Print Date & Time : 08 November 2026 Sunday 04:50 am

সন্তান, তোমার সন্তানও তোমাকে দেখছে!

image

রফিকুল ইসলাম 

মানুষের জীবনে কিছু ঋণ থাকে, যার কোনো হিসাব হয় না; কিছু ভালোবাসা থাকে, যার কোনো প্রতিদান হয় না; কিছু আত্মত্যাগ থাকে, যার মূল্য পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ দিয়েও পরিশোধ করা যায় না। পিতামাতার ভালোবাসা ও সন্তানের জন্য তাঁদের সীমাহীন আত্মত্যাগ তেমনই এক অমূল্য অধ্যায়। 

সন্তানের মুখে একটুখানি হাসি ফোটাতে যাঁরা নিজেদের সুখ বিসর্জন দেন, সন্তানের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে যাঁরা নিজেদের বর্তমানকে নিঃশেষ করেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই মানুষগুলোই কখনো কখনো সন্তানের কাছে হয়ে ওঠেন অনাকাঙ্ক্ষিত বোঝা! যেটি হালে অদ্ভুত এক সংক্রমণ ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে।

যে হাত একদিন সন্তানের আঙুল ধরে হাঁটতে শিখিয়েছিল, বার্ধক্যে সেই হাতই যখন কাঁপতে কাঁপতে একটু আশ্রয় খুঁজে, তখন সেই হাত ধরার মতো সময় হালে সন্তানের থাকছে না। যে কণ্ঠ রাতের পর রাত সন্তানের কান্না থামিয়েছে, অসুখে জেগে থেকেছে, বিপদে সাহস জুগিয়েছে - সেই কণ্ঠ যখন বয়সের ভারে অস্পষ্ট হয়ে আসে, তখন তার কথা শোনার মতো ধৈর্য সন্তানের ফুরিয়ে যায়। যে বুক একদিন সন্তানের নিরাপদ আশ্রয় ছিল, জীবনের শেষ বেলায় সেই বুকই সন্তানের কাছে পর হয়ে যাচ্ছে।

আজ আমাদের সমাজে এমন কিছু নির্মম বাস্তবতা ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। পিতামাতার দেখভাল ও ভরণ-পোষণ না করা, তাঁদের প্রতি অবহেলা, অপমান, অসম্মান এবং মানসিক নিপীড়ন যেন এক নীরব সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিচ্ছে। গণমাধ্যমে প্রায়ই ওঠে আসছে বৃদ্ধ পিতামাতার অসহায়ত্ব, সন্তানদের অবহেলা, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ এবং শেষ বয়সে আশ্রয়হীন হয়ে পড়ার মর্মান্তিক সংবাদ। 

এক্ষেত্রে প্রশ্ন জাগে - যে সমাজে পিতামাতার চোখের জল সন্তানের হৃদয় স্পর্শ করে না, সেই সমাজের মানবিক ভিত্তি কতটা অটুট?

# ভালোবাসার যে ঋণ কোনো দিন শোধ হয় না

একটি শিশুর জন্মের পর থেকে তার বেড়ে ওঠার প্রতিটি ধাপে পিতামাতার জীবন জড়িয়ে থাকে। সন্তানের ক্ষুধায় তাঁরা নিজের ক্ষুধা ভুলে যান, সন্তানের অসুখে নিজের ঘুম বিসর্জন দেন, সন্তানের শিক্ষার জন্য নিজেদের স্বপ্ন ও স্বাচ্ছন্দ্যকে তুচ্ছ করেন। কখনো নিজের প্রয়োজনীয় পোশাক কেনা হয় না, অথচ সন্তানের জন্য নতুন পোশাকের অভাব রাখা হয় না। কখনো নিজের চিকিৎসা পিছিয়ে যায়, অথচ সন্তানের সামান্য অসুস্থতাতেই ছুটে যান চিকিৎসকের কাছে।

