জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: একটা কাজের জন্য টিন সার্টিফিকেট করেছিলেন। কাজ শেষ, ব্যবসাও নেই, আয়ও আগের মতো নেই! কিন্তু টিন নম্বরটি রয়ে গেছে। এখন প্রশ্ন হলো, প্রতি বছর কি রিটার্ন জমা দিতেই হবে? আর এই ঝামেলা থেকে মুক্তির কোনো উপায় আছে?
উত্তর হলো, হ্যাঁ, নির্দিষ্ট শর্তে টিন নিবন্ধন বাতিলের আবেদন করা যায়। তবে, শুধু টিনের আর প্রয়োজন নেই, কিংবা আয় কমে গেছে, এমন কারণ দেখালেই মিলবে না মুক্তি। জানতে হবে, আইন কী বলছে, কারা আবেদন করতে পারবেন এবং কোথায় যেতে হবে।
টিন থাকলেই কি কর দিতে হবে?
প্রথমেই একটি ভুল ধারণা ভাঙা জরুরি। টিন বা ট্যাক্সপেয়ার আইডেন্টিফিকেশন নম্বর হলো করদাতার পরিচিতি নম্বর। এটি থাকলেই যে সবাইকে আয়কর দিতে হবে, তা নয়। কর দিতে হবে কিনা, তা নির্ভর করে আয় ও প্রযোজ্য আইনসহ সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতির ওপর।
তবে কিছু ক্ষেত্রে টিনের কারণে আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ দেখানোর বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে। তাই টিন করেছেন বলেই কর দিতে হবে, আবার কর দিতে হয় না বলেই রিটার্নের দায়িত্বও নেই—দুটির কোনোটিই ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
কোন পরিস্থিতিতে টিন বাতিলের সুযোগ?
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ২৬২ ধারায় করদাতার নিবন্ধন বাতিলের বিষয়ে বলা হয়েছে। কয়েকটি পরিস্থিতিতে আবেদন করার সুযোগ রয়েছে।
প্রথমত, করযোগ্য আয় না থাকলে। তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত আছে। টানা তিন বছর করযোগ্য আয় শূন্য এবং ভবিষ্যতেও শারীরিক অক্ষমতা বা অন্য কোনো কারণে করযোগ্য আয় শূন্য থাকার পরিস্থিতি আইনে উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি, রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও না থাকার শর্ত রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, একই ব্যক্তির নামে ভুলবশত একাধিক টিন তৈরি হলে কিংবা ভুল করে নিবন্ধন নেওয়া হলে বাতিলের আবেদন করা যায়।
তৃতীয়ত, কোনো ব্যক্তি স্থায়ীভাবে বাংলাদেশ ছেড়ে চলে গেলে এবং দেশে আয় উপার্জনের কোনো কর্মকাণ্ড না চালালে আবেদন করতে পারেন।
চতুর্থত, করদাতার মৃত্যু হলে, কোনো প্রতিষ্ঠান বিলুপ্ত হলে কিংবা ব্যবসার আইনি পরিচয় পরিবর্তন হলে সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি বিবেচনায় নিবন্ধন বাতিলের আবেদন করা যায়।
এছাড়া, আইনসম্মত অন্য কারণেও আবেদন করা সম্ভব। তবে মনে রাখতে হবে, এসব কারণের কোনোটি থাকলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে টিন বাতিল হয়ে যাবে না।
কীভাবে করবেন আবেদন?
এবার আসল প্রশ্ন, আবেদন করবেন কোথায়? জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রকাশিত নির্দেশনা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কর সার্কেলের উপকর কমিশনারের কাছে কারণ ব্যাখ্যা করে টিন বাতিলের আবেদন করা যায়। প্রথমে নিজের টিন সার্টিফিকেটে উল্লেখ করা কর অঞ্চল ও কর সার্কেলের তথ্য দেখে নিন। এরপর সংশ্লিষ্ট উপকর কমিশনার বরাবর লিখিত আবেদন তৈরি করুন। সেখানে টিন নম্বর, পরিচয় এবং কেন নিবন্ধন বাতিল করতে চান, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।
আবেদনের সঙ্গে টিন সার্টিফিকেট ও জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি দিতে হতে পারে। ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলে তার প্রমাণ, করদাতার মৃত্যু হলে মৃত্যু সনদ কিংবা আবেদনকারীর পরিস্থিতি অনুযায়ী অন্যান্য কাগজপত্রও প্রয়োজন হতে পারে। আগের আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ বা অন্যান্য কর-সংক্রান্ত নথিও চাওয়া হতে পারে। তাই আবেদন জমা দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কর সার্কেল থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকা নিশ্চিত করে নেওয়াই ভালো।
অনলাইনে আবেদন করার সুবিধা আছে কিনা, তা এনবিআরের বর্তমান সেবা থেকে যাচাই করুন। অনলাইনে টিন খোলার সুবিধা থাকলেই বাতিলের পুরো প্রক্রিয়াও অনলাইনে করা যাবে—এমনটি ধরে নেবেন না।
ওয়েবসাইট: nbr.gov.bd
আবেদন করলেই কি টিন বাতিল?
এখানেই রয়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আবেদন পাওয়ার পর কর কর্তৃপক্ষ যাচাই করবেন, আবেদন বাতিলের কারণ যথাযথ কিনা। পাশাপাশি, করদাতার কোনো বকেয়া কর বা অন্য পরিশোধযোগ্য দায় রয়েছে কিনা, কর নির্ধারণের কোনো প্রক্রিয়া চলছে কিনা এবং কোনো আদালত বা সংশ্লিষ্ট ফোরামে আয়কর-সংক্রান্ত বিরোধ বিচারাধীন কিনা, সেসব বিষয়ও বিবেচনায় আসবে।
এসব শর্ত পূরণ হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত হলেই নিবন্ধন বাতিলের অনুমোদন দিতে পারেন। অর্থাৎ আবেদন জমা দিয়েই কাজ শেষ নয়। অনুমোদন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত টিন বাতিল হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যাবে না।
বাতিলের পর কী মনে রাখবেন?
আরেকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। টিন বাতিল মানে আগের সব তথ্য মুছে ফেলা নয়। আইন অনুযায়ী, নিবন্ধন বাতিলের অর্থ হলো, টিআইএন নিষ্ক্রিয় করা এবং সাধারণ ব্যবহারের অনুপযোগী করে দেওয়া। এনবিআর প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট তথ্য ও নথি সংরক্ষণ করতে পারে।
এছাড়া, বাতিলের আগের কোনো বকেয়া কর বা আইনগত দায় থাকলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যায় না। তাই শুধু রিটার্ন দাখিলের ঝামেলা এড়াতে তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না।
সিদ্ধান্ত আপনার, নিয়ম আইনের
সব মিলিয়ে, টিন সার্টিফিকেট আর প্রয়োজন না হলে সেটি বাতিলের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন বৈধ কারণ, সঠিক আবেদন এবং কর-সংক্রান্ত দায় নিষ্পত্তির বিষয়টি নিশ্চিত করা।
আপনার টিন বাতিল করা উচিত, নাকি ভবিষ্যতের প্রয়োজনে রেখে দেওয়া ভালো—সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজের আয়, সম্পদ, ব্যবসা এবং রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা যাচাই করুন। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর সার্কেল বা কর বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। কারণ, টিন বাতিলের আবেদন করা এক বিষয়, আর আইন অনুযায়ী নিবন্ধন বাতিলের অনুমোদন পাওয়া সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি