Print Date & Time : 07 November 2026 Saturday 10:59 pm

যে সুরে কাঁপে পুরো পৃথিবী

image

মিনহাজ ইসলাম: ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু একটি খেলার আসর নয়; এটি আবেগ, সংস্কৃতি, উন্মাদনা আর বৈশ্বিক মিলনের এক মহোৎসব। প্রতি চার বছর পরপর বিশ্বকাপ এলে পৃথিবীর কোটি মানুষ এক সুরে, এক আবেগে মেতে ওঠে। আর এই আবেগকে আরও গভীর করে তোলে বিশ্বকাপের থিম সং বা অফিসিয়াল গান। মাঠের উত্তেজনার বাইরে বিশ্বকাপের গানগুলোই যেন টুর্নামেন্টের প্রাণ হয়ে ওঠে। কখনও নাচের তালে, কখনও অনুপ্রেরণার কথায় আবার কখনও ঐক্যের বার্তায় এই গানগুলো জায়গা করে নেয় কোটি মানুষের হৃদয়ে।

বিশ্বকাপের থিম সংয়ের ইতিহাস অনেক পুরোনো। তবে ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপের গান ‘উনিএস্টেট ইটালিয়ানা’ বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় হওয়ার পর থেকেই বিশ্বকাপের গান আলাদা গুরুত্ব পেতে শুরু করে। ইতালীয় শিল্পী এদোয়ার্দো বেনাতো ও জিয়ানা নানিনির কণ্ঠে গাওয়া এই গান আজও অনেক ফুটবলপ্রেমীর কাছে নস্টালজিয়ার প্রতীক। গানটির সুরে ছিল আবেগ, স্বপ্ন আর ফুটবল উৎসবের এক অনন্য অনুভূতি।

এরপর বিশ্বকাপের গান ধীরে ধীরে বৈশ্বিক পপ সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে। ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে রিকি মার্টিনের গাওয়া ‘দ্য কাপ অব লাইফ’ যেন নতুন এক যুগের সূচনা করে। ‘গো গো গো! আলেহ আলেহ আলেহ!’—এই লাইনগুলো এখনও ফুটবলপ্রেমীদের মুখে মুখে ফেরে। দ্য কাপ অব লাইফ- যার স্প্যানিশ অর্থ ছিল ‘লা কোপা ডে লা ভিদা’। ইংরেজি এবং স্প্যানিশ ভাষার এই গানটি পুয়ের্তো রিকান  শিল্পী  রিকি মার্টিনের ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। বিশ্বব্যাপী ব্যাপকভাবে সমাদৃত ছিল গানটি।

১৯৯৮ বিশ্বকাপে ব্রাজিল এবং ফ্রান্সের মধ্যকার ফাইনালের আগে গানটি পরিবেশন করেন রিকি মার্টিন। প্রাণবন্ত লাতিন বিট আর উদ্দীপনাময় পরিবেশনার কারণে গানটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম জনপ্রিয় থিম সংয়ে পরিণত হয়। শুধু ফুটবল নয়, এই গান বিশ্বজুড়ে পার্টি ও ক্রীড়া আয়োজনেরও জনপ্রিয় সংগীতে পরিণত হয়েছিল।

২০০২ সালের বিশ্বকাপ যৌথভাবে আয়োজন করে এশিয়ার দুই দেশ জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়া। বুম নামের ফিফার আনুষ্ঠানিক থিম গানটি ছিল আমেরিকান সংগীত শিল্পী অ্যানাসটেসিয়ার গাওয়া। গানটির মিউজিক ভিডিও তৈরি করেন মার্কোস সিয়েগা, মিউজিক ভিডিওটি ধারণ করা হয়েছে লন্ডনে।

২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপেও সংগীতপ্রেমীরা পেয়েছিল ভিন্ন স্বাদ। দ্য টাইম অব আওয়ার লিভস গানটি গেয়েছিলেন। সুইডিশ-জার্মান গীতিকবি জর্জেন এলোফসনের লেখা গানটির প্রযোজনায় ছিলেন স্টিভ ম্যাক। গানটি গেয়েছিল পপ মিউজিক ব্র্যান্ড ডিভো এবং আমেরিকান শিল্পী টনি ব্র্যাক্সটন। গানটির মিউজিক ভিডিও ধারণ করা হয়েছিল একটি ফুটবল মাঠে যার পরিচালনায় ছিলেন নাইজেল ডিক। গানটিতে ছিল আবেগ, গর্ব এবং বিশ্বকাপের মহিমা। যদিও এটি আগের গানগুলোর মতো অতটা নাচের তালে জনপ্রিয় হয়নি তবে ফুটবলের আবেগকে সুন্দরভাবে তুলে ধরেছিল।

বিশ্বকাপ থিম সংয়ের সবচেয়ে বড় বিস্ফোরণ ঘটে ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে। কলম্বিয়ান পপ তারকা শাকিরার গাওয়া ‘ওয়াকা ওয়াকা, দিস টাইম ফর আফ্রিকা’ শুধু একটি গান ছিল না; এটি ছিল বৈশ্বিক উন্মাদনা। আফ্রিকান ছন্দ, প্রাণবন্ত নাচ আর অনুপ্রেরণামূলক কথার কারণে গানটি কোটি মানুষের হৃদয় জয় করে নেয়। ইউটিউবে বিলিয়ন ভিউ পাওয়া এই গান এখনও বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় থিম সং হিসেবে বিবেচিত হয়। ‘দিস টাইম ফর আফ্রিকা’ এই লাইন যেন পুরো আফ্রিকা মহাদেশের গর্ব হয়ে উঠেছিল।

২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপের গান ‘উই আর ওয়ান, ওলে ওলা’-এ দেখা যায় লাতিন ও পপ সংগীতের মিশ্রণ। স্প্যানিশ, পর্তুগিজ এবং ইংরেজি ভাষায় রচিত গানটিতে কণ্ঠ দেন জনপ্রিয় মার্কিন গায়ক পিটবুল, জেনিফার লোপেজ এবং ক্লদিয়া নিরেট। যদিও এই গানটি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ছিল, তবুও বিশ্বকাপের উন্মাদনায় এটি বেশ জনপ্রিয়তা পায়। ব্রাজিলের সাম্বা সংস্কৃতির ছোঁয়া গানটিকে প্রাণবন্ত করে তুলেছিল।

২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপের অফিসিয়াল গান ছিল লিভ ইট আপ। সনি মিউজিকের প্রযোজনায় ইংরেজি, স্প্যানিশ এবং রুশ ভাষা মিশ্রিত এই গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন মার্কিন গায়ক নিকি জ্যাম, র‍্যাপার অভিনেতা উইল স্মিথ এবং কসোভোর নাগরিক ইরা ইজত্রেফাই। আধুনিক পপ ও ইলেকট্রনিক বিটে তৈরি গানটি তরুণদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়। যদিও অনেকেই মনে করেন এটি আগের বিশ্বকাপ সংগীতগুলোর আবেগ ছুঁতে পারেনি, তবুও বাণিজ্যিকভাবে এটি সফল ছিল।

২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ ছিল সংগীতের দিক থেকেও ব্যতিক্রম। একাধিক অফিসিয়াল গান প্রকাশ করে নতুন ধারা তৈরি করে আন্তর্জাতিক ফুটবল নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বা ফিফা। কাতার বিশ্বকাপের থিম সং হিসেবে ফিফা প্রকাশিত প্রথম অফিসিয়াল সাউন্ডট্র্যাকটির শিরোনাম ‘হায়া হায়া (বেটার টুগেদার)। গানটি তৈরি করা হয় তিন সংগীতশিল্পীকে নিয়ে।

মার্কিন গায়ক ত্রিনিদাদ কার্দোনা, জাপানি গায়িকা আইশা এবং নাইজেরিয়ান বংশোদ্ভূত মার্কিন গায়ক ডেভিড আদেদেজি-তিন ঘরানার এই তিনজন মিলে গানটি করেছেন। গানটিতে বিভিন্ন সংস্কৃতির সংগীতের মিশ্রণ ছিল যা বিশ্বকাপের বৈশ্বিক ঐক্যের বার্তা তুলে ধরে। ‘হায়া হায়া’ প্রকাশের চার মাসের মাথায় ফিকা প্রকাশ করে ‘আরবো’ গানটি। পুয়ের্তোরিকান শিল্পী ওজুনা এবং কঙ্গো বংশোদ্ভূত ফরাসি র‌্যাপার গিমস। প্রকাশের পর সমালোচক ও শ্রোতাদের কাছ থেকে বেশ ভালোই সাড়া পেয়েছে গানটি, অনেকেই গানটিকে বলছেন

২০২২ বিশ্বকাপের সবচেয়ে ভালো গান। ফিফা তৃতীয় চমক নিয়ে হাজির হয় ২০২২ সালের ৭ অক্টোবর। প্রকাশ পায় বিশ্বকাপের অফিসিয়াল তৃতীয় সাউন্ডট্র্যাক ‘লাইট ইন দ্য স্কাই’। বলিউড মাতানো মরোক্কান বংশোদ্ভূত নৃত্যশিল্পী নোরা ফাতেহি আর সংগীতের এক ঝাঁক নারী সেলিব্রেটি মিলে তৈরি করেছেন গানটি। নোরা ছাড়াও আরবীয় গানের সুরে সাউন্ডট্র্যাকটি আছেন আমিরাতের বালকিস, ইরাকি শিল্পী রাহমা রিয়াদ এবং মরক্কোর গীতিকার ও শিল্পী মানাল বেঞ্চলিখা।

গানটির প্রযোজনা করেছে রেডওয়ান। ২০১০ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের তুমুল জনপ্রিয় গান ‘ওয়াকা ওয়াকা’ তারাই প্রযোজনা করেছিল। ইংরেজি, হিন্দি ও মরোক্কনা ভাষার থিম সংকে একটি অনুপ্রেরণামূলক গান হিসেবে বর্ণনা করে রেডওয়ান বলেছে, গানটি সব বয়সের ফুটবলপ্রেমী ও সংগীতপ্রিয় মানুষের মধ্যে মেলবন্ধন ঘটাবে।

বিশ্বকাপের গান শুধু বিনোদনের জন্য নয়; এগুলো অনেক সময় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বার্তাও বহন করে। ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব, সংগ্রাম, স্বপ্ন আর মানবিক সংযোগের বিষয়গুলো ফুটে ওঠে এসব গানে। ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি আর ভিন্ন দেশের মানুষকে একই সুরে একত্রিত করার এক অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে বিশ্বকাপ থিম সংয়ে।

বিশ্বকাপের গান নিয়ে বিতর্কও কম হয়নি। অনেক সময় আয়োজক দেশের সংস্কৃতি যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি বলে সমালোচনা উঠেছে। আবার কোনো কোনো গান অতিরিক্ত বাণিজ্যিক হয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবুও বিশ্বকাপের প্রতিটি গানই টুর্নামেন্টের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে যায়। কোনো বিশ্বকাপের কথা মনে পড়লে সেই আসরের গানও ভেসে ওঠে মানুষের মনে।

বাংলাদেশেও বিশ্বকাপের থিম সংগুলোর জনপ্রিয়তা ব্যাপক। বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টেলিভিশন কিংবা চায়ের দোকানে বাজতে থাকে সেই আসরের গান। অনেক তরুণ গানের সঙ্গে নাচের ভিডিও তৈরি করেন, কেউ আবার প্রিয় দলের জার্সি পরে গান গেয়ে উদযাপন করেন ফুটবল উৎসব। 

বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যায়, ট্রফি বদলে যায়, নতুন চ্যাম্পিয়ন আসে। কিন্তু কিছু গান থেকে যায় মানুষের স্মৃতিতে। সময় পেরিয়ে গেলেও সেই সুর শুনলেই মনে পড়ে যায় প্রিয় গোল, প্রিয় ম্যাচ কিংবা আনন্দ-হতাশার মুহূর্তগুলো। এ কারণেই বিশ্বকাপের থিম সং শুধু গান নয়; এটি ফুটবল ইতিহাসেরই এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেই সুরেই চার বছর পরপর আবার জেগে ওঠে পুরো পৃথিবী।