Print Date & Time : 07 November 2026 Saturday 07:13 pm

আদালতে রাইয়ান হত্যার বর্ণনা, উঠে এলো মরদেহ গুমের চেষ্টা

image

পটুয়াখালী প্রতিনিধি: পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় সাড়া জাগানো ১০ মাসের শিশু রাইয়ান হত্যা মামলায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন ঘাতক খালু আল-আমিন। স্বীকারোক্তিতে অবোধ শিশুটিকে বিছানা থেকে তুলে নিয়ে হত্যা এবং পরবর্তীতে মরদেহ গুম করার রোমহর্ষক ও নৃশংস বর্ণনা দিয়েছেন তিনি।  

জবানবন্দি সূত্রে জানা যায়, ঘটনার দিন ভোরে শ্যালিকা রুমানা বেগমের বসতঘর থেকে ঘুমন্ত অবস্থায় ১০ মাসের রাইয়ানকে গোপনে তুলে নিয়ে যান আল-আমিন। পরে শিশুটিকে পার্শ্ববর্তী একটি পরিত্যক্ত ঘরে রেখে নিথর অবস্থায় দেখতে পান। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর একটি কাপড়ের ব্যাগে মরদেহ ভরে গুম করার উদ্দেশ্যে প্রথমে ঘরের টিনের চালে তুলে রাখেন। পরবর্তীতে ব্যাগটি উদ্ধার হওয়ার ভয়ে বাড়ির পাশের খালে ফেলে দেন। কিন্তু ব্যাগটি পানিতে না ডুবে ভেসে উঠলে তা খালের কচুরিপানার মধ্যে চতুরতার সাথে লুকিয়ে রাখেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি।  

আরও পড়ুন: নিখোঁজের দুই দিন পর শিশুর মরদেহ উদ্ধার

হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কারণ হিসেবে আসামি আল-আমিন জানান, তার স্ত্রী ফিরোজা বেগমের সঙ্গে পারিবারিক বিরোধ মেটাতে শ্যালিকা রুমানার কাছে গিয়ে তিনি চরম অপমানিত হন। সেই অপমান ও ক্ষোভ থেকেই শিশু রাইয়ানের ক্ষতি করার প্রতিশোধপরায়ণ পরিকল্পনা করেন তিনি। এর আগেও একাধিকবার তিনি রাইয়ানকে অপহরণ বা ক্ষতি করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিলেন বলেও স্বীকার করেন। 

চার দিনের নিবিড় পুলিশি রিমান্ড শেষে আসামিকে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদানের জন্য আদালতে হাজির করা হয়। জবানবন্দি গ্রহণ শেষে বিজ্ঞ আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও কলাপাড়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. ফোরকান মিয়া জানান, আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনায় গত ১৮ অক্টোবর আসামি আল-আমিনকে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। রিমান্ডে পাওয়া তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের পর ২১ অক্টোবর তাকে আদালতে সোপর্দ করা হলে তিনি স্বেচ্ছায় জবানবন্দি দেন।  

এদিকে সন্তানহারা মা রুমানা বেগম এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছেন। পাশাপাশি আল-আমিনের সহযোগী ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের কাছ থেকে অনবরত হুমকির অভিযোগ তুলে নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, আল-আমিন একজন চিহ্নিত মাদকসেবী ও মাদক কারবারের সঙ্গে যুক্ত; তবে পুলিশ জানায় এসব বিষয়ে আইনগত তদন্ত চলছে।   

নিহত শিশুটির দাদি হালিমা বেগম অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে ঘাতকের সর্বোচ্চ শাস্তি (মৃত্যুদণ্ড) দাবি জানান। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আসামি যদি আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে পার পেয়ে যায়, তবে তাদের পরিবারের অন্য সদস্যরাও মারাত্মক জীবনঝুঁকিতে পড়বেন।

উল্লেখ্য, গত ১৫ অক্টোবর নিজ ঘরে বাবার পাশে ঘুমন্ত অবস্থায় নিখোঁজ হয় শিশু রাইয়ান। নিখোঁজের প্রায় ৫৩ ঘণ্টা পর ১৭ অক্টোবর সকালে বাড়ির পাশের খালের কচুরিপানার নিচ থেকে ব্যাগবন্দি ও বিকৃত অবস্থায় তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় সমগ্র কলাপাড়ায় ব্যাপক শোক ও গণক্ষোভের সৃষ্টি হয়।  

কলাপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নজরুল ইসলাম জানান, আসামি আদালতে অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। মামলার পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া ও চার্জশিট দাখিলের প্রস্তুতি চলছে। ভুক্তভোগী পরিবারের নিরাপত্তার স্বার্থে সব ধরনের নজরদারি রাখা হচ্ছে এবং কোনো হুমকি বা আশঙ্কার সৃষ্টি হলে তাৎক্ষণিকভাবে থানাকে অবহিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

—জা. অর্থনীতি/এলএটি