষমতা। ফলে এই গবেষণা থেকে আশা দেখতে পারে পিআর বিভাগের শিক্ষার্থী ও কর্মজীবীরা।

বাংলাদেশ বিবেচনায় বাংলা ভাষায় কনটেন্ট তৈরির ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এআই দিয়ে অনুবাদ, ক্যাপশন লেখার কাজটি সহজে করা যায়। তবে অঞ্চলভেদে ভাষার ব্যবহার, সংস্কৃতি এবং বক্তব্যের সঠিক অর্থ বজায় রাখতে মানুষের সম্পাদনা প্রয়োজন।

সামনের দিনে করপোরেট যোগাযোগের ধরন আরও বদলাবে। তবে প্রযুক্তির সুবিধা নেওয়া আর তা দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করা এক বিষয় নয়। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এখন প্রয়োজন এআই ব্যবহারে সুস্পষ্ট নীতিমালা, দক্ষ জনবল এবং তথ্য যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা। বিশেষ করে জনসংযোগ পেশাজীবীদের প্রযুক্তির ব্যবহার শেখার পাশাপাশি এর সীমাবদ্ধতা বোঝাও জরুরি।

এআই কনটেন্ট তৈরি করতে পারে, গ্রাহকের মতামত বিশ্লেষণ করতে পারে; কিন্তু মানুষের আস্থা অর্জনের জন্য প্রয়োজন সংবেদনশীলতা, জবাবদিহি এবং সঠিক সিদ্ধান্ত। শেষ পর্যন্ত, কোন প্রতিষ্ঠান কত দ্রুত এআই গ্রহণ করল, সেটিই বড় প্রশ্ন নয়। বরং প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা দায়িত্বশীলভাবে প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে গ্রাহকের সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্য সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারছে, সেটিই তাদের যোগাযোগের সাফল্য নির্ধারণ করবে।

শিক্ষার্থী, মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগ
ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