Print Date & Time : 08 November 2026 Sunday 08:39 pm

যে কেলেঙ্কারি কাঁপিয়ে দিয়েছিল বিশ্ব অর্থনীতি (ভিডিও)

image

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: একটি কোম্পানির হিসাবের খাতায় কোটি কোটি ডলারের মুনাফা, শেয়ারবাজারে দাপট, আর বিনিয়োগকারীদের চোখে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। অথচ পর্দার আড়ালে জমছিল ঋণ, লোকসান আর জালিয়াতি। এই কোম্পানির নাম এনরন। ২০০১ সালের ৮ নভেম্বর তাদের হিসাবের এমন তথ্য সামনে আসে, যা যুক্তরাষ্ট্রের করপোরেট জগৎকে নাড়িয়ে দেয়।

টেক্সাসের হিউস্টনভিত্তিক এনরন একসময় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় কোম্পানিগুলোর একটি ছিল। ২০০০ সালের আয়ের হিসাবে ফরচুন ফাইভ হানড্রেড তালিকার সপ্তম স্থানে ছিল প্রতিষ্ঠানটি। জ্বালানি ব্যবসা থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ বাণিজ্য, ইন্টারনেট ও নানা খাতে দ্রুত বিস্তার ঘটিয়েছিল তারা। বাইরে থেকে এনরনকে মনে হতো উদ্ভাবনী, লাভজনক এবং ভবিষ্যতের ব্যবসায়িক মডেল।

 

কিন্তু এই সাফল্যের ছবির পেছনে ছিল জটিল হিসাবের কারসাজি। এনরন বহু বিশেষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রতিষ্ঠান বা স্পেশাল পারপাস এন্টিটি তৈরি করে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিজেদের কিছু ঋণ ও লোকসান মূল হিসাবের খাতার বাইরে রাখা হতো। ফলে কোম্পানির আর্থিক অবস্থা বাস্তবের চেয়ে অনেক ভালো দেখাত। কিছু ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে হতে পারে এমন আয়ও আগেভাগে মুনাফা হিসেবে দেখানো হতো। এই পদ্ধতির নাম মার্ক-টু-মার্কেট হিসাব, যা সঠিকভাবে প্রয়োগ না হলে প্রকৃত আয় সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর ছবি তৈরি করতে পারে।

এনরনের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা অ্যান্ড্রু ফাস্টো এসব অংশীদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। অভিযোগ ওঠে, কোম্পানির ভেতরের লোকজনের স্বার্থ জড়িত থাকা সত্ত্বেও সেগুলোকে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখানো হয়েছিল। এতে ঋণ আড়াল করা এবং মুনাফা ফুলিয়ে দেখানো সহজ হয়।

২০০১ সালের অক্টোবরে এনরন বড় লোকসানের কথা জানায়। এরপর ৮ নভেম্বর কোম্পানি জানায়, ১৯৯৭ সাল থেকে প্রকাশিত আর্থিক বিবরণী সংশোধন করতে হবে। সংশোধনের ফলে সাড়ে চার বছরে আগে দেখানো নিট আয় ৫৬৯ মিলিয়ন ডলার কমে যায়। বিনিয়োগকারীদের বলা হয়, আগের হিসাবের ওপর আর নির্ভর করা যাবে না। কোম্পানির শেয়ারের দাম দ্রুত পড়ে যায়।

এদিকে নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান আর্থার অ্যান্ডারসেনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। পরে তদন্তে এনরন-সংক্রান্ত নথি ধ্বংসের বিষয় সামনে আসে। ২ ডিসেম্বর ২০০১ এনরন দেউলিয়া সুরক্ষার আবেদন করে। কর্মী, বিনিয়োগকারী ও পেনশনভোগীরা বিপুল ক্ষতির মুখে পড়েন।

এনরন কেলেঙ্কারি দেখিয়ে দেয়, জটিল হিসাব, দুর্বল তদারকি এবং স্বার্থের সংঘাত মিললে বড় প্রতিষ্ঠানও ভেতর থেকে ভেঙে পড়তে পারে। এর পর যুক্তরাষ্ট্রে করপোরেট হিসাব ও নিরীক্ষা ব্যবস্থায় কঠোর সংস্কারের পথ তৈরি হয়।

তবে মনে রাখতে হবে, ৫৬৯ মিলিয়ন ডলার ছিল আগের সাড়ে চার বছরের ঘোষিত নিট আয়ের সংশোধন, পুরো মুনাফা শূন্য হয়ে যাওয়া নয়। এই ঘটনার পর ২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে সারবেনস-অক্সলি আইন পাস হয়, যাতে কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন, ব্যবস্থাপনার দায় এবং নিরীক্ষার ওপর নজরদারি জোরদার করা হয়। বিশ্বজুড়ে আজও সতর্কবার্তা হিসেবে।

কাগজে হাজার কোটি ডলারের মুনাফা, অথচ বাস্তবে ঋণ আর লোকসানের পাহাড়! যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় কোম্পানি এনরন বছরের পর বছর হিসাবের কারসাজি করে নিজেদের আর্থিক অবস্থা ভালো দেখিয়েছিল। ২০০১ সালের ৮ নভেম্বর প্রতিষ্ঠানটি জানায়, আগের কয়েক বছরের হিসাব সংশোধন করতে হবে। কমে যায় ঘোষিত মুনাফা ৫৬৯ মিলিয়ন ডলার। এরপর মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দেউলিয়া হয়ে যায় এনরন। হাজারো কর্মী ও বিনিয়োগকারী হারান তাদের সঞ্চয়। আর এই কেলেঙ্কারি বদলে দেয় যুক্তরাষ্ট্রের করপোরেট হিসাব ও নিরীক্ষা ব্যবস্থার নিয়ম!  

—জা. অর্থনীতি/এলএটি