এই আত্মত্যাগের কোনো দলিল থাকে না, কোনো প্রতিদানের দাবি থাকে না - থাকে শুধু সন্তানের ভালো থাকার এক নিঃশব্দ প্রার্থনা। সন্তানের সাফল্যে তাঁরা নিজের জীবনের সার্থকতা খুঁজে পান; সন্তানের আনন্দে তাঁদের পৃথিবী পূর্ণ হয়। অথচ সেই সন্তানই যখন প্রতিষ্ঠিত হয়ে নিজের সংসার, স্বাচ্ছন্দ্য ও ব্যস্ততার মধ্যে ডুবে গিয়ে পিতামাতার প্রয়োজন ভুলে যায়, তখন তা কেবল পারিবারিক অবহেলা নয় - এ এক গভীর নৈতিক বিপর্যয়।

পিতামাতার দায়িত্ব শুধু তাঁদের মুখে অন্ন তুলে দেওয়া নয়। তাঁদের প্রয়োজন চিকিৎসা, নিরাপদ বাসস্থান, পরিধেয় বস্ত্র, মানসিক প্রশান্তি, সঙ্গ, সম্মান এবং ভালোবাসা। কখনো কখনো একটি ফোনকল, একটু সময়, পাশে বসে দুটো কথা বলা কিংবা অসুস্থ শরীরে একটু হাত বুলিয়ে দেওয়াই তাঁদের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। অর্থ দিয়ে সব প্রয়োজন মেটানো যায় না; কিন্তু আন্তরিকতা দিয়ে অনেক শূন্যতা পূরণ করা যায়।

# পরিসংখ্যানের আড়ালে প্রবীণ জীবনের দীর্ঘশ্বাস

বাংলাদেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৬০ বছর বা তদূর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৫৩ লাখ ২৮ হাজার, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ। ২০১১ সালের জনশুমারিতে এই হার ছিল ৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ। জনমিতিক বিভিন্ন প্রক্ষেপণে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ২০ লাখে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

সংখ্যার এই ঊর্ধ্বগতি কেবল জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত নয়; এটি আমাদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সামনে এক বড় দায়িত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। প্রবীণ মানুষের জন্য পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা, আর্থিক সুরক্ষা ও মানবিক পরিচর্যার ব্যবস্থা না থাকলে তাঁদের জীবনের শেষ অধ্যায় আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংখ্যাবিজ্ঞান বিভাগের উদ্যোগে এবং ইউএনএফপি-এর সহায়তায় ২০১৫ সালে পরিচালিত এক জরিপে সাত বিভাগের ৬ হাজারের বেশি প্রবীণ মানুষের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করা হয়। ওই জরিপে ৬১ দশমিক ২ শতাংশ প্রবীণের মধ্যে বিষণ্নতার লক্ষণ পাওয়া যায় এবং প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পারিবারিক সদস্যদের দ্বারা কোনো না কোনো ধরনের নির্যাতন বা নিপীড়নের অভিজ্ঞতার কথা জানান। 

জরিপটি পুরোনো; তাই এর ফলকে বর্তমান সময়ের জাতীয় চিত্র হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে প্রবীণদের মানসিক কষ্ট ও পারিবারিক অবহেলার গভীরতা বোঝার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত।

প্রবীণ বয়সে মানুষ শুধু অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় ভোগেন না; অনেকেই ভোগেন নিঃসঙ্গতা, অসহায়ত্ব, অবহেলা ও আত্মমর্যাদাহানির যন্ত্রণায়। তাঁদের কাছে সবচেয়ে বড় কষ্ট হয়তো অভাব নয়, বরং আপনজনের অবহেলা। একই ঘরে থেকেও কেউ কেউ পরিবারের কাছে অদৃশ্য হয়ে থাকেন। তাঁদের কথা শোনার মানুষ নেই, অনুভূতির মূল্য নেই, সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। অথচ বার্ধক্য কোনো অপরাধ নয়; এটি জীবনের অনিবার্য পরিণতি।

# বৃদ্ধাশ্রমের দেয়ালের ওপারে যে প্রশ্ন

বৃদ্ধাশ্রম নিজেই কোনো অমানবিক প্রতিষ্ঠান নয়। কোনো প্রবীণ ব্যক্তি যদি নিজের ইচ্ছায়, নিরাপত্তা, চিকিৎসা ও উপযুক্ত পরিচর্যার প্রয়োজনে সেখানে থাকতে চান, তবে সেটি তাঁর অধিকার ও সিদ্ধান্তের বিষয়। কিন্তু পিতামাতাকে অনিচ্ছায় বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে, তাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে কিংবা দায়িত্ব শেষ হয়েছে মনে করে নিশ্চিন্ত হয়ে যাওয়াই নির্মমতার পরিচয়।

একটি বৃদ্ধাশ্রমের ঘরে হয়তো বিছানা আছে, খাবার আছে, চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে; কিন্তু সেখানে কি সন্তানের শৈশবের সেই পরিচিত ডাক আছে? আছে কি মায়ের আঁচলের ঘ্রাণ, বাবার স্নেহমাখা শাসন, পরিবারের আপন মানুষের সঙ্গে নির্ভার কথোপকথন? 

সব প্রবীণের অভিজ্ঞতা এক নয়; তবু অনেকের কাছে সবচেয়ে বড় শূন্যতা হলো আপনজনের সান্নিধ্য হারানো। যে মা সন্তানের জ্বরের রাতে কপালে হাত রেখে সারারাত জেগেছেন, সেই মা আজ অসুস্থ হলে তাঁর শিয়রে বসার সময় সন্তানের থাকছে না। যে বাবা নিজের কষ্ট গোপন করে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়েছেন, সেই বাবার শেষ বয়সে একটু সঙ্গ দেওয়াও কি এতই কঠিন? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সন্তানদের নয়, আমাদের সামগ্রিক সামাজিক বিবেকের কাছেও দাবি রাখে।

# ধর্মের আয়নায় পিতামাতার প্রতি শাশ্বত দায়িত্ব

পিতামাতার প্রতি শ্রদ্ধা, সেবা ও দায়িত্ববোধ কোনো একটি ধর্মের একক শিক্ষা নয়; এটি মানবসভ্যতার চিরন্তন নৈতিক আদর্শ।

ইসলামে আল্লাহর ইবাদতের নির্দেশের পরপরই পিতামাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনের সূরা বনি ইসরাইলের ২৩-২৪ আয়াতে তাঁদের প্রতি ‘উফ’ শব্দটুকুও উচ্চারণ না করতে, ধমক না দিতে এবং সম্মানজনক কথা বলতে বলা হয়েছে। সূরা লুকমানের ১৪ আয়াতে মায়ের কষ্টের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে পিতামাতার প্রতি কৃতজ্ঞতার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

হিন্দুধর্মে তৈত্তিরীয় উপনিষদের বিখ্যাত বাণী - ‘মাতৃদেবো ভব, পিতৃদেবো ভব’; অর্থাৎ মাকে দেবতুল্য এবং বাবাকে দেবতুল্য জ্ঞান করো। সন্তানের নৈতিক জীবনে পিতামাতার মর্যাদা যে কত উঁচু, এই বাণী তারই প্রকাশ।

বৌদ্ধধর্মের সিগালোভাদ সূত্রে পিতামাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্বের মধ্যে তাঁদের ভরণ-পোষণ, কর্তব্য পালন, পারিবারিক ঐতিহ্য রক্ষা এবং মৃত্যুর পর তাঁদের স্মরণ ও সম্মান করার শিক্ষা রয়েছে। 

খ্রিষ্টধর্মেও পিতামাতাকে সম্মান করার নির্দেশ দশ আজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত; নতুন নিয়মের ইফিষীয় ৬:২ আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমার পিতা ও মাতাকে সম্মান করো।’

ধর্মীয় ভাষা ও ব্যাখ্যায় পার্থক্য থাকলেও সব শিক্ষার অন্তর্নিহিত আহ্বান এক - পিতামাতাকে অবহেলা নয়, সম্মান করো; তাঁদের প্রতি দায়িত্ব পালন করো; তাঁদের বার্ধক্যকে ভালোবাসা ও মর্যাদায় ঘিরে রাখো। যে সন্তান ধর্মীয় আচার পালন করে অথচ পিতামাতার চোখের জল দেখে নির্বিকার থাকে, তার ধর্মচর্চার নৈতিক পূর্ণতা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়।

