Print Date & Time : 08 November 2026 Sunday 02:05 am

পদ্মা-মেঘনায় কমছে ইলিশের উৎপাদন

image

অনলাইন ডেস্ক: পদ্মা-মেঘনা নদীতে প্রতিবছরই কমছে জাতীয় মাছ ইলিশের উৎপাদন। জেলা মৎস্য বিভাগের গত তিন অর্থবছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত তিন বছরে ইলিশ আহরণ কমেছে প্রায় ১৮ শতাংশ। ধারাবাহিকভাবে আহরণ কমে যাওয়ায় জেলে ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ।

বিশেষজ্ঞ ও মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা নদীদূষণ, নাব্যতা সঙ্কট, জলবায়ু পরিবর্তন, অবৈধ বালু উত্তোলন এবং নিষিদ্ধ কারেন্ট জালের ব্যবহারকে এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী করছেন। এছাড়া নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে প্রজনন মৌসুমে অবাধে মা ইলিশ নিধন ও অবৈধভাবে জাটকা শিকারও উৎপাদন কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন তারা। একই সাথে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তনের ফলে ইলিশের বিচরণ ও আহরণ কমেছে। এতে একমাত্র ইলিশ শিকার নির্ভর জেলেরা চরম সঙ্কটে পড়েছেন।

জেলা মৎস্য অফিস জানিয়েছে, শরীয়তপুর জেলা পদ্মা ও মেঘনা নদীবেষ্টিত হলেও জেলায় আরো কয়েকটি ছোট ছোট নদী রয়েছে। পদ্মা ও মেঘনা ঘিরে জেলার প্রায় ৮০ কিলোমিটার জলসীমা রয়েছে, যা চারটি জেলার সাথে সংযুক্ত। উম্মুক্ত জলাশয়ের এই বিস্তীর্ণ এলাকা ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের উৎপাদন ও আহরণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইলিশের উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে অতিরিক্ত পলি জমে নাব্যতা সঙ্কট, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়া এবং বিভিন্ন স্থানে ডুবোচর সৃষ্টি হয়ে নদী সংকুচিত হয়ে পড়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেও ইলিশের সরবরাহ কমেছে।

জেলা মৎস্য বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে পদ্মা নদী থেকে চার হাজার ৫০০ মেট্রিক টন ইলিশ আহরণ করা হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় চার হাজার এক টনে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আহরণ আরো কমে তিন হাজার ৭০৫ টনে নেমে আসে। অর্থাৎ মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে ইলিশ আহরণ প্রায় ১৮ শতাংশ কমেছে। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তথ্য এখনো হালনাগাদ হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলনের ফলে সৃষ্ট কম্পনের কারণে ইলিশ প্রজননের জন্য তাদের স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন করছে। অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন নদীপথ হয়ে পদ্মা-মেঘনায় ট্যানারি, শিল্পকারখানা, নগর ও গৃহস্থালি বর্জ্য, অপরিশোধিত পয়ঃবর্জ্য, হাসপাতালের বর্জ্য, কৃষিজমির সার ও কীটনাশক, নৌযানের তেল-লুব্রিকেন্ট এবং নদীতীরবর্তী বাজার ও কসাইখানার বর্জ্য মিশে পানিদূষণ বাড়ছে। এতে পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গিয়ে ইলিশের ডিমের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে এবং নবজাতক পোনা মারা যাচ্ছে এবং ইলিশের উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। একই সাথে অন্যান্য জলজ প্রাণীর আবাসস্থলও বিলীন হচ্ছে।

মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, মূল নদীগুলোর সাথে সংযোগ খালগুলো পরিকল্পিতভাবে খনন করা গেলে জোয়ার-ভাটার মাধ্যমে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। এদিকে পদ্মাসেতুর মাদারীপুর অংশ থেকে চাঁদপুরের মেঘনা নদী পর্যন্ত অসংখ্য চর এবং ডুবোচর সৃষ্টি হওয়ায় পদ্মার মূল স্রোত এখন অনেকটাই তীরঘেঁষে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে নদীভাঙনের ঝুঁকি যেমন বেড়েছে, তেমনি নৌযান চলাচলেও সৃষ্টি হয়েছে নতুন শঙ্কা।

শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী খান মোহাম্মদ ওয়ালিউজ্জামান বলেন, উজান থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ পলি এসে পদ্মানদীর বিভিন্ন স্থানে ডুবোচর ও নতুন চর সৃষ্টি করছে। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি গভীরতাও কমে যাচ্ছে। গত ১০ বছরে শরীয়তপুর অংশে পদ্মানদীর প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রায় ১২ কিলোমিটার এলাকায় ড্রেজিং করে তিন কোটি আট লাখ ঘনমিটার পলি অপসারণ করা হয়েছে।

স্থানীয় জেলেরাও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। তাদের ভাষ্য, অবৈধ বালু উত্তোলনের ফলে নদীর তলদেশের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। পাশাপাশি জাটকা নিধন, নিষিদ্ধ কারেন্ট জালের ব্যবহার এবং ডুবোচর সৃষ্টি হওয়ায় ইলিশের প্রজননের অনুকুল পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার দেব বলেন, শরীয়তপুরে পদ্মা ও মেঘনা নদী ঘিরে প্রায় ৮০ কিলোমিটার জলসীমা রয়েছে, যা ইলিশ উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নাব্যতা সঙ্কট, ডুবোচর সৃষ্টি, জলবায়ু পরিবর্তন, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, অবৈধ বালু উত্তোলন এবং দেশের বিভিন্ন নদীপথ হয়ে পদ্মা-মেঘনায় ব্যাপক বর্জ্য মিশে পানিদূষণ বাড়ছে। আর এই পানি দূষণের কারণে ইলিশের স্বাভাবিক প্রজনন সঙ্কটাপন্ন। ২০-৩০ বছর আগে পদ্মা-মেঘনায় ইলিশ যে অনুকূল পরিবেশ পেত, এখন তা আর নেই। ফলে ইলিশ উৎপাদন ধীরে ধীরে কমছে। মৎস্য অধিদফতর মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে, যাতে ইলিশের উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা যায়।

—জা.অর্থনীতি/জেআরটি