জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক:
ভবিষ্যতে যদি রোবটই মানুষের প্রায় সব কাজ করে ফেলে, তাহলে মানুষ করবে কী? চাকরি না থাকলে আয় আসবে কোথা থেকে, আর মানুষ কীভাবে নিজের জীবন চালাবে? সব কাজের জায়গা যদি মেশিন দখল করে নেয়, তাহলে কি আসবে সবার জন্য মৌলিক আয়? নাকি কাজের বদলে সৃজনশীলতা, শিক্ষা, বিনোদন আর অবসরই হয়ে উঠবে নতুন অর্থনীতির ভিত্তি?
আজকের অর্থনীতিতে চাকরি শুধু অর্থ উপার্জনের মাধ্যম নয়। চাকরি মানুষের পরিচয়, সামাজিক মর্যাদা, দক্ষতা এবং দৈনন্দিন জীবনের বড় একটি অংশ। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবট যদি ভবিষ্যতে মানুষের অনেক কাজ করতে পারে, তাহলে এই পুরো কাঠামোই বদলে যেতে পারে।
ইতিমধ্যেই রোবট শিল্পকারখানায় উৎপাদন, গুদাম ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আবার লেখালেখি, হিসাব, তথ্য বিশ্লেষণ, গ্রাহকসেবা ও সফটওয়্যারের মতো মানসিক শ্রমের ক্ষেত্রেও দ্রুত সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে আগামীকালই সব চাকরি শেষ হয়ে যাবে। বরং অনেক ক্ষেত্রে কাজের ধরন বদলানোর সম্ভাবনাই বেশি। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ২০২৫ সালের ‘ফিউচার অব জবস’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, অর্থনৈতিক পরিবর্তন ও অন্যান্য কারণে বিশ্বজুড়ে ১৭ কোটি নতুন চাকরি তৈরি হতে পারে, একই সময়ে প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ চাকরি স্থানচ্যুত হতে পারে। অর্থাৎ প্রযুক্তি কিছু কাজ সরিয়ে দিলেও নতুন কাজও তৈরি করতে পারে।
কিন্তু যদি একসময় এমন পর্যায়ে পৌঁছানো যায়, যখন রোবট ও এআই মানুষের প্রয়োজনের তুলনায় বেশি কাজ করতে সক্ষম হয়, তখন বড় প্রশ্ন হবে মানুষের আয় আসবে কোথা থেকে?
এখানে আলোচনায় আসে ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম বা সবার জন্য মৌলিক আয়। সহজভাবে বললে, নির্দিষ্ট শর্ত ছাড়াই একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ নিয়মিতভাবে প্রত্যেক নাগরিককে দেওয়ার ধারণাই ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম। এর উদ্দেশ্য হতে পারে মানুষের মৌলিক জীবনযাত্রার খরচ নিশ্চিত করা, বিশেষ করে যখন প্রচলিত চাকরির বাজারে মানুষের প্রয়োজন কমে যায়।
তবে ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম এখনো অধিকাংশ দেশের নিয়মিত জাতীয় অর্থনৈতিক কাঠামো নয়। এর অর্থায়ন, মূল্যস্ফীতি, কাজের প্রণোদনা এবং সরকারের ব্যয় নিয়ে বড় বিতর্ক রয়েছে।
আর যদি মানুষের কাজের সময় সত্যিই কমে যায়, তাহলে তৈরি হতে পারে ‘লেজার ইকোনমি’ বা অবসরভিত্তিক অর্থনীতি। মানুষ হয়তো সপ্তাহে পাঁচ দিন অফিস করার পরিবর্তে শিক্ষা, খেলাধুলা, শিল্প, ভ্রমণ, পরিবার, গবেষণা কিংবা সৃজনশীল কাজে বেশি সময় দেবে।
এর সঙ্গে নতুন ধরনের চাকরিও তৈরি হতে পারে। মানুষ এমন কাজ বেছে নিতে পারে যেখানে মানবিক বিচার, সহানুভূতি, নেতৃত্ব, সৃজনশীলতা কিংবা সামাজিক যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে রোবট পরিচালনা, এআই ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি নিরাপত্তা ও নতুন ধরনের সেবার চাহিদা বাড়তে পারে।
তবে এখানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক।
মানুষ যদি কাজের মাধ্যমে নিজের পরিচয় তৈরি করে থাকে, তাহলে কাজের প্রয়োজন কমে গেলে সেই পরিচয়ের জায়গায় কী আসবে? অবসর তখন আনন্দের পাশাপাশি এক ধরনের শূন্যতাও তৈরি করতে পারে।
তাই ভবিষ্যতের সমাজে শিক্ষা হয়তো শুধু চাকরি পাওয়ার জন্য হবে না। মানুষকে শেখানো হতে পারে কীভাবে নিজের সময় ব্যবহার করতে হয়, কীভাবে সৃজনশীল হতে হয় এবং প্রযুক্তির সঙ্গে কাজ ভাগ করে নিতে হয়।
অর্থাৎ রোবট যদি মানুষের কাজ কমিয়ে দেয়, তাহলে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় সম্পদ হতে পারে সময়।
তবে সেই সময় সবার জন্য স্বাধীনতা হবে, নাকি কেবল প্রযুক্তির মালিকদের জন্য সুবিধা সেটাই নির্ভর করবে নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো কীভাবে তৈরি হয় তার ওপর।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি