আন্তর্জাতিক ডেস্ক:মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে রাসায়নিক সারের সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের গুরুত্বপূর্ণ চালানগুলো প্রায় পুরোপুরি বন্ধ থাকায় কৃষি খাতে এক বড় ধরনের বিপর্যয়ের পূর্বাভাস দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। সামরিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সারের এই তীব্র ঘাটতি ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে বিশ্বজুড়ে ফসলের উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে। এই উৎপাদন ঘাটতি খুব দ্রুতই কৃষিপণ্যের মূল্যের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলবে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো টোরেও বর্তমান পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, সারের এই তীব্র সংকট বিভিন্ন দেশের চাষাবাদের নির্দিষ্ট সময়সূচিকে ব্যাহত করছে। বিশেষ করে এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশে ইতোমধ্যে ফসল বোনার উপযুক্ত সময় পার হয়ে গেলেও সারের অভাবে কৃষকরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারেননি। সময়মতো সার প্রয়োগ করতে না পারায় ফলন আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা মূলত সরবরাহ শৃঙ্খল দীর্ঘ সময় বিচ্ছিন্ন থাকার এক ভয়াবহ পরিণতি।
বর্তমান বাস্তবতায় বিশ্বের প্রধান খাদ্যশস্য রপ্তানিকারক দেশগুলো তাদের চিরাচরিত চাষাবাদের ধরন বদলে ফেলার কথা ভাবছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রাজিলের মতো বড় উৎপাদক দেশগুলো সারের ঘাটতি মোকাবিলায় গম ও ভুট্টার মতো শস্যের চাষ কমিয়ে দিয়ে সয়াবিনের মতো বিকল্প ফসলের দিকে ঝুঁকতে পারে। সয়াবিন প্রাকৃতিকভাবে মাটিতে নাইট্রোজেন ধরে রাখতে সাহায্য করে বিধায় এতে রাসায়নিক সারের প্রয়োজন কম হয়। তবে এই পরিবর্তনের ফলে বিশ্ববাজারে গম ও ভুট্টার জোগান মারাত্মকভাবে কমে গিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় শস্যের হাহাকার সৃষ্টি করতে পারে।
অন্যদিকে, বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকায় অনেক কৃষক তাঁদের উৎপাদিত ফসল খাদ্য হিসেবে ব্যবহার না করে জৈব জ্বালানি বা বায়োফুয়েল উৎপাদনে ব্যবহারের দিকে আগ্রহী হচ্ছেন। সারের ঘাটতির পাশাপাশি জ্বালানি তেলের এই উচ্চমূল্য বিশ্বজুড়ে গম ও সয়াবিনের দাম বৃদ্ধিতে বড় প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। চলতি বছরের শেষার্ধ নাগাদ এই দাম বৃদ্ধির প্রবণতা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে আগামী বছরের শুরুতে সাধারণ মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য কেনা এক বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, শুধু খাদ্যশস্যের দামই নয়, বরং এর সঙ্গে পরিবহন ও জ্বালানি তেলের বাড়তি খরচ যুক্ত হয়ে বিশ্বজুড়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে এক বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে যাবে। মধ্যপ্রাচ্যের এই রাজনৈতিক ও সামরিক সংকট দ্রুত সমাধান না হলে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হলে খাদ্য সংকটের এই ঝুঁকি দিন দিন আরও তীব্রতর হবে। এই দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতা বিশেষ করে আমদানিনির্ভর ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এক চরম মানবিক সংকট ডেকে আনতে পারে বলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করছে।
জেএ/অভি