বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা: বাংলাদেশের বিদেশি ঋণ কয়েক বছর ধরে দ্রুত বাড়ছে। সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা সভরেন গ্যারান্টিযুক্ত বিদেশি ঋণ নিয়েছে যা সরকারের প্রচ্ছন্ন দায় বাড়াচ্ছে। কোনো কারণে এসব সংস্থা ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে রাষ্ট্রকে সে দায় বহন করতে হবে। এছাড়া বেসরকারি খাতেও বিদেশি ঋণ গ্রহণ অনেকটা বেড়েছে। সব মিলিয়ে গত এক দশকে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ প্রায় তিনগুণ হয়েছে। এতে বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে।
এক দশকের ব্যবধানে দেশের দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি ঋণ শোধের পরিমাণ ২৭৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। আর এ ঋণের সুদ পরিশোধ বেড়েছে ৬৫৮ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের সম্প্রতি প্রকাশিত ‘ইন্টারন্যাশনাল ডেট স্ট্যাটিসটিক্স ২০২৬’ শীর্ষক প্রকাশনা বিশ্লেষণে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের বিদেশি ঋণ ও তা পরিশোধের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০১৫ সাল শেষে বাংলাদেশের বিদেশি ঋণ ছিল ৩৮ দশমিক ৭৭১ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সাল শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৩ দশমিক ৪৩৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ১০ বছরের ব্যবধানে দেশে বিদেশি ঋণ বেড়েছে ৭৪ দশমিক ৬৬৭ বিলিয়ন ডলার বা ১৯২ দশমিক ৫৯ শতাংশ। এক দশকের চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২০ ও ২০২১ সালে দেশে বিদেশি ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে সবচেয়ে বেশি। ২০১৯ সাল শেষে দেশে বিদেশি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬২ দশমিক ৪৭৫ বিলিয়ন ডলার। ২০২০ সাল শেষে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৭৩ দশমিক ৫৫৯ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ওই বছর বিদেশি ঋণ বেড়েছে ১১ দশমিক ০৮৪ বিলিয়ন ডলার বা ১৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
পরের বছর বিদেশি ঋণ আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৯১ দশমিক ৪৮৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ২০২১ সালে দেশে বিদেশি ঋণ বৃদ্ধি পায় ১৭ দশমিক ৯২৭ বিলিয়ন ডলার বা ২৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ। ওই ২ বছর দীর্ঘমেয়াদি ঋণ বৃদ্ধির পরিমাণই ছিল বেশি। তবে ২০২১ সালে স্বল্পমেয়াদি ঋণও দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বৃদ্ধি পায়। এছাড়া ২০১৭ সালে বিদেশি ঋণ বৃদ্ধি প্রায় সাড়ে ৯ বিলিয়ন ও ২০২৫ সালে ৮ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলার। এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে কম বিদেশি ঋণ বেড়েছে ২০১৬ সালে যার পরিমাণ ছিল ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার।
১০ বছরে দেশে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ বেড়েছে ৬৭ দশমিক ২৪৭ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ২০৯ শতাংশ। ২০১৫ সাল শেষে এ ঋণের পরিমাণ ছিল ৩২ দশমিক ১৩৩ বিলিয়ন ডলার যা ২০২৫ সাল শেষে বেড়ে হয়েছে ৯৯ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার। এসব ঋণের বড় অংশই রাষ্ট্রীয়ভাবে নেওয়া হয়েছে। তবে বেসরকারি খাতেও কিছু দীর্ঘমেয়াদি ঋণ রয়েছে। এক দশকের মধ্যে ২০২১ সালে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সবচেয়ে বেশি ১০ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন বৃদ্ধি পায়। আর ২০২০ সালে বৃদ্ধি পায় ৯ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলার।
এদিকে এক দশকে দেশে স্বল্পমেয়াদি ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে ৭ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১১২ শতাংশ। ২০১৫ সাল শেষে এ ঋণের পরিমাণ ছিল ৬ দশমিক ৬৩৮ বিলিয়ন ডলার যা ২০২৫ সাল শেষে বেড়ে হয়েছে ১৪ দশমিক ০৫৮ বিলিয়ন ডলার। এসব ঋণের প্রায় পুরোটাই বেসরকারি খাতে নেওয়া হয়েছে। তবে জ্বালানি তেল কেনার জন্য সরকারি খাতে সামান্য কিছু স্বল্পমেয়াদি ঋণ নেওয়া হয়। এক দশকের মধ্যে ২০২১ সালে রেকর্ড পরিমাণ স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণ নেওয়া হয় যার পরিমাণ ৭ দশমিক ১০২ বিলিয়ন।
