Print Date & Time : 08 November 2026 Sunday 02:48 am

টানা বৃষ্টিতে ফাঁকা কাঁচাবাজার, মরিচে অস্বস্তি

image

শফিকুল ইসলাম শামীম: রাজধানীতে টানা বৃষ্টি। কখনো হালকা, কখনো ভারি। আকাশজুড়ে মেঘের আনাগোনা আর থেমে থেমে বৃষ্টির এমন দিনে নগরজীবনে নেমে এসেছে ভিন্ন এক চিত্র। একদিকে কর্মজীবী মানুষ, খেটে খাওয়া শ্রমজীবী, ছোট ব্যবসায়ী ও নিত্যপ্রয়োজনীয় কেনাকাটায় বের হওয়া সাধারণ মানুষকে পোহাতে হচ্ছে চরম ভোগান্তি। অন্যদিকে একই বৃষ্টিতে কিশোর-যুবকদের কেউ কেউ খুঁজে নিচ্ছেন আনন্দের উপলক্ষ। তবে সব মিলিয়ে টানা বৃষ্টির সবচেয়ে বড় চাপ পড়েছে বাজারে আসা ক্রেতা ও খোলা আকাশের নিচে বসা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর।

রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজার, সড়কপথ ও অলিগলি ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকে আকাশ মেঘলা থাকায় মানুষের চলাচল ছিল তুলনামূলক কম। কখনো হালকা ফোঁটা, আবার হঠাৎ ঝুম বৃষ্টি। এমন আবহাওয়ায় ছাতা, রেইনকোট কিংবা পলিথিনে নিজেকে ঢেকে কাজে বের হতে দেখা গেছে অফিসগামী মানুষদের। অনেককে বাসা থেকে বের হওয়ার আগে কয়েক দফা আকাশের দিকে তাকিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। যাওয়া যাবে কি যাবে না। কিন্তু জীবন-জীবিকার তাগিদে শেষ পর্যন্ত থেমে থাকেননি কেউই। কর্মস্থল, দোকান, বাজার কিংবা বিভিন্ন গন্তব্যে যেতে হয়েছে ভিজেই।

বৃষ্টির দিনে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়তে দেখা গেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার করতে আসা সাধারণ মানুষকে। কাঁচাবাজারে প্রবেশের মুখেই কাদা, জমে থাকা পানি আর পিচ্ছিল পথ পেরিয়ে ভেতরে যেতে হয়েছে ক্রেতাদের। অনেক বাজারের ছাউনির নিচে পানি পড়ছে, কোথাও আবার দোকানের সামনে জলাবদ্ধতা। এতে স্বাভাবিকভাবে দাঁড়িয়ে পণ্য দেখাও কষ্টকর হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য এই দুর্ভোগ আরও বেশি। বাজারে এক হাতে ছাতা, অন্য হাতে ব্যাগ নিয়ে পা ফেলার জায়গা খুঁজে খুঁজে এগোতে দেখা গেছে অনেককে। কেউ কেউ আবার ভিজে কাপড় নিয়েই তড়িঘড়ি বাজার সেরে বাড়ি ফিরেছেন।

টানা বৃষ্টির আরেক বড় প্রভাব পড়েছে খোলা আকাশের নিচে বসা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর। রাস্তার পাশ, ফুটপাতসংলগ্ন এলাকা কিংবা অস্থায়ী ছাউনির নিচে যারা সবজি, মাছ, ফল কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি করেন, তাদের অনেকেরই পসরা বাঁচাতে হিমশিম খেতে হয়েছে। বৃষ্টি নামলেই তড়িঘড়ি করে ত্রিপল টানতে হচ্ছে, পণ্য সরাতে হচ্ছে, আবার ক্রেতা এলেই ভেজা হাতেই বিক্রি সামলাতে হচ্ছে। অনেকের অভিযোগ, বৃষ্টির কারণে একদিকে যেমন ক্রেতা কমেছে, অন্যদিকে পণ্য ভিজে নষ্ট হওয়ার শঙ্কাও বেড়েছে। ফলে লাভ তো দূরের কথা, পুঁজি টিকিয়ে রাখাই হয়ে উঠেছে বড় চ্যালেঞ্জ।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, টানা বৃষ্টির কারণে ক্রেতার উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে অনেক কম। সাধারণত সকাল বা বিকেলে যেসব বাজারে উপচে পড়া ভিড় থাকে, সেখানে এদিন ছিল অনেকটাই ফাঁকা পরিবেশ।

আগারগাঁও কাঁচাবাজারের বয়বসায়ী মোমিন মোল্লা বলেন, বাজারে ক্রেতা কম। প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছে না। অনেকে হয়তো একদিনের বাজার একদিন পিছিয়ে দিচ্ছেন, আবার কেউ বৃষ্টির তীব্রতা কমার অপেক্ষায় আছেন। এতে বাজারে কেনাবেচার গতি অনেকটাই মন্থর হয়ে পড়েছে।

