খেজুর গুড়ে ১২০ কোটির স্বপ্ন

মীর কামরুজ্জামান মনি: যশোরের খেজুরের রস ও গুড়কে ঘিরে চলতি মৌসুমে ১২০ কোটি টাকার বেশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। জেলায় রস আহরণের উপযোগী খেজুরগাছ রয়েছে ৩ লাখ ১২ হাজার ৯৬১টি। এসব গাছ থেকে ৩ কোটি ৮৮ লাখ ৬ হাজার ৫৬৫ লিটার রস সংগ্রহ এবং ৩ হাজার ৯০ মেট্রিক টন গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। ২০২৪ সালে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়ায় ঐতিহ্যবাহী এ পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। তবে খেজুরগাছের স্বল্পতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, দক্ষ গাছির সংকট এবং ন্যায্যমূল্য নিয়ে অনিশ্চয়তা এই শিল্পের টেকসই বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

খেজুরের গুড় যশোরের গ্রামীণ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি মৌসুমি পণ্য। এর উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে গাছি, তাদের পরিবারের সদস্য, জ্বালানি কাঠের সরবরাহকারী, মাটির হাঁড়ি প্রস্তুতকারক, ব্যবসায়ী ও পরিবহনকর্মীরা যুক্ত। ফলে এ খাতের অর্থনৈতিক গুরুত্ব শুধু গুড় বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর সঙ্গে গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও স্থানীয় বাজারের লেনদেনও জড়িত।

শীত মৌসুম সামনে রেখে যশোরের বিভিন্ন এলাকায় খেজুরগাছ প্রস্তুতের কাজ শুরু করেছেন গাছিরা। গাছের ডালপালা পরিষ্কার করা, মাথা ছেঁটে রস সংগ্রহের উপযোগী করা এবং হাঁড়ি ও অন্যান্য সরঞ্জাম প্রস্তুত করার কাজ চলছে।

যশোরের খাজুরা এলাকার গাছি জিয়ারুল গত মৌসুমে ৯২টি খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহ করে গুড় ও পাটালি তৈরি করেছিলেন। সব মিলিয়ে বিক্রি করেছিলেন প্রায় ৮৫ হাজার টাকার পণ্য। এবারও একই প্রত্যাশা নিয়ে গাছ প্রস্তুত করছেন তিনি। তবে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও বাজারে খাঁটি গুড়ের ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে তার উদ্বেগ রয়েছে।

গাছিদের তথ্য অনুযায়ী, এক মণ জ্বালানি কাঠের দাম প্রায় ২০০ টাকা। রস সংগ্রহের কাজে ব্যবহৃত ভালো মানের একটি দারের দাম ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা। এর বাইরে মাটির হাঁড়ি, দড়ি, গাছ পরিচর্যা, শ্রম ও অন্যান্য উপকরণে ব্যয় করতে হয়। ফলে বিক্রির মোট অর্থ থেকে এসব ব্যয় বাদ দেওয়ার পর প্রকৃত মুনাফা কত থাকছে, সেটিই গাছিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও বাজারে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে গাছিদের লাভ কমে যায়। আবার ব্যয় সমন্বয় করতে দাম বাড়ালে সাধারণ ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হয়। এ অবস্থায় উৎপাদক ও ভোক্তা— উভয়ের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

জিআই স্বীকৃতিতে বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ
‘যশোরের যশ, খেজুরের রস’— প্রচলিত এই প্রবাদ এ অঞ্চলের সঙ্গে খেজুরের রস ও গুড়ের দীর্ঘ সম্পর্ক তুলে ধরে। ২০২৪ সালে জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার মধ্য দিয়ে পণ্যটি নিজস্ব ভৌগোলিক পরিচিতি লাভ করে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রত্যাশা, এ স্বীকৃতিকে কাজে লাগিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারেও পণ্যটির পরিচিতি বাড়ানো সম্ভব হবে।