# আইন আছে, প্রয়োগের নিশ্চয়তা কোথায়?

পিতামাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে ২০১৩ সালে ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন’ প্রণীত হয়েছে। আইনটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও মানবিক সুরক্ষা। কিন্তু আইনের অস্তিত্বই যথেষ্ট নয়; তার কার্যকর প্রয়োগ, সহজ বিচারপ্রাপ্তি এবং প্রবীণবান্ধব বাস্তবায়নও জরুরি।

আইনের ২ ধারায় ‘ভরণ-পোষণ’-এর মধ্যে খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, বাসস্থান ও সঙ্গ দেওয়ার বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ৩ ধারায় সন্তানদের ওপর পিতামাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একাধিক সন্তান থাকলে আলোচনার মাধ্যমে যৌথভাবে দায়িত্ব পালনের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে পিতামাতাকে তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বৃদ্ধাশ্রমে বা অন্য কোথাও থাকতে বাধ্য করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। 

এছাড়া তাঁদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজ নেওয়া, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরিচর্যা দেওয়া এবং পৃথকভাবে বসবাস করলে নিয়মিত দেখা করার বিধানও রয়েছে। পৃথক বসবাসের ক্ষেত্রে প্রত্যেক সন্তানকে তার আয় থেকে যুক্তিসংগত পরিমাণ অর্থ নিয়মিত দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

আইনের ৪ ধারায় বাবা বা মায়ের অবর্তমানে যথাক্রমে পিতামহ-পিতামহী এবং মাতামহ-মাতামহীর ভরণ-পোষণের দায়িত্বের কথাও বলা হয়েছে। ৫ ধারায় আইনের বিধান লঙ্ঘনের জন্য সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং অর্থদণ্ড অনাদায়ে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। আইনের ৭ ধারার ২ উপধারা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট পিতা বা মাতার লিখিত অভিযোগ ছাড়া আদালত এ অপরাধের বিচার গ্রহণ করতে পারে না।

এখানেই বাস্তবতার একটি বড় সংকট রয়েছে। যিনি অসুস্থ, শারীরিকভাবে অক্ষম, সন্তানের ওপর নির্ভরশীল কিংবা প্রতিশোধের ভয়ে আতঙ্কিত, তাঁর পক্ষে সন্তানের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করা সব সময় সহজ নয়। অনেক প্রবীণ সামাজিক মর্যাদা, পারিবারিক সম্পর্ক কিংবা সন্তানকে শাস্তি দেওয়ার অনিচ্ছায় নীরবে নির্যাতন ও অবহেলা সহ্য করেন। ফলে আইনের সুরক্ষা থাকা সত্ত্বেও অনেকেই তা গ্রহণ করতে পারেন না।

# পিতামাতার ভরণপোষণ আইন সংশোধন: সময়ের দাবি

সময়ের বাস্তবতায় আইনটির কয়েকটি বিষয়ে সংশোধন জরুরি —
১. শাস্তি কঠোর করা: জরিমানার পরিমাণ বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বাড়ানো এবং পুনরাবৃত্ত অপরাধে কঠোরতর শাস্তির বিধান করা।

২. অভিযোগের পথ সহজ করা: অসুস্থতা, অক্ষমতা বা ভয়ের কারণে পিতামাতা নিজে অভিযোগ করতে না পারলে তাঁদের সম্মতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে অনুমোদিত প্রতিনিধি বা উপযুক্ত সরকারি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে অভিযোগের সুযোগ রাখা।

৩. দ্রুত সুরক্ষা নিশ্চিত করা: জরুরি চিকিৎসা, ভরণপোষণ ও নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য দ্রুত অন্তর্বর্তী আদেশ, বিনা মূল্যে আইনি সহায়তা এবং নির্দিষ্ট সময়সীমায় বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করা।

৪. সন্তানদের দায় নির্ধারণ: একাধিক সন্তানের আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী দায়িত্ব বণ্টন ও তা বাস্তবায়নের কার্যকর ব্যবস্থা করা।

৫. অসহায় প্রবীণের রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা: সন্তানহীন, নিঃস্ব ও দায়িত্বহীন সন্তানের অবহেলার শিকার প্রবীণদের জন্য কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তা ও পরিচর্যা নিশ্চিত করা।