তবে এই কম ভিড়ের বাজারে ক্রেতাদের জন্য কিছুটা স্বস্তির খবরও মিলেছে সবজির দামে। বাজারে সবজির সরবরাহ মোটামুটি স্বাভাবিক থাকলেও ক্রেতা কম থাকায় বেশ কয়েকটি সবজির দাম স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কিছুটা কমে এসেছে। 
এসময় রহমত আলী নামের এক ব্যবসায়ী বলছেন, ক্রেতা না থাকলে পণ্য ধরে রাখা যায় না। বিশেষ করে সবজির মতো দ্রুত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য দিনের শেষে কম দামে হলেও বিক্রি করে দিতে হয়। তাই টানা বৃষ্টির দিনে বাজারে ক্রেতা টানতে অনেকেই দাম কিছুটা কম রেখেছেন।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে ঘুরে দেখা যায়, বেগুন, করলা, ঢেঁড়স, শসা, কাঁচা পেঁপে, পটল, চিচিঙ্গা, লাউ, কাঁকরোলসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি তুলনামূলক সহনীয় দামে বিক্রি হচ্ছে। ক্রেতারা বলছেন, বৃষ্টির দুর্ভোগ থাকলেও সবজির দামে কিছুটা স্বস্তি আছে। যারা বাজারে এসেছেন, তারা অন্তত এই জায়গাটিতে কিছুটা স্বস্তির কথা বলছেন। তবে সেই স্বস্তি পুরো বাজারজুড়ে নেই। কারণ সবজির দাম কিছুটা কম থাকলেও কাঁচামরিচে এখনো অস্বস্তি কাটেনি।

বাজারে কাঁচামরিচ বিক্রি হতে দেখা গেছে প্রতি কেজি ১২০ টাকা দরে। কোনো কোনো বাজারে মানভেদে দাম কিছুটা কমবেশি হলেও সাধারণভাবে কাঁচামরিচ এখনো সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে বলেই মনে করছেন অনেকে। বৃষ্টির মধ্যে ভিজে বাজারে এসে অন্যান্য সবজিতে স্বস্তি পেলেও কাঁচামরিচ কিনতে গিয়ে থমকে যেতে হচ্ছে অনেককে। কেউ আধা কেজির বদলে ১০০ বা ২০০ গ্রামের বেশি কিনছেন না। কেউ আবার প্রয়োজনের তুলনায় কম নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। বিক্রেতারা বলছেন, সরবরাহ, পরিবহন ব্যয় এবং পাইকারি বাজারের দামের প্রভাবেই খুচরা বাজারে কাঁচামরিচের দাম এখনো বেশি।

টানা বৃষ্টির দিনে বাজারের চিত্রে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নগরের জীবন থেমে না থাকলেও তার গতি অনেকটাই ধীর হয়ে গেছে। অফিসগামী মানুষকে ভেজা রাস্তায় যানবাহনের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে, দোকানিদের দোকানে বসে থাকতে হচ্ছে ক্রেতার আশায়, আর সাধারণ মানুষকে প্রয়োজনের তাগিদে কাদা-পানি মাড়িয়ে বাজার করতে হচ্ছে। শহরের অনেক এলাকায় বৃষ্টির পানি জমে থাকায় চলাচল আরও কষ্টকর হয়ে উঠেছে। কোথাও রিকশা পাওয়া যাচ্ছে না, কোথাও আবার বাড়তি ভাড়া দাবি করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে টানা বৃষ্টি নগরবাসীর স্বাভাবিক ছন্দে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।

তবে এই দুর্ভোগের মধ্যেও বৃষ্টিকে ঘিরে অন্যরকম দৃশ্যও চোখে পড়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক, গলি কিংবা খোলা জায়গায় কিশোর ও যুবকদের অনেককে বৃষ্টিতে ভিজে আনন্দ করতে দেখা গেছে। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে গল্প করছেন, কেউ বৃষ্টিতে ভিজে ছবি তুলছেন, কেউ আবার হেঁটে হেঁটে উপভোগ করছেন ভেজা সকাল। তাদের কাছে এই বৃষ্টি যেন নগরজীবনের ক্লান্তি ভোলার এক টুকরো অবকাশ। কিন্তু সেই আনন্দের দৃশ্যের পাশেই বাজারে কষ্টে দাঁড়িয়ে থাকা এক ক্রেতা, মাথার ওপর পলিথিন ধরে সবজি বাঁচানোর চেষ্টা করা এক ব্যবসায়ী কিংবা ভেজা কাপড়ে কর্মস্থলে ছুটে চলা শ্রমজীবী মানুষের ছবি যেন অন্য বাস্তবতার কথাই মনে করিয়ে দেয়।

কাঁচা সবজি ব্যবসায়ী নারায়ন চন্দ্র বলেন, এমন টানা বৃষ্টি আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকলে কাঁচাবাজারে এর প্রভাব আরও স্পষ্ট হতে পারে। একদিকে ক্রেতা কমে গেলে খুচরা ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, অন্যদিকে অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে আবার কিছু পণ্যের দামও বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে দ্রুত নষ্ট হওয়া পণ্য, পরিবহননির্ভর সবজি কিংবা কাঁচামরিচের মতো পণ্যে দামের চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সব মিলিয়ে রাজধানীর টানা বৃষ্টি একসঙ্গে দুই ধরনের বাস্তবতা সামনে এনেছে। একদিকে জনদুর্ভোগ, কমে যাওয়া বাজারচাঞ্চল্য, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ আর কাঁচাবাজারে ভেজা কষ্টের গল্প। অন্যদিকে কিছু সবজির দামে সাময়িক স্বস্তি। কিন্তু সেই স্বস্তির মধ্যেও কাঁচামরিচের বাড়তি দাম সাধারণ মানুষের অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। বৃষ্টিতে ভেজা এই নগরে তাই আনন্দের কিছু মুহূর্ত থাকলেও, নিত্যদিনের জীবনযুদ্ধে টিকে থাকা মানুষদের কাছে টানা বর্ষণ এখনো মূলত দুর্ভোগেরই আরেক নাম।

—জা. অর্থনীতি/এএইচএ