ইতোমধ্যে স্থানীয় হাট-বাজারের পাশাপাশি অনলাইনভিত্তিক উদ্যোক্তাদের মাধ্যমেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যশোরের গুড় ও পাটালি বিক্রি হচ্ছে। এতে উৎপাদকদের জন্য নতুন ক্রেতার কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে বাজার সম্প্রসারণের সুফল পেতে উৎপাদকদের ন্যায্য অংশ নিশ্চিত করা জরুরি। এজন্য নিরাপদ উপায়ে রস সংগ্রহ, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে গুড় তৈরি, ভেজাল প্রতিরোধ, মানসম্মত মোড়কজাতকরণ এবং সঠিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। পণ্যের গুণগত মান বজায় রাখা না গেলে জিআই স্বীকৃতি থেকে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া কঠিন হবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের উপ-পরিচালক জাহিদুল ইসলাম বলেন, যশোরের খেজুরের গুড়ের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের পাশাপাশি বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা রয়েছে। জিআই পণ্য হিসেবে নিরাপদ রস ও ভেজালমুক্ত গুড় উৎপাদনে গাছিদের প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও উঠোন বৈঠকের মাধ্যমে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনা থাকলেও উৎপাদনের মূল ভিত্তি খেজুরগাছ ও দক্ষ গাছির সংকট এই শিল্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। স্থানীয়দের অভিযোগ, ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে খেজুরগাছ ব্যবহারের কারণে অনেক এলাকায় গাছের সংখ্যা কমছে। পাশাপাশি নতুন গাছ রোপণ ও পুরোনো গাছ সংরক্ষণে পর্যাপ্ত উদ্যোগের অভাব ভবিষ্যৎ উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। খেজুরগাছ রোপণের পর উৎপাদনক্ষম হতে সময় লাগে। তাই বর্তমান উৎপাদন ধরে রাখতে এবং ভবিষ্যতের চাহিদা মেটাতে নতুন গাছ রোপণ, চারা পরিচর্যা ও বিদ্যমান গাছ সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। চৌগাছা উপজেলার চাকলা গ্রামের আবদুল কুদ্দুসের পরিবার কয়েক প্রজন্ম ধরে খেজুরের রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির সঙ্গে যুক্ত। তার দাদা হবিবুর মণ্ডল ও বাবা এ পেশায় ছিলেন। পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রাখতে তিনিও এখন এ কাজ করছেন। তবে এ ধরনের পারিবারিক অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা ধরে রাখতে নতুন প্রজন্মকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা জরুরি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, খেজুরের গুড়শিল্পকে টেকসই করতে উৎপাদন বৃদ্ধি, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও বাজার সম্প্রসারণকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে। নতুন খেজুরগাছ রোপণ ও পরিচর্যা, গাছিদের নিরাপদে গাছে ওঠা-নামার প্রশিক্ষণ, মানসম্মত উপকরণ সরবরাহ এবং সহজ শর্তে আর্থিক সহায়তা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি গাছি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি করা গেলে মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। অনলাইন বিপণন, মানসম্মত মোড়ক এবং নির্ভরযোগ্য সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে বাজার সম্প্রসারণ করা সম্ভব। তবে উৎপাদন ব্যয়, বিক্রয়মূল্য ও গাছিদের প্রকৃত মুনাফার তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ করা প্রয়োজন, যাতে এ খাতের আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে বাস্তবসম্মত ধারণা পাওয়া যায়।

ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে খেজুরগাছের সংরক্ষণ, দক্ষ গাছি তৈরি, মানসম্মত উৎপাদন ও ন্যায্য বাজার ব্যবস্থার ওপর। সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে যশোরের খেজুরের গুড় শুধু শীতকালীন জনপ্রিয় পণ্য হিসেবেই নয়, গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক বিকাশের একটি টেকসই খাত হিসেবেও প্রতিষ্ঠা পেতে পারে।