Print Date & Time : 23 October 2026 Friday 09:37 pm

বেকেনবাওয়ার: ফুটবলের পরশমণি

image

মিউনিখ শহরের এক সাধারণ ডাককর্মী ছেলের নাম রেখেছিলেন ফ্রাঞ্জ! নামটি নেওয়া হয়েছিল অস্ট্রিয়ার সম্রাট ফ্রাঞ্জ জোসেফের নাম থেকে। হয়তো বাবার স্বপ্ন ছিল, তার ছেলেও একদিন জীবনে বড় কিছু হবে। কিন্তু শুধু সম্রাটের নামে নাম রাখলেই তো কেউ সম্রাট হয়ে ওঠে না। পৃথিবীতে অসংখ্য আকবর, বাবর কিংবা আলেক্সান্ডার আছেন, যাদের জীবন কেটেছে সাধারণ মানুষের মতোই। তবে ফ্রাঞ্জ নামের এই ছেলেটি ব্যতিক্রম ছিলেন। তিনি শুধু নামের মর্যাদাই রাখেননি, এক সময় সত্যিকারের সম্রাটে পরিণত হয়েছিলেন ফুটবলের রাজ্যে।

মানুষ তাকে ডাকতে শুরু করেছিল ‘হের কাইজার’ নামে-জার্মানির সম্রাট। সেই মানুষটি ফ্রাঞ্জ অ্যান্টন বেকেনবাওয়ার। অনেকের চোখে তিনি শুধু জার্মানির নন, সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার। বেকেনবাওয়ারকে ফুটবলের পরশমণি বললেও অত্যুক্তি হয় না। কারণ তিনি যেখানে হাত দিয়েছেন, সেখানেই সোনা ফলেছে। খেলোয়াড় হিসেবে জিতেছেন অসংখ্য শিরোপা, জাতীয় দলের হয়ে অর্জন করেছেন ফুটবলের প্রায় সব বড় সাফল্য। আবার কোচ হয়েও জিতেছেন বিশ্বকাপ। সংগঠক হিসেবেও রেখে গেছেন অমলিন ছাপ।

তবে তার সাফল্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল অংশ দুটি বিশ্বকাপ। একটি খেলোয়াড় ও অধিনায়ক হিসেবে, অন্যটি কোচ হিসেবে। ফুটবল ইতিহাসে এই কীর্তি গড়া একমাত্র মানুষ ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার।

১৯৪৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জার্মানির মিউনিখে জন্ম নেওয়া বেকেনবাওয়ার শুরু করেছিলেন মিডফিল্ডার হিসেবে। পরে ডিফেন্ডার হিসেবে পরিচিতি পেলেও তিনি আসলে খেলতেন লিবারো ভূমিকায়। আধুনিক ফুটবলে যে রক্ষণভাগের খেলোয়াড়রা আক্রমণে উঠে এসে খেলার ছন্দ বদলে দেন, সেই ধারণার অন্যতম পথিকৃৎ ধরা হয় বেকেনবাওয়ারকে। আজকের দিনে লিবারো পজিশন খুব পরিচিত হলেও তার সময় এটি ছিল একেবারে নতুন চিন্তা। রক্ষণে প্রাচীর হয়ে দাঁড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনে আক্রমণেও যোগ দিতেন তিনি।

একজন ডিফেন্ডার হয়েও তার গোলসংখ্যা ছিল বিস্ময়কর। ক্লাব ফুটবলে ৫৮৭ ম্যাচে করেছেন ৮১ গোল। আর জাতীয় দলের হয়ে ১০৩ ম্যাচে ১৪ গোল। শুধু সংখ্যাই নয়, তার বেশিরভাগ গোলই এসেছে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে।

১৯৯৯ সালে ইউরোপের সর্বকালের দ্বিতীয় সেরা ফুটবলার নির্বাচিত হয়েছিলেন বেকেনবাওয়ার। তার ওপরে ছিলেন কেবল ইয়োহান ক্রুইফ। এটি প্রমাণ করে, ফুটবল বিশ্বে তার মর্যাদা কতটা উঁচুতে ছিল।

ক্লাব ফুটবলে বেকেনবাওয়ার মানেই বায়ার্ন মিউনিখ। যদিও ক্যারিয়ারের শেষদিকে নিউইয়র্ক কসমস ও হামবুর্গের হয়ে খেলেছেন, তবু তার পরিচয়ের সবচেয়ে বড় অংশজুড়ে আছে বায়ার্ন। ক্লাবটির হয়ে খেলেছেন ৪২৭ ম্যাচ। এই সময়ে চারবার জিতেছেন বুন্দেসলিগা। তবে তার চেয়েও বড় অর্জন, টানা তিনবার ইউরোপিয়ান কাপ জয়—১৯৭৪, ১৯৭৫ ও ১৯৭৬ সালে। এ ছাড়া কাপ উইনার্স কাপ ও ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপও জিতেছেন।

বায়ার্নের জার্সিতে খেলতে খেলতেই দুবার ইউরোপিয়ান বর্ষসেরা ফুটবলারের পুরস্কার জিতেছিলেন তিনি-১৯৭২ ও ১৯৭৬ সালে। পরে এই বায়ার্নেরই কোচ হন। কোচ হিসেবেও জেতেন বুন্দেসলিগা ও ইউরোপের সর্বোচ্চ ক্লাব ট্রফি। অর্থাৎ খেলোয়াড় এবং কোচ-দুই ভূমিকাতেই সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছেছিলেন তিনি।

