Print Date & Time : 07 November 2026 Saturday 03:59 pm

গোলে-গৌরবে বিশ্বমঞ্চ কাঁপানো মেজ্জা

image

১৯৩০ সালে বিশ্বকাপ ফুটবলের সূচনা হলেও ইতালি তখনো নিজেদের প্রকৃত শক্তি দেখাতে পারেনি। কিন্তু চার বছর পর পরিস্থিতি বদলে যায়। আর সেই বদলের কেন্দ্রে ছিলেন এক বিস্ময়কর স্ট্রাইকার-জিউসেপ্পি মেজ্জা। যিনি শুধু ইতালিকে বিশ্বচ্যাম্পিয়নই বানাননি, বরং হয়ে উঠেছিলেন ১৯৩০-এর দশকের ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় তারকাদের একজন।

আজও ইতালির ফুটবল ইতিহাসে তার নাম উচ্চারণ করা হয় শ্রদ্ধা আর বিস্ময়ে। কারণ তিনি ছিলেন এমন এক ফরোয়ার্ড, যার পায়ে গোল ছিল শিল্প, আর নেতৃত্ব ছিল প্রেরণার অন্য নাম।

১৯১০ সালের ২৩ আগস্ট ইতালির মিলান শহরে জন্ম নেন জিউসেপ্পি মেজ্জা। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি ছিল তার গভীর ভালোবাসা। কৈশোর পেরোতেই জায়গা করে নেন ইতালির ঐতিহ্যবাহী ক্লাব ইন্টার মিলানে, যেটি তখন ইন্টারন্যাসিওনালে নামে পরিচিত ছিল।

১৯২৭ সালে ক্লাবের হয়ে অভিষেকের পর শুরু হয় এক বিস্ময়কর অধ্যায়। ১৯৪০ সাল পর্যন্ত ইন্টারের হয়ে ৩৪৮ ম্যাচে ২৪১ গোল করেন তিনি। এরপর খেলেছেন এসি মিলান, জুভেন্টাস, ভেরিস ও আটলান্টার মতো ক্লাবে। ১৯৪৬ সালে আবারও ফিরে আসেন ইন্টারে। পুরো ক্লাব ক্যারিয়ারে ৪৬৩ ম্যাচে করেন ২৭১ গোল-যা সে সময়ের ফুটবলে ছিল অবিশ্বাস্য অর্জন।

মেজ্জা ছিলেন কেবল গোলস্কোরার নন; তিনি ছিলেন এক সম্পূর্ণ আক্রমণ ভাগের শিল্পী। ড্রিবলিং, গতি, পাসিং, ফিনিশিং-সবকিছুতেই ছিল অসাধারণ দক্ষতা। অনেক ফুটবল ইতিহাসবিদ তাকে তার প্রজন্মের সেরা ফুটবলার বলেও মনে করেন।

ইতালির জাতীয় দলে তার অভিষেক হয় ১৯৩০ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি, মাত্র ১৯ বছর বয়সে। প্রতিপক্ষ ছিল সুইজারল্যান্ড। অভিষেক ম্যাচেই নিজের সামর্থ্যের জানান দেন তিনি। ইতালি ৪-২ গোলে জেতে, আর মেজ্জা করেন দুই গোল। ম্যাচের ৩৭ ও ৩৯ মিনিটে জোড়া গোল করে ইতালিয়ান ফুটবলে নিজের আগমনী বার্তা পৌঁছে দেন তিনি।

এরপর আর থামতে হয়নি। পরের ম্যাচে জার্মানিকে ২-০ গোলে হারায় ইতালি। একই বছরের ১১ মে হাঙ্গেরির বিপক্ষে করেন দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক। ইতালি জেতে ৫-০ ব্যবধানে। সেই বছরই ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ খ্যাত ডা. জেরো কাপও জেতে ইতালি।

১৯৩১ সালের ২৫ জানুয়ারি ফ্রান্সের বিপক্ষেও আবার হ্যাটট্রিক করেন মেজ্জা। ফলাফলও আগের মতো ৫-০। তখনই পরিষ্কার হয়ে যায়, ইতালি নতুন এক সুপারস্টার পেয়েছে।

১৯৩৪ সালে নিজেদের মাটিতে প্রথমবার বিশ্বকাপ আয়োজন করে ইতালি। সেই বিশ্বকাপেই বিশ্বমঞ্চে সত্যিকার অর্থে বিস্ফোরণ ঘটান মেজ্জা। মিলানে অনুষ্ঠিত প্রথম ম্যাচে ৪-০ গোলের বড় জয় পায় ইতালি। বিশ্বকাপে নিজের অভিষেক ম্যাচেও দুই গোল করেন এই ফরোয়ার্ড।

পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে দুর্দান্ত খেলেন তিনি। যদিও সেমিফাইনালে চোট পাওয়ার কারণে ফাইনালে পুরোপুরি ফিট ছিলেন না। তবু চেকোস্লভিাকিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে ইতালি জিতে নেয় প্রথম বিশ্বকাপ। আর মেজ্জা জিতে নেন গোল্ডেন বল। সেটিই প্রমাণ করে, সেই বিশ্বকাপের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারকা ছিলেন তিনিই।

ইউরোপের প্রথম দেশ হিসেবে বিশ্বকাপ জয়ের পর ইতালিকে নিয়ে আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। চার বছর পর ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত ১৯৩৮ বিশ্বকাপেও ইতালির আধিপত্য বজায় থাকে। এবার দলের অধিনায়ক ছিলেন মেজ্জা।

বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে নরওয়েকে অতিরিক্ত সময়ে ২-১ গোলে হারায় ইতালি। পুরো টুর্নামেন্টেই নেতৃত্ব দেন সামনে থেকে। মাঠের বাইরে তার জীবনও ছিল বেশ রঙিন। বিশ্বকাপ চলাকালেই দুই ফরাসি সুন্দরীর সঙ্গে সময় কাটানোর গল্প সে সময় ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যমে বেশ আলোচিত হয়েছিল।

সেমিফাইনালে ইতালির প্রতিপক্ষ ছিল ব্রাজিল। সেই ম্যাচে মেজ্জার গোলেই ফাইনালে ওঠে ইতালি। পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত খেলা ব্রাজিলিয়ান গোলরক্ষক ডোমিনগোস ডি গুইয়া ইতালির আক্রমণের সামনে অসহায় হয়ে পড়েন।

ফাইনালে প্রতিপক্ষ আবারও হাঙ্গেরি। সেই ম্যাচে ৪-২ গোলের জয়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন মেজ্জা। টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জেতে ইতালি। আর মেজ্জা হয়ে ওঠেন বিশ্ব ফুটবলের প্রথম দিককার মহাতারকাদের একজন।

জাতীয় দলের হয়ে ৫৩ ম্যাচে ৩৩ গোল করেন তিনি। অবিশ্বাস্য বিষয় হলো, তার খেলা ম্যাচগুলোর মধ্যে ইতালি হেরেছিল মাত্র ছয়টিতে।
১৯৩১ সালের ২০ জুলাই ফিনল্যান্ডের বিপক্ষে নিজের শেষ ম্যাচ খেলেন মেজ্জা। সেই ম্যাচেও ৩-২ গোলে জেতে ইতালি।

১৯৭৯ সালের ২১ আগস্ট, ৬৯ বছর বয়সে ইতালির রোপান্নোতে মারা যান এই কিংবদন্তি ফুটবলার। কিন্তু তার নাম মুছে যায়নি। আজও ইতালির বিখ্যাত স্টেডিয়াম সান সিরোর আনুষ্ঠানিক নাম ‘স্তাদিও জিউসেপ্পি মেজ্জা’—যা প্রমাণ করে, ইতালিয়ান ফুটবলে তার প্রভাব কতটা গভীর।

বিশ্বকাপ ইতিহাসের সেরাদের তালিকায় আজও তার নাম উজ্জ্বল। গোল, নেতৃত্ব, ব্যক্তিত্ব আর বিশ্বজয়ের মহিমায় জিউসেপ্পি মেজ্জা ছিলেন এক অনন্য ফুটবল সম্রাট।

একনজরে
* পূর্ণ নাম: জিউসেপ্পি মেজ্জা
* জন্ম: ২৩ আগস্ট ১৯১০, মিলান, ইতালি
* মৃত্যু: ২১ আগস্ট ১৯৭৯, রোপান্নো, ইতালি
* পজিশন: স্ট্রাইকার
* জাতীয় দল: ইতালি
* জাতীয় দলের ম্যাচ: ৫৩
* জাতীয় দলের গোল: ৩৩
* ক্লাব ক্যারিয়ার: ইন্টার, এসি মিলান, জুভেন্টাস, ভেরিস, আটলান্টা
* ক্লাব গোল: ৪৬৩ ম্যাচে ২৭১ গোল
* বিশ্বকাপ জয়: ১৯৩৪ ও ১৯৩৮
* বিশ্বকাপ গোল্ডেন বল: ১৯৩৪
* পরিচিতি: বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলার