Print Date & Time : 08 November 2026 Sunday 06:15 am

বিশ্বকাপ ইতিহাসের সেরা ১০ অতন্দ্র প্রহরী

image

ফুটবলে গোল মানেই উল্লাস, রঙিন গ্যালারি আর আনন্দের বিস্ফোরণ। কিন্তু একটি অবিশ্বাস্য সেভও কখনও কখনও হাজার গোলের চেয়েও বেশি স্মরণীয় হয়ে থাকে। কারণ গোলরক্ষকরা শুধু বল ঠেকান না— তারা বাঁচিয়ে রাখেন একটি দেশের স্বপ্ন, কোটি মানুষের কান্না আর বিশ্বাস। বিশ্বকাপের ইতিহাসে কিছু গোলরক্ষক আছেন যারা নিজেদের দুই হাত দিয়ে লিখেছেন অমরত্বের গল্প। বিশ্বকাপের ইতিহাসের তেমনই ১০ অতন্দ্র প্রহরীর দিকে আলোকপাত করা যাক।

গর্ডন ব্যাংকস (ইংল্যান্ড)
১৯৭০ বিশ্বকাপ। প্রতিপক্ষ ব্রাজিল। পেলের হেড সবাই যখন গোল ধরে নিয়েছিল ঠিক তখনই আকাশে উড়ে গিয়ে অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন ইংল্যান্ডের গর্ডন ব্যাংকস। সেই সেভ আজও ‘সেভ অব দ্য সেঞ্চুরি’ নামে পরিচিত। আর ১৯৬৬ বিশ্বকাপে তো তার হাত ধরেই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ইংল্যান্ড। ব্যাংকস যেন গোলবারের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা এক শান্ত যোদ্ধা যার চোখে ছিল আগাম ভবিষ্যৎ দেখার ক্ষমতা।

দিনো জফ (ইতালি)
১৯৮২ বিশ্বকাপে ৪০ বছর বয়সি দিনো জফ যখন ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছিলেন তখন মনে হয়েছিল অভিজ্ঞতা কখনও বৃদ্ধ হয় না। ইতালির ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির একের পর এক গতিময় আক্রমণ ঠেকিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ইতালির দেয়াল। জফের মধ্যে কোনো নাটকীয়তা ছিল না। ছিল শুধু নিখুঁত সিদ্ধান্ত আর অবিচল স্থিরতা— যেন ঝড়ের মাঝেও অটল দাঁড়িয়ে থাকা বাতিঘর।

পিটার স্মাইকেল (ডেনমার্ক)
বিশ্বকাপ জিততে না পারলেও ডেনমার্কের গোলবারে পিটার স্মাইকেল ছিলেন ভয়ংকর এক উপস্থিতি। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিপক্ষে তার একের পর এক সেভ এখনও কিংবদন্তি হয়ে আছে। তার বিশাল শরীর, বজ্রকণ্ঠ আর আক্রমণ ঠেকানোর ক্ষমতা দেখে মনে হতো গোলপোস্টের সামনে যেন এক পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে। ইংলিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কিংবদন্তি এই গোলরক্ষক চাপের মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ সেভ করার অসাধারণ ক্ষমতার কারণে বেশ পরিচিত ছিলেন।

ইকার ক্যাসিয়াস (স্পেন)
২০১০ বিশ্বকাপ ফাইনাল। প্রতিপক্ষ নেদারল্যান্ডসের আর্জেন রোবেন একা ছুটে যাচ্ছেন গোলের দিকে। পুরো স্টেডিয়াম নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে। দমবন্ধ এক পরিস্থিতি। এরপর যা হলো— পা বাড়িয়ে স্পেনকে বাঁচিয়ে দেন ইকার ক্যাসিয়াস নামের এক বাজপাখি। যাকে ‘সুপার ইকার’ নামেই চেনে ফুটবল বিশ্ব। সেই একটি সেভ বদলে দিয়েছিল ইতিহাস। স্পেন প্রথমবারের মতো জিতেছিল বিশ্বকাপ। ক্যাসিয়াস ছিলেন সেই স্বপ্নের নীরব রক্ষক।

এডউইন ভ্যান ডার সার (নেদারল্যান্ডস)
নেদারল্যান্ডসের হয়ে এডউইন ভ্যান ডার সার ছিলেন স্থিরতার আরেক নাম। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে তার অসাধারণ কিছু সেভ ডাচদের লড়াইয়ে বাঁচিয়ে রেখেছিল। তার মধ্যে বাড়তি নাটক ছিল না, ছিল নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ। যেন তিনি গোলপোস্টে দাঁড়িয়ে পুরো ম্যাচের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করতেন। খেলা নিয়ন্ত্রণ করা এবং ভুল কম করার দক্ষতা তাকে গোলবারের নিচে অত্যন্ত ভরসাযোগ্য করে তুলেছিল।

