Print Date & Time : 23 October 2026 Friday 04:03 pm

ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত শ্যামনগরে পানি সংকটের অবসান

image

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি: চারিদিকে অগণিত জলরাশি থাকলেও সেখানে পানের উপযোগী একফোঁটা পানির জন্য হাহাকার। উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরার সুন্দরবন সংলগ্ন শ্যামনগর উপজেলার নিত্যদিনের বাস্তবতা ছিল এটি। দীর্ঘকাল ধরে মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ত পানি পান করার ফলে এই অঞ্চলের অধিবাসীরা পেটের পীড়া, চর্মরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনি জটিলতার মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ভুগছিলেন।

মাইলের পর মাইল হেঁটে সুপেয় পানি বয়ে আনার চরম দুর্ভোগ পোহাতে হতো স্থানীয় নারী ও কোমলমতি মেয়েদের, যার কারণে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বহু কিশোরীর নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাওয়া। বিশেষ করে ২০০৭ সালের সিডর এবং ২০০৯ সালের প্রলয়ঙ্করী আইলার পর থেকে এলাকার মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানি পানের একবারে অযোগ্য হয়ে পড়ে। তবে উপকূলীয় মানুষের এই বহু বছরের দুর্ভোগের চিত্রে অবশেষে স্বস্তির আলো ফুটেছে।

বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান আবুল খায়ের গ্রুপের অর্থায়নে খাগড়াঘাট ও কৈখালী গ্রামে স্থাপন করা হয়েছে দুটি আধুনিক রিভার্স অসমোসিস পানি শোধনাগার, যার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মাধ্যমে বদলে গেছে দুটি গ্রামের হাজারো মানুষের দৈনন্দিন জীবন।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) দুপুরে শ্যামনগরের খাগড়াঘাট ও কৈখালী এলাকায় উপস্থিত থেকে নবনির্মিত এই সুপেয় পানি প্ল্যান্ট দুটির উদ্বোধন করেন আবুল খায়ের গ্রুপের সিইও শাবাব আহমেদ।

৫০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাট, বাজনা শুনে হয় চুক্তি
 
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে শাবাব আহমেদ বলেন, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর সুপেয় পানির সংকট ও মানবিক বিপর্যয় তাদের গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল। ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর লক্ষ্যেই তারা এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।

করোনা মহামারীর সময় বিনামূল্যে অক্সিজেন সরবরাহের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তীব্র সংকটে পড়া উপকূলীয় এই জনপদে মানুষকে স্বাস্থ্যকর জীবন উপহার দিতেই এই দীর্ঘস্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা হয়েছে।

বাস্তবায়িত এই প্রকল্পে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির পাশাপাশি যুক্ত করা হয়েছে অত্যন্ত আধুনিক ও অপচয়হীন স্মার্ট ব্যবস্থাপনা। ঢাকা ওয়াসার স্মার্ট প্রযুক্তির মতো প্রতিটি গ্রাহককে দেওয়া হয়েছে বিশেষ ডিজিটাল কার্ড, যা পাম্পের সামনে স্পর্শ করলেই পানি পড়ে এবং সরিয়ে নিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

অসচ্ছল মানুষের সাধ্যের কথা বিবেচনা করে ব্যবস্থাটি সম্পূর্ণ ক্যাশলেস রাখা হয়েছে এবং প্রতি লিটার পানির পরিচালন খরচ ধরা হয়েছে মাত্র ৫০ পয়সা, যা স্থানীয় বাজারের চেয়ে অনেক কম। পল্লী বিদ্যুতের চাপ ও লোডশেডিং থেকে মুক্ত থেকে নিরবচ্ছিন্ন সচলতা নিশ্চিতে প্রতিটি প্ল্যান্টে ১০টি করে সোলার প্যানেল বসানো হয়েছে।

পুরো প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে ‘খান ট্রেডার্স’ এবং স্থানীয় তরুণদের সামাজিক সংগঠন ‘শরুব ইয়ুথ ক্লাব’-এর সদস্যরা। যা স্থানীয়ভাবে তরুণদের কর্মসংস্থানেও নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।

বুকিংয়ের নথিতে আছে নিখোঁজ নাহিদুরসহ দুই সন্তান ও স্ত্রীর নাম

নিজের জমি দান করে এই সংকট নিরসনে এগিয়ে আসা প্রকল্প সভাপতি নূর উদ্দীন সরদার জানান, লালচে আয়রন ও বিষাক্ত লোনা পানির বদলে এখন মানুষ তাদের ঘরের দুয়ারে নিরাপদ পানি পাচ্ছে। পানি সংগ্রহের দীর্ঘ দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেয়ে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন এলাকার সাধারণ মানুষও।

খাগড়াঘাটের রহিমা বেগম ও কৈখালীর আমেনা খাতুন উচ্ছ্বসিত হয়ে জানান, আগে শুধু বছরের দু-তিন মাস বৃষ্টির পানি পাওয়া যেত এবং বাকি সময় বহুদূর হেঁটে লোনা পানি এনে পান করতে হতো। এখন থেকে কলের নলেই তাজা মিষ্টি পানি মেলায় জীবনমানের চরম পরিবর্তন হবে। এই সুপেয় পানির প্ল্যান্ট দুটি এখন শুধু উপকূলীয় তৃষ্ণা মেটানোর মাধ্যম নয়, বরং স্বাস্থ্য, সুরক্ষা ও স্বাবলম্বিতার এক নতুন মাইলফলক হয়ে উঠবে।

—জা. অর্থনীতি/এনজে