Print Date & Time : 28 October 2026 Wednesday 05:50 am

যে নারী পাথর কেটে হাজিদের তৃষ্ণা মেটান

image

ইতিহাসের পাতায় কত শত বীরত্বগাথা গল্প আমরা পড়ি, কিন্তু মরুভূমির তপ্ত বালুকে চিরে এক মহীয়সী নারীর জনসেবার যে নিদর্শন আজও টিকে আছে, তা বিস্ময়কর। এটি কেবল একটি খালের ইতিহাস নয়; বরং আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশিদের স্ত্রী রানি জুবাইদার দূরদর্শিতা, সাহস এবং হাজিদের প্রতি তাঁর নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক অনন্য উপাখ্যান। ইসলামের ইতিহাসে যা ‘নহরে জুবাইদা’ নামে অমর হয়ে আছে।

আব্বাসীয় আমলের সেই সময়ে মক্কায় জমজম কূপ ছাড়া পানির বিকল্প কোনো উৎস ছিল না। হজের মৌসুমে হাজিদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে পানির সংকট ভয়াবহ রূপ নিত। পরিস্থিতি এতটাই শোচনীয় ছিল যে, এক বালতি পানি বিশ দিরহাম পর্যন্ত মূল্যে কিনতে হতো সাধারণ মানুষকে। ১৯৩ হিজরিতে খলিফার মৃত্যুর পর রানি জুবাইদা হজ পালন করতে গিয়ে হাজিদের এই নিদারুণ কষ্ট প্রত্যক্ষ করেন। তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের।

রানি জুবাইদার আসল নাম আমাতুল আজিজ হলেও দাদা আল-মানসুর তাকে আদর করে ‘জুবাইদা’ (মাখনের টুকরো) বলে ডাকতেন। বিদুষী ও ধর্মপ্রাণ এই নারী ৮০৯ খ্রিস্টাব্দে মক্কায় মিষ্টি পানির খাল নির্মাণের এক বিশাল মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেন।

প্রকল্পটি মোটেও সহজ ছিল না। তায়েফের নিকটবর্তী ঝরনা থেকে মক্কা পর্যন্ত পানি আনা ছিল এক বিশাল প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ। দুর্গম পথ, কঠিন শিলা ও পাহাড় কেটে তৈরি করতে হয়েছিল দীর্ঘ সুড়ঙ্গ। পানি যেন রোদে শুকিয়ে না যায়, সেজন্য ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ ও ঢাকা দেওয়া জলপ্রণালি ব্যবহার করা হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে এই খাল খননে প্রায় ১৭ লাখ স্বর্ণমুদ্রা (দিনার) খরচ হয়েছিল, যার সম্পূর্ণ দায়ভার রানি নিজে বহন করেন।

এই খাল কেবল মক্কায় পানিই পৌঁছায়নি, বরং ইরাকের নুমান উপত্যকা থেকে আরাফাত হয়ে মক্কা পর্যন্ত এক বিশাল অঞ্চলকে সজীব করে তুলেছিল। খালের পাশাপাশি তিনি বাগদাদ থেকে মক্কা পর্যন্ত হজযাত্রার পথটি সংস্কার করেন, যা ইতিহাসে ‘দারব জুবাইদা’ নামে পরিচিত। এই দীর্ঘ পথে তিনি নির্মাণ করেন অসংখ্য বিশ্রামাগার, কৃত্রিম জলাধার, কূপ ও বাতিঘর।

দীর্ঘ এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে এই খাল মক্কাবাসী ও হাজিদের তৃষ্ণা মিটিয়ে এসেছে। আধুনিক পাম্পিং ব্যবস্থা আসার আগ পর্যন্ত এটিই ছিল মক্কার পানির প্রধান উৎস। বর্তমানে এর কিছু অংশ অবশিষ্ট থাকলেও তা মুসলিম স্থাপত্য ও প্রকৌশল বিদ্যার এক অবিস্মরণীয় নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।

নহরে জুবাইদা কেবল একটি খাল নয়, বরং এটি একজন নারীর অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং মানবসেবার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তপ্ত মরুভূমির বুকে জুবাইদার এই কীর্তি আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সদিচ্ছা থাকলে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়।

 

 জা. অর্থনীতি/ উমর