হজের মৌসুমে বিশ্বের নানা প্রান্তের মুসলিমরা মক্কা নগরীতে সমবেত হন। এই সম্মিলনকে অনেকে স্রেফ একটি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক কনফারেন্স বা মুসলিম উম্মাহর বার্ষিক সভা হিসেবে বর্ণনা করতে পছন্দ করেন। সমসাময়িক অনেক চিন্তাবিদ ও মুসলিম নেতার লেখায় এমন ধারণাই ফুটে ওঠে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, হজের মূল তাৎপর্য কি সত্যিই কেবল পারস্পরিক পরিচিতি বা রাজনৈতিক ঐক্য?
প্রখ্যাত আলেম সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.)-এর মতে, হজকে যদি কেবল একটি সম্মেলন হিসেবে বিবেচনা করা হতো, তবে এর আমলগুলোর ধরন সম্পূর্ণ ভিন্ন হতো। কোনো সম্মেলনের জন্য প্রয়োজন স্থিরতা এবং দীর্ঘ সময় এক স্থানে অবস্থান, যাতে আলোচনা-পর্যালোচনা ও মতবিনিময়ের পর্যাপ্ত সুযোগ থাকে। অথচ হজের মূল প্রকৃতিই হলো অবিরাম স্থান পরিবর্তন ও গতিময়তা। মিনা থেকে আরাফা, আরাফা থেকে মুযদালিফা—এই যে নিরন্তর ছুটে চলা, তা কোনো কনফারেন্সের পরিবেশের অনুকূল নয়।
যদি হজ কোনো বিশেষ রাজনৈতিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য হতো, তবে এর দাওয়াত কেবল আলিম-উলামা, রাজনীতিবিদ বা সমাজনেতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতো। কিন্তু হজের বিধান অত্যন্ত সর্বজনীন। সামর্থ্যবান হলে একজন সাধারণ দিনমজুর থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তি—সবার জন্যই হজ ফরজ। পবিত্র কোরআনের ঘোষণা অনুযায়ী, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কাবা শরীফের হজ করা মানুষের ওপর একটি অবশ্য পালনীয় কর্তব্য (সুরা আলে ইমরান, ৯৭)।
হজের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের মাঝে ঐক্য ও সংহতি তৈরি হওয়া একটি প্রশংসনীয় উপকারিতা বা বাই-প্রোডাক্ট হতে পারে, কিন্তু এটি হজের মূল লক্ষ্য নয়। হজের প্রকৃত স্বাদ নিহিত রয়েছে আল্লাহর প্রতি নিরঙ্কুশ আনুগত্য, নিজের আমিত্ব বিসর্জন দিয়ে লাব্বাইক ধ্বনিতে তাঁর দরবারে হাজিরা দেওয়া এবং আধ্যাত্মিক শুদ্ধি অর্জনের মাঝে।
হজকে একটি সম্মেলন বা রাজনৈতিক জোট গঠনের সুযোগ হিসেবে দেখা এক ধরণের খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গি। যারা একে কেবল একটি 'গ্লোবাল সামিট' হিসেবে দেখেন, তারা হজের রূহ বা প্রাণভোমরা থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছেন। হজ মূলত মহান রবের সামনে বান্দার চরম অসহায়ত্ব ও সমর্পণের এক চূড়ান্ত পরীক্ষা, যা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই নির্দিষ্ট।
জা. অর্থনীতি/ উমর