বিশ্বকাপে বেকেনবাওয়ারের উপস্থিতি ছিল অবিশ্বাস্য রকম ধারাবাহিক। খেলোয়াড় ও কোচ হিসেবে মোট পাঁচটি বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে চারবার ফাইনালে উঠেছেন, আর একবার দল হয়েছে তৃতীয়। অর্থাৎ বিশ্বকাপে কখনই সেরা তিনের বাইরে শেষ করেননি তিনি।

১৯৬৬ বিশ্বকাপে তার বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু। ফাইনালে ইংল্যান্ডের কাছে হেরে যায় পশ্চিম জার্মানি। কিন্তু মাত্র ২০ বছর বয়সি বেকেনবাওয়ার নিজের প্রতিভার জানান দিয়েছিলেন সেই আসরেই। চার গোল করে যৌথভাবে টুর্নামেন্টের তৃতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছিলেন এই তরুণ ডিফেন্ডার।

১৯৭০ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের কাছে আগের আসরের হারের প্রতিশোধ নেয় পশ্চিম জার্মানি। বেকেনবাওয়ার ও গার্ড মুলারদের দল ইংল্যান্ডকে হারিয়ে সেমিফাইনালে ওঠে। কিন্তু ইতালির বিপক্ষে সেমিফাইনালে জন্ম নেয় বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা ম্যাচ-‘গেম অব দ্য সেঞ্চুরি’।
সেই ম্যাচে কাঁধের হাড় সরে যাওয়ার পরও মাঠ ছাড়েননি বেকেনবাওয়ার। গলায় হাত ঝুলিয়ে পুরো ম্যাচ খেলেছিলেন তিনি। ৯০ মিনিট পর্যন্ত ১-০ গোলে এগিয়ে ছিল জার্মানি। পরে ইতালি সমতা ফেরায়। অতিরিক্ত সময়ে দুই দল মিলে আরও পাঁচ গোল করে। শেষ পর্যন্ত ৪-৩ ব্যবধানে জিতে ফাইনালে ওঠে ইতালি। পশ্চিম জার্মানি পরে উরুগুয়েকে হারিয়ে তৃতীয় স্থান অর্জন করে।

দুটি বিশ্বকাপের আক্ষেপ ঘুচে যায় ১৯৭৪ সালে। নিজেদের মাটিতে অনুষ্ঠিত সেই বিশ্বকাপে বেকেনবাওয়ারের জার্মানি ছিল দুর্দান্ত। ফাইনালে প্রতিপক্ষ ইয়োহান ক্রুইফের নেদারল্যান্ডস। ফুটবল বিশ্ব তখন দুই দলের কাছ থেকেই দেখছিল নতুন এক ফুটবলের রূপ। শেষ পর্যন্ত জয়ী হয় বেকেনবাওয়ারের জার্মানি। অধিনায়ক হিসেবে বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে তোলেন তিনি।

খেলোয়াড়ি জীবন শেষে কোচ হিসেবেও সমান সফল ছিলেন বেকেনবাওয়ার। ১৯৮৬ ও ১৯৯০ বিশ্বকাপে জার্মানির কোচ ছিলেন তিনি। দুবারই তার দল ফাইনালে মুখোমুখি হয় আর্জেন্টিনার। ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনার কাছে হারলেও ১৯৯০ সালে প্রতিশোধ নেয় জার্মানি। কোচ হিসেবে জেতেন বিশ্বকাপ। এ ছাড়া তার কোচিংয়ে জার্মানি একটি ইউরো জেতে এবং একবার রানার্সআপ হয়।
সংগঠক হিসেবেও অনন্য ছিলেন বেকেনবাওয়ার। ২০০৬ বিশ্বকাপের আয়োজক কমিটির প্রধান ছিলেন তিনি। সেই বিশ্বকাপ আয়োজন করে জার্মানি দেখিয়ে দিয়েছিল, ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর কীভাবে সফলভাবে পরিচালনা করতে হয়।

ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারের উচ্চতা ছিল ৫ ফুট ১১.৫ ইঞ্চি। পজিশন ছিল সুইপার। খেলেছেন বায়ার্ন মিউনিখ, নিউইয়র্ক কসমস ও হামবুর্গের হয়ে। ১৯৭২ সালে জিতেছেন ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ এবং ১৯৭৪ সালে বিশ্বকাপ।

ফুটবলে এমন মানুষ খুব কমই এসেছেন, যিনি খেলোয়াড়, অধিনায়ক, কোচ ও সংগঠক-সব ভূমিকাতেই ইতিহাস লিখেছেন। তাই তো আজও তাকে শুধু ফুটবলার বলা হয় না। তাকে বলা হয়—‘কাইজার’।

একনজরে
পুরো নাম: ফ্রাঞ্জ অ্যান্টন বেকেনবাওয়ার
জন্ম: ১১ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৫
জন্মস্থান: মিউনিখ
দেশ: জার্মানি উচ্চতা : ৫ ফুট ১১.৫ ইঞ্চি পজিশন : সুইপার
ক্লাব: বায়ার্ন মিউনিখ, নিউইয়র্ক কসমস, হামবুর্গ বিশ্বকাপ জয় : ১৯৭৪
ইউরো জয়: ১৯৭২
ইউরোপিয়ান কাপ: ১৯৭৩-৭৪, ১৯৭৪-৭৫, ১৯৭৫-৭৬