Print Date & Time : 08 November 2026 Sunday 02:14 pm

বিশ্ব অর্থনীতিতে ‘দুর্বল’ ট্রাম্পের প্রভাব কেমন হবে

image

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের কাছে বড় ধাক্কা খেয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি। প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সীমিত হতে পারে। তবে একইসঙ্গে আরও অনিশ্চিত ও সংঘাতপূর্ণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির আশঙ্কাও করা হচ্ছে। এর প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতিতেও পড়তে পারে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান।

অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের ফল শেয়ারবাজার, মূল্যস্ফীতি, সুদের হার, সরকারি ঋণের খরচ এবং মানুষের জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর এশিয়ার বাজারে প্রথম দিকে দরপতন হলেও পরে বিনিয়োগকারীরা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে অবস্থান বদলান। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সাধারণত বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করে। তবে ট্রাম্প নির্বাচনের ফল মেনে নিয়েছেন এবং ভোটারদের অসন্তোষের বিষয়টি স্বীকার করায় বাজারে কিছুটা স্বস্তি এসেছে। অবশ্য ট্রাম্প নিজেকে ‘মিস্টার ভেটো হিসেবে তুলে ধরার হুমকি দিয়েছেন। ফলে তার মেয়াদের শেষ দুই বছর রাজনৈতিকভাবে অস্থির থাকতে পারে।

বেরেনবার্গের প্রধান অর্থনীতিবিদ হোলগার স্মিডিংয়ের মতে, নির্বাচনের ফল দেখিয়েছে, মার্কিন ভোটাররা ট্রাম্পের নীতি ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের প্রবণতা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার মতে, এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার ব্যবস্থা কার্যকর থাকার বিষয়টিও স্পষ্ট হয়েছে।

শেয়ারবাজারের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নির্ভর করবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের অগ্রগতির ওপর। ডেমোক্র্যাটরা এআই নিয়ন্ত্রণ এবং ডেটা সেন্টার নির্মাণে কঠোর অবস্থান নিতে পারে। এতে এআইনির্ভর বিনিয়োগ ও শেয়ারবাজারের প্রবৃদ্ধি নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠতে পারে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের অন্যতম কারণ ছিল মূল্যস্ফীতি। ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়া এবং ট্রাম্পের অস্থির শুল্কনীতি ছোট ব্যবসাগুলোর ওপর চাপ তৈরি করেছে। গত আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় ওঠে। একই সময়ে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৭ শতাংশে।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা লাগে। ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়ে। তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরান নিয়ে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় গত বুধবার তেলের দাম সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৯৪ ডলারে নেমে এলেও যুদ্ধ শুরুর আগের প্রায় ৭০ ডলারের তুলনায় তা এখনও অনেক বেশি।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) মনে করছে, যুদ্ধের কারণে চলতি বছর বিশ্বে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে। এতে জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোই সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বে। ইরানের সঙ্গে সংঘাত আরও বাড়লে মূল্যস্ফীতির চাপ তীব্র হতে পারে। এ কারণে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও আরও কমতে পারে।

উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে। ট্রাম্পের চাপ উপেক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভও ২০২৩ সালের পর প্রথমবার ঋণের খরচ বাড়িয়েছে। ইরান যুদ্ধ এবং মূল্যস্ফীতির অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকায় বিনিয়োগকারীরা ফেডের কাছ থেকে আরও অন্তত এক দফা সুদের হার বাড়ানোর প্রত্যাশা করছেন। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকও ঋণের খরচ বাড়ানোর পথে যেতে পারে।

কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে নতুন নিয়োগ অনুমোদনের জন্য রিপাবলিকানদের হাতে প্রয়োজনীয় ভোট থাকবে না। এর মধ্যে ফেডারেল রিজার্ভের নতুন গভর্নর নিয়োগও রয়েছে। তবে ট্রাম্পের ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে। কংগ্রেসের উভয় কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য একমত হলে সেই ভেটো বাতিল করা সম্ভব।

ইরান যুদ্ধের কারণে মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার বাড়ায় সরকারি ঋণের খরচও বেড়েছে। এতে যেসব দেশের সরকারি ঋণ বেশি, সেসব দেশের ওপর চাপ আরও বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক অচলাবস্থার বড় পরীক্ষা হবে আগামী ১১ ডিসেম্বর। ওই সময় সরকারের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া ঠেকাতে কংগ্রেসকে সরকারি ব্যয় অনুমোদন করতে হবে।

ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের অচলাবস্থা অব্যাহত থাকলে নতুন কর ও ব্যয় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে। এতে একদিকে অর্থনীতিকে চাঙা করতে সরকারের ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ কমবে, অন্যদিকে সরকারি ঋণ আরও দ্রুত বাড়ার ঝুঁকিও কিছুটা কমবে।

রাজনৈতিক অস্থিরতা, বাণিজ্যনীতি এবং অভিবাসন নিয়ে ট্রাম্পের পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। তবে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মূল্যস্ফীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কমার সম্ভাবনা।

বেরেনবার্গের বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক অচলাবস্থা, এআই খাতে বিনিয়োগের গতি কমে যাওয়া এবং ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী নীতির কারণে ২০২৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধি প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এতে বিশ্ব অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধির অবদানও আগের তুলনায় কমে যাবে।