Print Date & Time : 08 November 2026 Sunday 02:14 pm

রোনালদো যুগের সমাপ্তি

image

ক্রীড়া প্রতিবেদক: বিশ্ব ফুটবলের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র, রেকর্ডের বরপুত্র এবং পর্তুগিজ ফুটবলের জীবন্ত কিংবদন্তি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো আন্তর্জাতিক ফুটবলকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানিয়েছেন। দীর্ঘ ২৩ বছরের এক অবিশ্বাস্য ও বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের সমাপ্তি ঘটিয়ে ৪১ বছর বয়সি এই মহাতারকা পর্তুগাল জাতীয় দলের জার্সি চিরতরে তুলে রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি আবেগঘন ও হৃদয়স্পর্শী বার্তার মাধ্যমে তিনি এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত জানান। তার এই বিদায়ের মধ্য দিয়ে বিশ্ব ফুটবলের এক গৌরবময় ও রূপকথার অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।

২০০৩ সালে পর্তুগাল জাতীয় দলের হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেক ঘটেছিল এক তরুণ রোনালদোর। এরপর কেটে গেছে দুই দশকেরও বেশি সময়। এই দীর্ঘ পথচলায় তিনি শুধু পর্তুগালেরই নন, বরং বিশ্ব ফুটবলের অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে পুরুষ বিভাগে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ড এখন তার দখলে। জাতীয় দলের হয়ে তিনি সব মিলিয়ে ২৩৪টি ম্যাচ খেলেছেন, যা ফুটবলারদের নিষ্ঠা ও দীর্ঘস্থায়িত্বের এক অনন্য নজির।

মাঠে নামা মানেই নতুন কোনো রেকর্ডের হাতছানি— রোনালদোর ক্যারিয়ার ছিল ঠিক এমনই। পর্তুগালের জার্সিতে গোল করার অদম্য ক্ষুধায় তিনি প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে সবসময় তটস্থ করে রেখেছেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে তিনি রেকর্ডবুকে নিজের নাম খোদাই করে গেছেন। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি প্রতিপক্ষের জালে বল জড়িয়েছেন অবিশ্বাস্য ১৪৬ বার। তার এই গোলসংখ্যা ও ম্যাচ খেলার রেকর্ড আগামীতে যেকোনো ফুটবলারের জন্য এক পাহাড়সমান চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল রত্ন নিঃসন্দেহে ২০১৬ সালের উয়েফা ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ জয়। তার জাদুকরী নৈপুণ্য এবং সামনে থেকে করা নেতৃত্বেই পর্তুগাল প্রথমবারের মতো কোনো বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের শিরোপা জিতেছিল। যদিও ফাইনালে ফরাসিদের বিপক্ষে ম্যাচের প্রথমার্ধেই ইনজুরির কারণে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল তাকে, তবুও সাইডলাইন থেকে সতীর্থদের যেভাবে তিনি উজ্জীবিত করেছিলেন, তা পর্তুগিজ ফুটবল ইতিহাসে রূপকথার মতো স্মরণীয় হয়ে আছে।

এর সঙ্গে ২০১৯ সালে উয়েফা নেশনস লিগের শিরোপাও পর্তুগালকে এনে দিয়েছিলেন এই মহাতারকা। দেশের হয়ে এই বড় ট্রফিগুলো জয় করার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়ে দলের সাফল্যই তার কাছে সবসময় সবকিছুর উপরে ছিল।

অবসর ঘোষণা করার সময় রোনালদো অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। নিজের বার্তায় তিনি বলেন, পর্তুগালের পতাকা বুকে জড়িয়ে মাঠে নামার অনুভূতি এবং দেশের কোটি কোটি মানুষের সমর্থন তাকে সবসময় শতভাগ উজাড় করে দিতে উদ্বুদ্ধ করেছে। তিনি পর্তুগাল ফুটবল ফেডারেশন, তার সব সাবেক ও বর্তমান সতীর্থ, কোচ এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ভক্ত-সমর্থকদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তার মতে, দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারা এবং তাদের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারাটাই ছিল তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

রোনালদো বলেছেন, নভেম্বরের আন্তর্জাতিক বিরতির পর পর্তুগালের সাত নম্বর জার্সি ফিরিয়ে দেবেন তিনি। গতকাল ইনস্টাগ্রামে প্রকাশিত এক ভিডিওতে সমর্থকদের উদ্দেশে চিঠি পড়ে নিজের অবসরের খবর জানান পর্তুগিজ এই মহাতারকা। এর মধ্য দিয়ে পর্তুগালের হয়ে রেকর্ড গড়া এক আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি ঘটল।

ভিডিওতে নিজের আইকনিক ৭ নম্বর জার্সির কথা উল্লেখ করে রোনালদো বলেন, ‘জাতীয় দলের ৭ নম্বর জার্সিটি ফিরিয়ে দেওয়ার দিন এসে গেছে। কখনও ভাবিনি, জার্সিটি শুধু আমারই। তবে ২৩ বছর ধরে এটি পরার সৌভাগ্য ও দায়িত্ব দুটিই পেয়েছি।’ আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেও ক্লাব ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেননি আল নাসরের এই ফরোয়ার্ড।

আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা রোনালদো। জাতীয় দলের হয়ে ২৩৪ ম্যাচে ১৪৬ গোল করেছেন পাঁচবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী এই ফুটবলার। আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা ও সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড— দুটিই তার দখলে।

২০০৩ সালে পর্তুগালের হয়ে অভিষেক হয়েছিল রোনালদোর। এরপর দুই দশকের বেশি সময় ধরে জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন তিনি। তার নেতৃত্বে ২০১৬ ইউরো ও ২০১৯ উয়েফা নেশনস লিগ জিতেছে পর্তুগাল।

পাঁচটি বিশ্বকাপ ও ছয়টি ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন রোনালদো। ২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে পর্তুগালের বিদায়ের পরই তার আন্তর্জাতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা বাড়ে। পরে তিনি জানিয়েছিলেন, জাতীয় দল ছাড়ার কথা একসময় ভেবেছিলেন; তবে সিদ্ধান্ত বদলে খেলা চালিয়ে যান।
পর্তুগাল কোচ হোর্হে জেসুসের সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে মতবিরোধের খবরও আলোচনায় আসে। সেপ্টেম্বরে নরওয়ের বিপক্ষে নেশনস লিগের ম্যাচে তাকে বেঞ্চে রাখার ঘটনায় তৈরি হয় প্রকাশ্য অস্বস্তি। তবে অবসরের সিদ্ধান্তের পেছনে এটিই একমাত্র কারণ কি না, তা স্পষ্ট নয়।

রোনালদোর এই অবসর শুধু একজন খেলোয়াড়ের সরে দাঁড়ানো নয়; এটি একটি প্রজন্মের সমাপ্তি। তার নিখুঁত পেশাদারিত্ব, শারীরিক ফিটনেস বজায় রাখার কঠোর শৃঙ্খলা এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে জয় ছিনিয়ে আনার মানসিকতা আগামী প্রজন্মের ফুটবলারদের জন্য আদর্শ পাঠ্যপুস্তক হয়ে থাকবে। সবুজ গালিচায় তার সেই সিউ উদ্‌যাপন আর জাতীয় দলের ৭ নম্বর জার্সিতে তার অবয়ব ভক্তদের হৃদয়ে চিরকাল অম্লান থাকবে। আন্তর্জাতিক আঙিনায় রোনালদো হয়তো আর বল পায়ে নামবেন না, কিন্তু বিশ্ব ফুটবল মানচিত্রে তার নাম ও কীর্তি চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।