Print Date & Time : 28 October 2026 Wednesday 07:34 am

২৭৯ কোটি টাকার খনন প্রকল্পেও প্রাণ ফেরেনি ভৈরবে

image

যশোর প্রতিনিধি: প্রায় ২৭৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ভৈরব নদ পুনরুদ্ধার প্রকল্প শেষ হয়েছে তিন বছর আগে। নদে জোয়ার-ভাটা ফিরিয়ে আনা, নৌ চলাচল সচল করা এবং জলাবদ্ধতা কমানো ছিল প্রকল্পটির প্রধান লক্ষ্য। তবে সেই লক্ষ্য এখনো পূরণ হয়নি। নদীর বিস্তীর্ণ অংশ কচুরিপানা, পলি ও বর্জ্যে ভরাট হয়ে আছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) দাবি, নদের ওপর নির্মিত ৫৪টি অপরিকল্পিত সেতু ও কালভার্ট পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করায় প্রকল্পের সুফল মিলছে না। অন্যদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিকল্পনার ঘাটতি, বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতা, দখল ও দূষণের কারণেই বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও ভৈরব নদে স্বাভাবিক জোয়ার-ভাটা ও পানিপ্রবাহ ফিরে আসেনি।

পাউবো সূত্রে জানা গেছে, জলাবদ্ধতা নিরসন ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে ২০১৬ সালে ভৈরব নদ পুনরুদ্ধার প্রকল্প অনুমোদন পায়। শুরুতে প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৭২ কোটি ৮১ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। পরে সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ২৭৯ কোটি ১২ লাখ ৭৫ হাজার টাকায়।

২০১৮ সালের ১৮ জানুয়ারি চৌগাছার তাহেরপুর থেকে অভয়নগরের আফরাঘাট পর্যন্ত ৯৬ কিলোমিটার নদ খননের কাজ শুরু হয়। এর মধ্যে ৯২ কিলোমিটার পুনর্খনন এবং চার কিলোমিটার অংশে ড্রেজিং করা হয়। পাশাপাশি যশোর শহরসংলগ্ন ভৈরব নদ তীরের সৌন্দর্যবর্ধনে ব্যয় করা হয় আরও ৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল নদে স্বাভাবিক জোয়ার-ভাটা ফিরিয়ে আনা, নৌ চলাচল পুনরায় চালু করা, নাব্যতা বৃদ্ধি এবং জলাবদ্ধতা কমানো। কিন্তু প্রকল্প শেষ হওয়ার তিন বছর পরও এসব লক্ষ্য বাস্তবে অর্জিত হয়নি বলে সংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণ।

পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ভৈরব নদের ওপর বিভিন্ন সরকারি সংস্থার নির্মিত ৫৪টি সেতু ও কালভার্ট রয়েছে। এর মধ্যে এলজিইডির ২৬টি, ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিভাগের ১৯টি, সড়ক ও জনপথ বিভাগের চারটি, বিএডিসির তিনটি, রেলওয়ের একটি এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের একটি।

এসব স্থাপনার অধিকাংশের দৈর্ঘ্য ১৬ দশমিক ৪ ফুট থেকে ১২০ ফুটের মধ্যে হলেও নদীর প্রস্থ অনেক স্থানে ১৫০ থেকে ২৫০ ফুট। ফলে পানিপ্রবাহ সংকুচিত হয়ে জোয়ার-ভাটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পাউবোর কর্মকর্তারা বলছেন, এর ফলে নদে দ্রুত পলি জমছে এবং খননের সুফলও নষ্ট হচ্ছে।

পাউবো সূত্র জানায়, খনন প্রকল্প শুরুর আগেই সংকীর্ণ সেতু ও কালভার্টগুলো চিহ্নিত করা হয়েছিল। ২০২৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে এসব অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের জন্য চিঠি দেওয়া হলেও এখনো অধিকাংশ স্থাপনায় দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আসেনি।

যশোর সদর উপজেলার নূরপুর এলাকার বাসিন্দা সাদ্দাম হোসেন বলেন, "নদ খননের পর কিছুদিন আশার সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু এখন আর জোয়ার-ভাটা হয় না। পানি নামতে পারে না। ছোট ছোট কালভার্টের কারণে কচুরিপানা আর ময়লায় নদ ভরে যাচ্ছে। নতুন সেতুর কথা শুনেছিলাম, সেটিও হয়নি।"