আইনের উদ্দেশ্য কেবল শাস্তি দেওয়া নয়; প্রবীণের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। তাই কঠোর বিধানের পাশাপাশি সহজ প্রয়োগ ও মানবিক সুরক্ষাই হওয়া উচিত সংশোধনের মূল লক্ষ্য।

# অবহেলার উত্তরাধিকার থামাতে হবে

একটি বিষয় আমাদের প্রত্যেকের গভীরভাবে উপলব্ধি করা প্রয়োজন - সন্তান শুধু আমাদের কথা শোনে না, আমাদের আচরণও দেখে। আমরা নিজেদের পিতামাতার সঙ্গে কেমন ব্যবহার করছি, তাঁদের কতটা সম্মান দিচ্ছি, তাঁদের অসুস্থতায় কতটা পাশে দাঁড়াচ্ছি - আমাদের সন্তান নীরবে সবই শিখছে। আজ আমরা যদি নিজেদের পিতামাতাকে অবহেলা করি, আগামীকাল আমাদের সন্তানও সেই অবহেলাকে স্বাভাবিক আচরণ বলে মনে করতে পারে।

সন্তানের সামনে আমরা যে পারিবারিক সংস্কৃতি নির্মাণ করছি, সেটিই একদিন আমাদের বার্ধক্যের বাস্তবতা হয়ে ফিরে আসতে পারে। তাই পিতামাতার প্রতি দায়িত্ব পালন কেবল তাঁদের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ নয়; এটি পরবর্তী প্রজন্মের কাছে মানবিকতার শিক্ষা এবং নিজের ভবিষ্যতের জন্যও এক নৈতিক বিনিয়োগ।

রাষ্ট্রের আইন, সামাজিক আন্দোলন, ধর্মীয় শিক্ষা কিংবা গণমাধ্যমের প্রচার - কোনোটিই একা এই সংকটের সমাধান করতে পারবে না, যদি পরিবারে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধের চর্চা না থাকে। সন্তানদের পাশাপাশি পরিবারের অন্য সদস্য, সমাজের নেতৃত্ব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রকেও প্রবীণদের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। পিতামাতার সেবা যেন করুণা বা অনুগ্রহের বিষয় না হয়ে দায়িত্ব ও ভালোবাসার স্বাভাবিক প্রকাশ হয়ে ওঠে।

# সময়ের আয়নায় আমাদেরই আগামীকাল

আজ যাঁরা বৃদ্ধ, একদিন তাঁরা ছিলেন আমাদের মতোই কর্মচঞ্চল, স্বপ্নময়, সম্ভাবনায় ভরা মানুষ। তাঁরাও একদিন সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখেছেন, সংসারের জন্য ঘাম ঝরিয়েছেন, জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় উৎসর্গ করেছেন। বয়স তাঁদের শরীরকে দুর্বল করেছে, কিন্তু তাঁদের অনুভূতি, ভালোবাসা কিংবা সম্মানের প্রয়োজনকে মুছে দেয়নি। আমরা ভুলে যাই, বার্ধক্য কোনো দূরের ঘটনা নয়; এটি আমাদের সবার জন্য অপেক্ষমাণ এক অনিবার্য গন্তব্য। 

আজ যে সন্তান পিতামাতার কাঁপা হাতে বিরক্ত হয়, একদিন তার নিজের হাতও কাঁপবে। আজ যে সন্তান পিতামাতার দীর্ঘশ্বাস শুনতে পায় না, একদিন হয়তো তার নিজের নীরব দীর্ঘশ্বাসও কেউ শুনবে না। সময়ের চাকা ঘুরে যায়; জীবনের আয়নায় মানুষ একদিন নিজেরই আচরণের প্রতিচ্ছবি দেখতে পায়।

তাই এখনই থামতে হবে। পিতামাতার প্রতি অবহেলা, অসম্মান ও দায়িত্বহীনতার যে সংস্কৃতি নীরবে বিস্তার লাভ করছে, তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে পরিবার থেকে, সমাজ থেকে, রাষ্ট্র থেকে। সন্তানদের বোঝাতে হবে - পিতামাতার সেবা কোনো বোঝা নয়, এটি জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৌভাগ্য। তাঁদের পাশে থাকা কোনো দয়া নয়, এটি আমাদের মানবিক পরিচয়ের মৌলিক শর্ত।

# শেষ হয়েও যার শেষ নেই

হয়তো কোনো এক সন্ধ্যায় বৃদ্ধ বাবা জানালার পাশে বসে থাকবেন। দূরের পথের দিকে তাকিয়ে ভাববেন, আজও কি সন্তান আসবে? হয়তো অসুস্থ মা দরজার শব্দ শুনে চমকে উঠবেন - এই বুঝি তাঁর সন্তান ফিরে এল! তারপর রাত গভীর হবে, অপেক্ষা দীর্ঘ হবে, দরজার ওপাশে কোনো পরিচিত পায়ের শব্দ শোনা যাবে না। তাঁদের চোখের কোণে জমে থাকা জল হয়তো কেউ দেখবে না; কিন্তু সেই নীরব অশ্রু একদিন আমাদের বিবেকের দরজায় কড়া নাড়বেই।

সন্তান, মনে রেখো - তোমার শৈশবের অসহায়ত্বে যাঁরা তোমাকে বুকে আগলে রেখেছিলেন, তাঁদের বার্ধক্যের অসহায়ত্বে তুমি যদি হাত বাড়িয়ে না দাও, তবে তোমার অর্জন, প্রাচুর্য কিংবা সামাজিক প্রতিষ্ঠা কোনো কিছুই তোমাকে প্রকৃত অর্থে বড় মানুষ করে তুলবে না।

পিতামাতার ভালোবাসার ঋণ অর্থ দিয়ে শোধ করা যায় না; তাঁদের আত্মত্যাগের প্রতিদান কোনো সম্পদে মাপা যায় না। শুধু ভালোবাসা, সম্মান, সেবা ও দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েই সেই ঋণের প্রতি সামান্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা যায়।

আর একটি কথা কখনো ভুলে যেয়ো না - তোমার সন্তান তোমাকে দেখছে। তুমি আজ তোমার পিতামাতার সঙ্গে যে আচরণ করছ, তা শুধু তাঁদের জীবনের শেষ অধ্যায় লিখছে না; তোমার সন্তানের মনেও লিখে দিচ্ছে ভবিষ্যতের এক অদৃশ্য পাঠ।

আজ তুমি যে বীজ বুনছ, আগামীকাল তারই ফল তোমাকে গ্রহণ করতে হতে পারে। তাই পিতামাতার চোখের জলকে অবহেলা কোরো না। তাঁদের জীবনের শেষ বিকেলটুকু যেন অপেক্ষা, অপমান আর নিঃসঙ্গতায় না কাটে। তাঁদের পাশে দাঁড়াও - কারণ তাঁদের হাত ধরেই তোমার পৃথিবীতে আসা, তাঁদের ভালোবাসাতেই তোমার জীবন গড়ে ওঠা।

একটি মানবিক সমাজের পরিচয় শুধু তার অট্টালিকা, সম্পদ কিংবা উন্নয়নের পরিসংখ্যানে নয়; পরিচয় মেলে সে সমাজ তার প্রবীণ মানুষদের কতটা সম্মান, নিরাপত্তা ও ভালোবাসা দিতে পারে, তার মধ্য দিয়ে।

পিতামাতাকে অবহেলা করে কোনো সমাজের ভবিষ্যৎ সুন্দর হতে পারে না। কারণ যে সমাজ তার শিকড়কে অস্বীকার করে, সে সমাজ একদিন নিজের অস্তিত্বের ভিত্তিই হারিয়ে ফেলে।

পিতামাতাকে পরিত্যাগ করা মানে কেবল দুটি মানুষকে কষ্ট দেওয়া নয়; নিজের অস্তিত্বের শিকড়কেই অস্বীকার করা। তাঁদের চোখের জল যেন আমাদের বিবেকের শেষ প্রদীপটুকুও না নিভিয়ে দেয়। কারণ, যে সমাজ তার শিকড়কে অস্বীকার করে, তার ভবিষ্যৎ একদিন শিকড়হীন হয়ে পড়ে।

পিতামাতার ভালোবাসার কাছে সন্তানের যে ঋণ, তার কোনো শেষ পৃষ্ঠা নেই।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়, ঢাকা