Print Date & Time : 25 October 2026 Sunday 12:45 am

৫৫০ মিলিয়ন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগে বদলে যাবে চট্টগ্রাম বন্দরের চেহারা

image

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক: চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি সম্পূর্ণ বিদেশি বিনিয়োগে নির্মিত হচ্ছে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল। আধুনিক এই টার্মিনাল চালু হলে বছরে প্রায় ৮ লাখ কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা তৈরি হবে। একই সঙ্গে বড় জাহাজ ভেড়ানোর সুবিধা বাড়ায় আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যে বাংলাদেশের সংযোগ আরও শক্তিশালী হবে।

রোববার (৩০ আগস্ট) সকালে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় কর্ণফুলী নদীর তীরে লালদিয়া প্রকল্প এলাকায় টার্মিনালটির গ্রাউন্ড ব্রেকিং অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্য দিয়ে দেশের বন্দর অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন একটি অধ্যায়ের আনুষ্ঠানিক সূচনা হলো।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।

নৌপরিবহনমন্ত্রী বলেন, লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল শুধু চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াবে না, বাংলাদেশের বন্দর ব্যবস্থাপনাতেও নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।

তিনি বলেন, দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৯৩ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে বাণিজ্য সম্প্রসারণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বন্দরের সক্ষমতা ও আধুনিক প্রযুক্তি বাড়ানো জরুরি।

৫৫০ মিলিয়ন ডলারের বেশি বিদেশি বিনিয়োগ

সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মডেলে বাস্তবায়ন হচ্ছে প্রকল্পটি। এতে ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগ হবে এবং পুরো অর্থই আসবে বিদেশ থেকে। ডেনমার্কভিত্তিক এপিএম টার্মিনালস প্রকল্পটি বাস্তবায়ন ও পরিচালনা করবে।

সরকারের মতে, সম্পূর্ণ বিদেশি অর্থায়নে এত বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রতি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থারও প্রতিফলন।

বছরে ৮ লাখ কনটেইনার, জেটি ৬১৬ মিটার

লালদিয়া টার্মিনালে প্রায় ৬১৬ মিটার দীর্ঘ একটানা জেটি নির্মাণ করা হবে। এতে বড় আকারের জাহাজ একসঙ্গে হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা বাড়বে। টার্মিনালটির বার্ষিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা হবে প্রায় ৮ লাখ টিইইউ।

এখানে আধুনিক কনটেইনার ইয়ার্ড, জেটি, গেট ও কার্গো হ্যান্ডলিং ব্যবস্থা থাকবে। পণ্য ওঠানো-নামানোর জন্য সর্বাধুনিক জাহাজ-থেকে-তীরে ক্রেন এবং বৈদ্যুতিক রাবার টায়ার্ড গ্যান্ট্রি ক্রেন ব্যবহার করা হবে।

ফলে পণ্য খালাস ও পরিবহনে সময় কমার পাশাপাশি আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের লজিস্টিকস ব্যয়ও কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

সড়ক-নৌপথের সঙ্গে সহজ সংযোগ

লালদিয়া টার্মিনালের অন্যতম সুবিধা হলো এর ভৌগোলিক অবস্থান। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, কর্ণফুলী টানেল ও মেরিন ড্রাইভ সড়কের সঙ্গে এর সংযোগ রয়েছে। ফলে দেশের প্রধান শিল্প ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে পণ্য পরিবহন সহজ হবে।

কর্ণফুলী নদীর সরাসরি সংযোগ কাজে লাগিয়ে সমুদ্রবন্দর ও অভ্যন্তরীণ নৌপথের পণ্য পরিবহন ব্যবস্থার সমন্বয়ও আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হবে।

বিশেষ করে তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল আমদানি এবং তৈরি পণ্য বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে দ্রুত ও দক্ষ বন্দরসেবা পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

‘গ্রিন পোর্ট’ গড়ার লক্ষ্য

লালদিয়া টার্মিনালকে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই বন্দর ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবেও দেখছে সরকার। বৈদ্যুতিক সরঞ্জামসহ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশের ওপর চাপ কমানোর উদ্যোগ থাকবে প্রকল্পটিতে।

নৌপরিবহনমন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন লালদিয়া টার্মিনালেই শেষ হবে না। আরও কয়েকটি টার্মিনাল ও অবকাঠামো উন্নয়নে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহ রয়েছে। দেশের স্বার্থ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে এসব বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

২০২১ সালে বাংলাদেশ ও ডেনমার্ক সরকারের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর প্রকল্পটির প্রক্রিয়া শুরু হয়। পরে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও এপিএম টার্মিনালসের মধ্যে কনসেশন চুক্তির মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নের পথ তৈরি হয়।

সরকারের প্রত্যাশা, লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল চালু হলে শুধু চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতাই বাড়বে না, বরং বাংলাদেশ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের একটি আরও গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিকস কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার পথে এগিয়ে যাবে।

—জা.অর্থনীতি/আরএস