মূলত করোনার সময়কালে বিদেশি ঋণের সুদহার অনেক কমে যায়। এজন্য ওই বছর অস্বাভাবিক হারে বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণ নেওয়া হয়। এতে ২০২১ সাল শেষে স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণ ১০ দশমিক ৯৮৭ বিলিয়ন থেকে বেড়ে ১৮ দশমিক ০৮৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। বৃদ্ধির হার ছিল ৬৪ দশমিক ৬৪ শতাংশ। যদিও পরের বছরগুলোয় আন্তর্জাতিক সুদহার বিশেষ করে সোফর (সিকিউরড ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেট) অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পায়। এতে বেসরকারি উদ্যোক্তারা দ্রুত বিদেশি ঋণ শোধ করতে থাকে। ফলে বিদেশি ঋণ কমতে শুরু করে।
২০২২ সালে স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণ সামান্য বাড়লেও পরের বছর তা রেকর্ড ৪ দশমিক ২৯৯ বিলিয়ন ডলার হ্রাস পায়। ২০২৪ সালে তা আরও ১ দশমিক ২৮৬ বিলিয়ন ডলার হ্রাস পায়। ওই বছর শেষে স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণ কমে দাঁড়ায় ১২ দশমিক ৯৪৫ বিলিয়ন ডলার। যদিও ২০২৫ সালে স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণ নেওয়া কিছুটা বাড়ে। সুদহার কিছুটা কমায় ওই বছর এ ঋণ ১ দশমিক ১১৩ বিলিয়ন ডলার বেড়ে ১৪ বিলিয়ন ছাড়ায়।
অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের মধ্যে ১০ বছরে আইএমএফ (আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল) থেকে নেওয়া ঋণ ও এসডিআর (স্পেশাল ড্রয়িং রাইটস) বেড়ে প্রায় পৌনে চারগুণ হয়েছে। ২০২৫ সাল শেষে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ছয় দশমিক ০৫২ বিলিয়ন ডলার, ২০১৫ সাল শেষে যা ছিল এক দশমিক ৬১৩ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া ২০২৫ সাল শেষে সরকারি ও সভরেন গ্যারান্টিযুক্ত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৩ দশমিক ৪৫৭ বিলিয়ন ডলার, ২০১৫ সালে যা ছিল ২৭ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার।
সরকারের দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি ঋণের ২৫ দশমিক ২৭ শতাংশ বিশ্বব্যাংক থেকে নেওয়া হয়েছে, প্রায় ২০ শতাংশ এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং ১৪ দশমিক ২১ শতাংশ জাপান সরকারের থেকে নেওয়া হয়েছে। এর বাইরে সরকারের ঋণের ১০ শতাংশ রাশিয়া থেকে নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে সরকারের ঋণের গড় পরিশোধকাল দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫ বছর যার মধ্যে গ্রেস পিরিয়ড ছয় বছর। আর সরকারি ঋণের ভারিত গড় সুদহার বেড়ে তিন শতাংশে পৌঁছেছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০১৫ সালে দেশের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ছিল মাত্র ১ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৮৮৫ বিলিয়ন ডলার যা ২০১৫ সালের তুলনায় প্রায় তিনগুণ। যদিও ২০২২ সালে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ছিল সবচেয়ে বেশি ৫ দশমিক ১৪১ বিলিয়ন ডলার। এর অন্যতম কারণ ছিল বেসরকারি খাতে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ রেকর্ড বৃদ্ধি। ওই বছর সরকারি ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ছিল ২ দশমিক ৫৮৩ বিলিয়ন ডলার ও বেসরকারি খাতের ঋণ শোধের পরিমাণ ছিল ২ দশমিক ৫৫৮ বিলিয়ন ডলার।
পরের বছরগুলোয় সরকারের ঋণ শোধ বাড়লেও বেসরকারি খাতে কমেছে। এসে সার্বিকভাবে ঋণ শোধের পরিমাণ কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। ২০২৫ সালে সরকারি ঋণ শোধের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৬৩৫ বিলিয়ন ডলার ও বেসরকারি খাতের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ শোধের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ দশমিক ৮২৮ বিলিয়ন ডলার। আর গত বছর সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধ ছিল ১ দশমিক ৯৯৪ বিলিয়ন ডলার ও বেসকারি দীর্ঘমেয়াদি ঋণের সুদ পরিশোধ ছিল ৫১৫ মিলিয়ন ডলার। সার্বিকভাবে গত বছর বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধ করা হয় ২ দশমিক ৫০৯ বিলিয়ন ডলার। ২০১৫ সালে এর পরিমাণ ছিল মাত্র ৩৩১ মিলিয়ন ডলার।
প্রসঙ্গত, ২০২৫ সাল শেষে মোট জাতীয় আয়ের ২৪ শতাংশ দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের বিদেশি ঋণ যা ২০১৫ সালে ছিল ১৮ দশমিক ১ শতাংশ। আর গত বছর বিদেশি ঋণ পরিশোধ (ডেট সার্ভিসিং) দাঁড়িয়েছে জাতীয় আয়ের ২ শতাংশ।