ভৈরব বাঁচাও আন্দোলন কমিটির সদস্য তসলিম উর রহমান বলেন, "দীর্ঘ আন্দোলনের পর নদ খনন হলেও উজানের সঙ্গে সংযোগ পুনঃস্থাপন করা হয়নি। খননের সময় চিহ্নিত সংকীর্ণ সেতুগুলোও বহাল রয়েছে। উল্টো নদী আইন অনুসরণ না করেই নতুন কয়েকটি সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে নদের স্বাভাবিক প্রবাহ ফেরেনি।"

একই সংগঠনের নেতা জিল্লুর রহমান ভিটু বলেন, "বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও নদের অনেক অংশে তলদেশ উঁচু রয়ে গেছে। মাথাভাঙ্গা নদীর সঙ্গে কার্যকর সংযোগ স্থাপন হয়নি। খননের পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণেরও অভাব রয়েছে। ফলে প্রকল্পের স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।"

সাংবাদিক ইউনিয়ন যশোরের সভাপতি আকরামুজ্জামান বলেন, "শুধু খনন করে নদ রক্ষা সম্ভব নয়। অবৈধ দখল ও দূষণ বন্ধ না হলে নদ আবারও ভরাট হবে। ভৈরব যশোরের ইতিহাস ও পরিচয়ের অংশ। তাই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।"

পাঁচ নদী রক্ষা আন্দোলনের প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, "ভৈরব, কপোতাক্ষ, মুক্তেশ্বরী ও চিত্রা একই নদীব্যবস্থার অংশ। উজানের পানিপ্রবাহ নিশ্চিত না করলে কোনো খনন প্রকল্পই দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে না।"

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) যশোরের সদস্যসচিব আবু সাঈদ বলেন, "দখল ও দূষণ বন্ধ না করে শুধু খনন প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে জনগণের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হয় না। নদ রক্ষায় আইনের প্রয়োগ এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ জরুরি।"

পানি সংগ্রাম কমিটির নেতা গাজী আব্দুল হামিদ বলেন, "ভৈরব শুধু একটি নদ নয়, এটি এ অঞ্চলের অর্থনীতি, পরিবেশ ও ইতিহাসের অংশ। বর্তমানে নদের যে অবস্থা, তা পরিকল্পনার দুর্বলতা ও জবাবদিহির ঘাটতিই তুলে ধরছে।"

যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী বলেন, নদ খননের কাজ প্রকল্প অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছে। তবে নদের ওপর নির্মিত অপরিকল্পিত সেতু ও কালভার্ট পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করায় দ্রুত পলি জমছে এবং জোয়ার-ভাটা ব্যাহত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে একাধিকবার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। দ্রুত এসব অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ না হলে দড়াটানা থেকে চৌগাছার তাহেরপুর পর্যন্ত প্রায় ৫৭ কিলোমিটার নদ আবারও কার্যকারিতা হারাতে পারে।

এলজিইডি যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ মাহবুবুর রহমান বলেন, বসুন্দিয়া সেতু পুনর্নির্মাণের টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আরও তিনটি সেতুকে নতুন প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে অন্যান্য সেতুর নতুন নকশা প্রণয়ন এবং প্রয়োজনীয় ভার্টিক্যাল ক্লিয়ারেন্স নিশ্চিত করতে জরিপ চলছে।

সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়া জানান, ভৈরব নদের ওপর কয়েকটি সেতু সম্প্রসারণের কাজ এগিয়ে চলছে। তিনটি সেতুর জন্য নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্র পাওয়া গেছে। দুটি সেতুর প্রকল্প প্রস্তাব এবং একটি সেতুর নকশা অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে।

নদ বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশকর্মীদের মতে, শুধু খনন করলেই নদ পুনরুদ্ধার হয় না। নদের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা, উজানের সঙ্গে সংযোগ পুনঃস্থাপন, সংকীর্ণ সেতু-কালভার্ট পুনর্নির্মাণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ- এই সবগুলো পদক্ষেপ একসঙ্গে বাস্তবায়ন না হলে বড় অঙ্কের সরকারি বিনিয়োগও দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না। ভৈরব নদের বর্তমান চিত্র সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।

—জা. অর্থনীতি/এলএটি