ফুটবল ইতিহাসে কিছু নাম থাকে যারা গোলের জন্য নয়, বরং নেতৃত্বের জন্য অমর হয়ে ওঠে। দিদিয়ের ক্লাউদ দেশম তেমনই এক চরিত্র– যিনি ফ্রান্সের ফুটবল ইতিহাসে শুধু অধিনায়ক নন, বরং এক পুরো যুগের স্থপতি!
১৯৬৮ সালের ১৫ অক্টোবর ফ্রান্সের বায়োনে জন্ম নেওয়া দেশমের শুরুর পথটা কিন্তু সরাসরি ফুটবলে আসেনি। ক্যারিয়ারের শুরুতে তিনি কিছুদিন রাগবি খেলেন, এরপর ধীরে ধীরে পা রাখেন ফুটবলে। উচ্চতা ১ দশমিক ৭৪ মিটার এই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার পরে হয়ে ওঠেন মাঠের ভেতরের এক নিঃশব্দ কমান্ডার।
১৯৮৩ সালে তিনি যোগ দেন ন্যানটেস ক্লাবে। তবে ফরাসি লিগে তার অভিষেক ঘটে ১৯৮৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর। সতীর্থরা তাকে ডাকত ‘দ্য ওয়াটার ক্যারিয়ার’ নামে, কারণ মাঠে তার কাজ ছিল দলের ভারসাম্য বহন করা, নীরবে সব কাজ গুছিয়ে দেওয়া। এরপর তার যাত্রা শুরু হয় ইউরোপজুড়ে ক্লাব ফুটবলের এক দীর্ঘ সফল অধ্যায়ের দিকে। তিনি ১৯৮৯ সালে মার্সেইতে যোগ দেন, ১৯৯০ সালে বোর্দোতে খেলেন, আবার ১৯৯১ সালে ফিরে যান মার্সেইতে!
মার্সেইতে ফিরে এসে দেশমের ক্যারিয়ার সত্যিকারের উজ্জ্বলতা পায়। ১৯৯১ ও ১৯৯২ সালে টানা দু’বার ফরাসি লিগ জয় করেন তিনি। ১৯৯৩ সালে ক্লাবটি ইতিহাস গড়ে প্রথমবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতে, আর সেই দলে অধিনায়কত্বের ভূমিকা ছিল দেশমের কাঁধে। মার্সেই আজও একমাত্র ফরাসি ক্লাব যারা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছে। একই সময়ে তার সতীর্থ ফ্যাবিয়েন বার্থেজ হন সেই ট্রফি জেতা সবচেয়ে কম বয়সি গোলরক্ষক।
এরপর ১৯৯৪ সালে দেশম যোগ দেন ইতালির জুভেন্টাসে। সেখানে তিনি জেতেন তিনটি সিরি-এ শিরোপা, একটি ইতালিয়ান কাপ, দুটি ইতালিয়ান সুপার কাপ এবং আরও একটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা। পাশাপাশি জুভেন্টাসের হয়ে তিনি জেতেন ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপও। পরে এক মৌসুম খেলেন ইংল্যান্ডের চেলসিতে, যেখানে একটি এফএ কাপ জেতেন। এরপর স্পেনের ভ্যালেন্সিয়ায় যোগ দিয়ে ২০০০-০১ মৌসুমে দলকে নিয়ে যান চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে, যদিও তিনি মাঠে নামেননি; ডাগআউটেই ছিলেন। ফাইনালে ভ্যালেন্সিয়া হেরে যায় বায়ার্ন মিউনিখের কাছে। ২০০১ সালে ৪২২ ম্যাচে ১৭ গোল করে ক্লাব ফুটবলকে বিদায় জানান তিনি।
জাতীয় দলে তার অভিষেক হয় ১৯৮৯ সালের ২৯ এপ্রিল, যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে। এর কিছুদিন পরই ফ্রান্সের ফুটবল ইতিহাসে এক কঠিন সময় আসে– টানা দুটি বিশ্বকাপে ব্যর্থতা। সেই সময়েই দেশম ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন দলের ভরসা। ১৯৯৬ সালের ইউরোতে তিনি প্রথমবার অধিনায়কত্ব পান এবং দলকে নিয়ে যান সেমিফাইনালে, যা ছিল ১৯৮৬ সালের পর ফ্রান্সের সেরা অর্জন।