অলিভার কান (জার্মানি)
২০০২ বিশ্বকাপে জার্মানির শিরোপা জয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান রাখে অলিভার কান। গোলপোস্টের নিচে যেন দশভূজা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। দলকে একাই ফাইনালে তুলেছিলেন অলিভার কান। বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে সেমিফাইনালে তার সেভগুলো ছিল অবিশ্বাস্য। কানের চোখে ছিল আগুন, চিৎকারে ছিল যুদ্ধের ডাক। তিনি শুধু গোলরক্ষক ছিলেন না, ছিলেন জার্মান মানসিকতার প্রতীক। যা তাকে ইতিহাসের পাতায় স্থান দিয়েছে নির্দ্বিধায়।

মানুয়েল নয়্যার (জার্মানি)
জার্মানির ইতিহাসে অলিভার কানের পর সেরা গোলরক্ষকের তালিকায় পরের নামটি নিশ্চিত ম্যানুয়েল নয়্যার। ২০১৪ বিশ্বকাপে আলজেরিয়ার বিপক্ষে মানুয়েল নয়্যার যেন গোলরক্ষক নন, অতিরিক্ত একজন ডিফেন্ডার ছিলেন। বারবার বক্স ছেড়ে বেরিয়ে এসে আক্রমণ নষ্ট করেছিলেন তিনি। সেই বিশ্বকাপে জার্মানির শিরোপা জয়ে তার অবদান ছিল অনন্য। নয়্যার ফুটবলকে শিখিয়েছেন, গোলকিপার শুধু পোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকে না— সে পুরো মাঠ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

জিয়ানলুইজি বুফন (ইতালি)
ইতালির ইতিহাসে গোলরক্ষক হিসেবে কিংবদন্তির জায়গা দখল করে আছেন বুফন। দীর্ঘদিন দলকে সার্ভিস দেওয়া এই গোলরক্ষকের একটি সেভ আজও জ্বলজ্বলে। ২০০৬ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালে জিনেদিন জিদানের হেড অবিশ্বাস্যভাবে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন বুফন। পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র দুই গোল হজম করে ইতালিকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন করেছিলেন তিনি। বুফনের চোখে ছিল শান্তি অথচ তার ভেতরে ছিল অদম্য সাহস। তাকে বলা হতো ইতালির হৃদস্পন্দন।

লেভ ইয়াশিন (সোভিয়েত ইউনিয়ন)
বিশ্বকাপ ফুটবলের সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কারের নাম ‘লেভ ইয়াশিন ট্রফি’। আর এই পুরস্কার যারা নামে, তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের লেভ ইয়াশিন। অখ্যাত হয়েও বিখ্যাত হয়ে আছেন যিনি। ‘ব্ল্যাক স্পাইডার’ নামে পরিচিত লেভ ইয়াশিন গোলকিপিংয়ের সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছিলেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন জাতীয় ফুটবল দলের হয়ে ১৯৬৬ বিশ্বকাপে তার পারফরম্যান্স বিশ্বকে দেখিয়েছিল, একজন গোলরক্ষকও ম্যাচের নায়ক হতে পারেন। কালো পোশাকে দাঁড়িয়ে থাকা ইয়াশিনকে দেখে মনে হতো, যেন জালে বসে থাকা এক বিশাল মাকড়সা যার হাত ফসকে বল বের হওয়া অসম্ভব।

এমিলিয়ানো মার্টিনেজ (আর্জেন্টিনা)
২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনাল। শেষ মুহূর্ত। ফ্রান্সের র‍্যান্ডাল কোলো মুয়ানির সামনে কেবল এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। জাল লক্ষ্য করেই মুয়ানি শট নিয়েছিলেন। একই সঙ্গে ফ্রান্সের সমর্থকরাও চিৎকার দিয়ে উঠেছিল। পরক্ষণেই যা হলো সেটাক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ পরবর্তী সময়ে আখ্যা দিয়েছিলেন ‘ঈশ্বর তাকে দিয়েই স্বয়ং এই শট ঠেকিয়ে দিয়েছিলেন’। সেদিন পা বাড়িয়ে পুরো পৃথিবী থামিয়ে দিয়েছিলেন মার্টিনেজ। এরপর টাইব্রেকারে তার মানসিক যুদ্ধ আর সেভ এনে দেয় আর্জেন্টিনাকে তৃতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা আর মেসিকে অমরত্ব। মার্টিনেজ শুধু গোল বাঁচাননি, তিনি কোটি আর্জেন্টাইন হৃদয়ের অপূর্ণ স্বপ্নপূরণ করেছিলেন।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে গোলরক্ষকরা অনেক সময় আলোচনার আড়ালে থাকেন। কিন্তু যখন ট্রফি জয়ের মুহূর্ত আসে তখনই পাল্টে যায় তাদের সংজ্ঞা। একজন গোলরক্ষকের দুটি হাত পুরো জাতির ইতিহাস বদলে দিতে পারে। এই কিংবদন্তিরা আমাদের শিখিয়েছেন, ফুটবলে নায়ক শুধু গোলদাতারা নন। কখনও কখনও নায়ক হন সেই মানুষটিও, জালে ঘেরা আট ফুট কাঠির নিচে দাঁড়িয়ে যিনি হয়ে ওঠেন দেশের পতাকার ‘অতন্দ্র প্রহরী’।