Print Date & Time : 26 October 2026 Monday 09:56 pm

গাংনীতে বাড়ছে অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ, চলতি বছরেই আক্রান্ত ৪১২

image

মেহেরপুর প্রতিনিধি: এক বা দুই বছর নয়, এক দশকের বেশি সময় ধরে অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ চলছে মেহেরপুরের গাংনীতে। কখনো আক্রান্তের সংখ্যা কমেছে, আবার কখনো তা লাফিয়ে বেড়েছে।

চলতি বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর সকাল পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪১২ জনে। বছরের শেষ তিন মাস বাকি থাকতেই ৪ শতাধিক মানুষ আক্রান্ত হওয়ায় রোগটির দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

এই পরিস্থিতিতে গাংনীতে অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণের ধরন, জীবাণুর বৈশিষ্ট্য ও দ্রুত শনাক্তের পদ্ধতি নিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করেছে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)।

আক্রান্ত রোগীদের রক্ত ও ক্ষত থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত ৭২ জন রোগীর নমুনা সংগ্রহ করেছে প্রতিষ্ঠানটির বিশেষ টিম। পাশাপাশি ২০০টি নমুনা সংগ্রহ করে অ্যানথ্রাক্স শনাক্তে র‍্যাপিড ডায়াগনস্টিক টুল (আরডিটি) নিয়ে একটি সার্ভেও চালানো হচ্ছে।

কোটি টাকার সড়ক নির্মাণে নিম্নমানের ইট ব্যবহারের অভিযোগ

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, এই অনুসন্ধানের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো দেশে বিদ্যমান ৩ ধরনের অ্যানথ্রাক্সের মধ্যে গাংনীতে কোন ধরনের সংক্রমণ বেশি হচ্ছে, তা নির্ণয় করা। সেই তথ্যের ভিত্তিতে রোগীদের জন্য উপযুক্ত চিকিৎসা এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

কিন্তু আইইডিসিআরের এই অনুসন্ধানের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের একটি উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান।

গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে অ্যানথ্রাক্স আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৯৯ জন। ১৪ সালে ২০৩, ১৫ সালে ১৫৪, ১৬ সালে ২৪০, ১৭ সালে ২৮১, ১৮ সালে ৪০৮, ১৯ সালে ৬৬০, ২০ সালে ৩৭৮, ২১ সালে ৪১৭, ২২ সালে ৬৪৪, ২৩ সালে ৭৯৩ এবং ২৪ সালে ৬৮৬ জন আক্রান্ত হন। ২০২৫ সালে আক্রান্ত ছিল আরও ৬৩৭ জন।

মৌলভীবাজারে ১২-১৪ ঘণ্টা লোডশেডিং, ভোগান্তিতে ৫ লাখ গ্রাহক

অর্থাৎ, বছরের পর বছর আক্রান্তের সংখ্যা ওঠানামা করলেও গাংনী থেকে অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। বরং কয়েকটি বছরে আক্রান্তের সংখ্যা ছয়-সাতশ ছাড়িয়েছে। এবারও সেপ্টেম্বরেই আক্রান্তের সংখ্যা ৪ শতাধিক।

স্বাস্থ্য বিভাগের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ বলছে, আক্রান্তদের বড় একটি অংশ রোগাক্রান্ত গরু-ছাগলের মাংস কাটাকাটি বা নাড়াচাড়ার মাধ্যমে সংক্রমিত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে গবাদিপশুতে অ্যানথ্রাক্সের উপস্থিতি, আক্রান্ত পশু জবাই এবং সেই পশুর মাংস বা দেহজাত পদার্থ মানুষের সংস্পর্শে আসার বিষয়টি সংক্রমণের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে সামনে এসেছে।

মেহেরপুর সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার ডা. ইনজামাম উল হক বলেন, অ্যানথ্রাক্স মূলত ৩ ধরনের হলেও মেহেরপুর জেলায় বর্তমানে শুধু কিউটেনিয়াস বা ত্বকের অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণই দেখা যাচ্ছে। এটি কিছুটা স্বস্তির বিষয়। নিকট অতীতে মেহেরপুরে আক্রান্ত রোগীদের কারও ফুসফুস বা অন্ত্রনালিতে অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ পাওয়া যায়নি।

তবে চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়েও উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন তিনি। ডা. ইনজামাম বলেন, অনেক ক্ষেত্রে গ্রাম্য চিকিৎসকেরা সাধারণ কিছু অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা করছেন। এতে আক্রান্ত রোগীদের তথ্য জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছাচ্ছে না। আবার কেউ কেউ আগে আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত ওষুধের তথ্য অনুসরণ করে নিজেরাই চিকিৎসা নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

তার ভাষায়, অ্যানথ্রাক্সের ক্ষেত্রে রোগীর শারীরিক অবস্থা, সংক্রমণের ধরন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক ওষুধ ও মাত্রা নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক সেবনে পর্যাপ্ত চিকিৎসা না পাওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যাও তৈরি হতে পারে। তাই অ্যানথ্রাক্সের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং রোগীর তথ্য স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে পৌঁছানো জরুরি।

চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্রের তীররক্ষা বাঁধে আবারও ধস

অন্যদিকে অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে পশুসম্পদ ব্যবস্থাপনার দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ। মেহেরপুর জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় গবাদিপশুর সংখ্যা ১০ লাখ ৭৪ হাজার ৪০০টি। এর মধ্যে গরু ৩ লাখ ৭৩ হাজার, মহিষ ১ হাজার ৪০০, ছাগল ৬ লাখ ৭১ হাজার এবং ভেড়া ২৯ হাজার।

এই বিপুল সংখ্যক গবাদিপশুর মধ্যে অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে চলতি অর্থবছরে ২৪ হাজার ডোজ এবং গত অর্থবছরে ৭৮ হাজার ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে।

প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ছোট জেলা হওয়ায় মেহেরপুরে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে টিকার বরাদ্দ তুলনামূলক কম। তবে গাংনীকে অ্যানথ্রাক্সপ্রবণ এলাকা হিসেবে ঘোষণার পর গত বছর মেহেরপুর জেলার ইতিহাসে সর্বোচ্চ টিকার বরাদ্দ এসেছিল।

মেহেরপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. তোফাজ্জল হোসেন বলেন, অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে প্রাণিসম্পদ বিভাগ কাজ করছে। অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত বা সন্দেহজনক গবাদিপশু জবাই না করে দ্রুত সংশ্লিষ্ট প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের জানানো এবং আক্রান্ত পশুর মাংস স্পর্শ ও নাড়াচাড়া থেকে বিরত থাকতে গবাদিপশু পালনকারীদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

মেহেরপুরের সিভিল সার্জন ডা. এ কে এম আবু সাঈদ বলেন, ৩ ধরনের অ্যানথ্রাক্স হয়ে থাকে। এর মধ্যে এ এলাকায় কিউটেনিয়াস অ্যানথ্রাক্স হচ্ছে। রোগীদের চিকিৎসা অব্যাহত রয়েছে। সমন্বিত কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা না থাকায় এ রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

তিনি জানান, অ্যানথ্রাক্স নিয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। 

—জা. অর্থনীতি/এনজে