তবে তার আসল ইতিহাস লেখা হয় ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে। নিজের দেশে অনুষ্ঠিত সেই আসরে ফ্রান্স প্রথমবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। শক্তিশালী ব্রাজিলকে ফাইনালে হারিয়ে দেশম ইতিহাস গড়েন ফ্রান্সের প্রথম বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক হিসেবে। সেই বছর তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ফ্রান্স সরকার তাকে ‘ন্যাশনাল অর্ডার অব দ্য লিজন অব অনার’ পদকে ভূষিত করে। পরে ২০০০ সালে ইউরো জয় করে ফ্রান্স এবং দেশম হন প্রথম ফরাসি অধিনায়ক যিনি বিশ্বকাপ ও ইউরো- দুটি শিরোপাই জিতেছেন। ফলে ২০০০-০১ মৌসুমে ফিফা র্যাংকিংয়ে ফ্রান্স উঠে আসে শীর্ষে।
২০০৪ সালের মার্চে তিনি পেলে প্রণীত জীবিত ১২৫ জন গ্রেট ফুটবলারের তালিকায় স্থান পান। ২০০০ ইউরোর পর তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেন। শেষদিকে তিনি দেশের হয়ে সর্বাধিক ম্যাচ খেলার রেকর্ডও গড়েছিলেন, যদিও পরে সেই রেকর্ড ভেঙে দেন মার্সেল দেশাইলি, জিনেদিন জিদান, লিলিয়ান থুরাম ও থিয়েরি অঁরি। দেশম ফ্রান্সের হয়ে ১০৩ ম্যাচ খেলেন এবং চারটি গোল করেন।
অবসর ভেঙে ২০০০ সালের আগস্টে ফিফা একাদশের বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচে নামেন তিনি, যেখানে তার দল জেতে ৫-১ ব্যবধানে। এরপর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচই ছিল তার শেষ আন্তর্জাতিক উপস্থিতি।
খেলোয়াড়ি জীবন শেষ করে দেশম কোচিংয়ে আসেন। মোনাকোর কোচ হিসেবে ২০০২-০৩ মৌসুমে তিনি ফরাসি লিগ জেতেন এবং ২০০৪ সালে দলকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে নিয়ে যান। ২০০৫ সালে ক্লাব প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বিরোধে পদত্যাগ করেন। পরে ২০০৬ সালে জুভেন্টাসের কোচ হন এবং ২০০৭ সালে সিরি-বি শিরোপা জেতান। এরপর মার্সেইতে ফিরে ২০০৯ সালে দলকে সিরি-এ ও ট্রফি ডেস চ্যাম্পিয়ন্স জেতান, পাশাপাশি দুবার কোপে ডি লা লিগ শিরোপাও এনে দেন। আজও তিনি মার্সেইয়ের কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তার নেতৃত্বে ১৯৯৮ সালে ফ্রান্স যেমন ইতিহাস গড়েছিল, তেমনি ২০০০ সালে ইউরো জয়ও এসেছে। ফ্রান্স যখন ১৯৯০ ও ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ব্যর্থ হয়, তখন নতুন কোচ আইনে জ্যাক দলকে পুনর্গঠনের সময় ক্যান্তোনাকে অধিনায়ক করেন, পরে নিষেধাজ্ঞার কারণে দলে বড় পরিবর্তন আসে এবং জিনেদিন জিদানদের মতো তরুণরা উঠে আসেন– এই পরিবর্তনের মাঝেই দেশম ছিলেন স্থির নেতৃত্বের প্রতীক।
দেশমের ফুটবল জীবন তাই শুধু ট্রফির গল্প নয়; এটি নেতৃত্ব, পুনর্গঠন এবং ধারাবাহিকতার গল্প। একজন খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে, আর কোচ হিসেবে ডাগআউটে– দুই ভূমিকাতেই তিনি ফ্রান্সের ফুটবল ইতিহাসে নিজের নাম স্থায়ীভাবে খোদাই করে গেছেন!
একনজরে
নাম: দিদিয়ের ক্লাউদ দেশম
জন্ম: ১৫ অক্টোবর, ১৯৬৮
জন্মস্থান: বায়োনে, ফ্রান্স
উচ্চতা: ১.৭৪ মিটার
পজিশন: ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার
কোচিং: মার্সেই (বর্তমান)
ক্লাব ফুটবলে ম্যাচ: ৪২২ (১৯৮৫-২০০১)
ক্লাব ফুটবলে গোল: ১৭
জাতীয় দলে ম্যাচ: ১০৩ (১৯৮৯-২০০০)
জাতীয় দলে গোল: 8
চ্যাম্পিয়ন: বিশ্বকাপ ১৯৯৮, ইউরো ২০০
পদক: ন্যাশনাল অর্ডার অব দ্য লিজন অব অনার