Print Date & Time : 21 October 2026 Wednesday 09:44 am

ঝিনুকের সৌন্দর্যে নতুন রূপে কুয়াকাটা

image

মিলন কর্মকার রাজু, কলাপাড়া (পটুয়াখালী): শেষ বিকালে সাগরের নীল জল আছড়ে পড়ছে তীরে।  আর তাতে ভেসে আসছে সাদা ঝিনুক। পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটার লেম্ফুর বন এখন যেন ঝিনুকের সৈকত। দীর্ঘ তিন কিলোমিটার সৈকতজুড়ে এভাবে বালুতটে আটকে আছে ঝিনুক। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন সাদা ঝিনুকের কার্পেট বিছিয়ে রাখা হয়েছে। সাগর তীরের এ অপরূপ সৌন্দর্য যা গত দেড় যুগেও দেখা যায়নি। আর এ ঝিনুকের বিচ দেখতেই ছুটে আসছে পর্যটকরা। তারা সৈকত থেকে ঝিনুক কুড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে।  তবে অনিয়ন্ত্রিত মোটরসাইকেল চলাচলের কারণে সামুদ্রিক এ প্রাণী বৈচিত্র্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। গবেষকরা বলেন, হঠাৎ সমুদ্রে অতিরিক্ত স্রোত, বালু ক্ষয় কিংবা সমুদ্রের তলদেশে ঝিনুকের মৃত্যু হলে জোয়ারে ভেসে আসতে পারে। তবে এ নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন।  আর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, সামুদ্রিক প্রাণী বৈচিত্র্য রক্ষায় কুয়াকাটার এ ঝিনুকের বিচে যান ও মানুষ চলাচল সীমিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। 

সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের অপরূপ দৃশ্য একই স্থানে দাঁড়িয়ে উপভোগ করা যায় পটুয়াখালীর কলাপাড়ার কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত থেকে। বর্ষায় সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ,  আর বড় বড় ঢেউয়ের বুকচিরে জেলে ট্রলারের সংগ্রামী জীবনও দেখা যায় কুয়াকাটা সৈকতে দাঁড়িয়ে। 

দীর্ঘ ১৮ কিলোমিটার সৈকতের পূর্ব দিকে রয়েছে জাতীয় উদ্যান, গঙ্গামতি সৈকত। মাঝ সাগরে রয়েছে জেগে ওঠা নতুন দ্বীপচর বিজয়।  আর পশ্চিমের লেম্ফুর বন ও তিন নদীর মোহনা। ওপারে রয়েছে ফাতরার সংরক্ষিত বনাঞ্চল।  মূলত কুয়াকাটা সৈকতে ঘুরতে আসা অধিকাংশ পর্যটকের শেষ বিকালটা এখানেই কাটে। আর এ লেম্ফুর বন সৈকত এখন পরিণত হয়েছে ঝিনুকের সৈকতে।

কুয়াকাটার জিড়ো পয়েন্ট এবং পূর্ব দিকের সৈকতের চেয়ে এ সৈকত একটু উঁচু। এ কারণে  গত এক সপ্তাহ ধরে এ সৈকতে ভেসে আসছে ঝিনুক। সাগরের সকালের জোয়ারে ভেসে আসা এ ঝিনুক সাগরের ভাটায় পানি নেমে গেলে বিকালে বালুতটে জেগে ওঠে। প্রায় তিন কিলোমিটার সৈকতজুড়ে  এভাবে ঝিনুগুলো0 আটকে আছে।  যা দেখতে ছুটে আসছে পর্যটকরা। 

পর্যটকরা বলেন, এতো সুন্দর সৈকত এবং ঝিনুক আগে কখনও দেখেননি। কেউ কেউ ব্যাগ ভরে ঝিনুক কুড়িয়েও নিয়ে যাচ্ছে।  কেউবা শখ করে তুলছে হাতে দেখার জন্য। 

কুমিল্লার পর্যটক দম্পতি রিয়াদুল ইসলাম ও আসমা সিদ্দিকা বলেন, গত পাঁচ বছর ধরে বর্ষার শেষের দিকে কুয়াকাটায় ভ্রমণে আসেন সাগরের ঢেউ উপভোগের জন্য। এবার সাগরে অনেক ঢেউ। কিন্তু সবচেয়ে ভালো লেগেছে এ ঝিনুকের বিচে হেঁটে। এতো ঝিনুক তারা আগে কখনও দেখেননি। 

আট বছরের মাহিন ও তার বোন মাইশা ব্যাগে ভরে কুড়িয়ে নিচ্ছে ঝিনুক। মাইশা জানায়, বইতে তারা ঝিনুক দেখেছে। এবার ছুটিতে ঘুরতে এসে সত্যিকারের সাদা ঝিনুক দেখেছে। তাই স্কুলের বন্ধুদের দেখাতে ও খেলার জন্য ঝিনুক কুড়িয়ে নিচ্ছে। 

কুয়াকাটায় ঘুরতে আসা পর্যটকরা বলেন, একদিকে ঝাউ বন। অন্যদিকে তিন নদীর মোহনা। সামনে শান্ত সাগর। আর সৈকতে এভাবে সাদা ঝিনুক।  সত্যিই অসাধারণ সৌন্দর্য। যা আগে কখনও দেখেননি তারা। তবে এগুলো গাড়ি চলাচলের কারণে নষ্ট হওয়ায় অনেকে হতাশা ব্যক্ত করেন।

একাধিক পর্যটক বলেন, কুয়াকাটার এ ঝিনুকের সৈকত রক্ষা করা জরুরি। তারা বলেন, মানুষ ঝিনুকের ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। কেউবা মোটরসাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে ছবি তুলতে তুলতে। এতে ঝিনুক ভেঙে গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে। তাই এ সৈকতে বাইক চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া উচিত। 

এদিকে হঠাৎ করে বিশাল সমুদ্র তীরের লেম্ফুর বন সৈকতে এভাবে ঝিনুক ভেসে আসার কারণ নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন বলে জানালেন গবেষকরা।

শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিসারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের সহকারী অধ্যাপক ও গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, মূলত সামুদ্রের তলদেশে অক্সিজেন সংকট, বালুক্ষয় কিংবা সাগরের তীব্র ঘুর্ণায়মান  স্রোত ও ঢেউয়ের কারণে ঝিনুকগুলো জোয়ারে ভেসে আসতে পারে। মূলত শীতের সময়ে সমুদ্রের মৃত ঝিনুক জোয়ারে ভেসে আসে। কিন্তু শরতের এ সময়ে এতো ঝিনুক ভেসে আসা একটি সামুদ্রিক প্রাণীসম্পদ বিপর্যয়ের একটি লক্ষণ। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সমুদ্রের তলদেশে খাদ্য সংকট, নিষিদ্ধ জালের অবাধ ব্যবহারে ঝিনুকের বিচরণ ক্ষেত্র নষ্ট হয়ে এমন বিপর্যয় হতে পারে। এ বিষয়ে ভেসে আসা ঝিনুক জীবিত কি না সেটি দেখা প্রয়োজন। পাশাপাশি এর মাসেল সংগ্রহ করে গবেষণা প্রয়োজন। 

কুয়াকাটা পৌর প্রশাসক ও কলাপাড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইয়াসীন সাদেক বলেন, কুয়াকাটা সৈকত এবং সৈকতের জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় তারা কাজ করছেন। 

কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্য সচিব মো. আরিফুজ্জামান বলেন, কুয়াকাটার এ প্রাণী বৈচিত্র্য রক্ষা করতে তারা উদ্যোগ গ্রহণ করবেন। এ সৈকতে যান চলাচল ও নির্দিষ্ট জায়গা দিয়ে চলাচল সীমিত করা হবে। 

পরিবেশকর্মী ও ভ্রমণপিপাসুরা বলেন, কুয়াকাটা সৈকতের এ জায়গা সংরক্ষিত করা হলে পর্যটকরা নির্দিষ্ট স্থানে দাঁড়িয়ে এর সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবে। তবে অবাধে মোটরসাইকেল চলাচল করলে এবং ইচ্ছেমতো ঝিনুক কুড়িয়ে নিলে এগুলো ধ্বংস হয়ে যাবে। এ বিষয়ে বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি ও প্রশাসনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।