|| আমজাদ হোসাইন চৌধুরী ||
চট্টগ্রাম ভিত্তিক শিল্পগ্রুপ রাইজিং গ্রপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এ গ্রুপের একাধিক জাহাজ ভাঙার প্রতিষ্ঠান, ইস্পাত কারখানা, অক্সিজেন, জুতা উৎপাদনের কারখানা, লবণ, পানি, হিমাগার, রি-ফাইনারি, ফিলিং স্টেশনসহ বহুমাত্রিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে। পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সাম্প্রতিক সময়ে জাহাজ ভাঙা ব্যবসার বর্তমান পরিস্থিতি, চলমান সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে উনার কার্যালয়ে কথা বলেন জাতীয় অর্থনীতি’র বিশেষ প্রতিনিধি সাইফুল আলম। যা পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো
জাতীয় অর্থনীতি: গত ১৬ বছর আপনার ব্যবসা ও বাণিজ্য কেমন গিয়েছিল?
আমজাদ চৌধুরী: গত ১৫ থেকে ১৬ বছর তো ব্যবসা তো দূরের কথা। প্রায় সময় পালিয়ে থাকতে হবে। আবার জেলেও থাকতে হয়েছে। একে পর এক মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়েছিল। ফলে ব্যবসা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছিল। এতে আমাদের ব্যবসা অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। আমাদের মতো ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের জন্য সরকার নীতি সহযোগিতা চাই। যাতে আমরা আবার আগের মতো ব্যবসা পুরোপুরি চালু করতে পারি। স্বাধীনতার পর থেকে সিঙ্গাপুর এ পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের চার বার বেইল আউট প্যাকেজ দিয়েছিল। আমাদের বেইল আউট না দিলেও ব্যাংক ঋণ পরিশোধে দীর্ষমেয়াদি কিস্তি সুবিধাসহ নতুন করে ঋণ পাওয়ার সুয়োগ দিতে হবে। আমাদের জমি, কারখানা সবই আছে। লাগবে মূলধন সাপোর্ট। এক্ষেত্রে ব্যাংককে এগিয়ে আসতে হবে। গত ১৫ থেকে ১৬ দেশের অর্থনীতিতে যেসব ক্ষতি হয়েছে তা পূরণ করার জন্য সবাই মিলে কাজ করতে হবে।
জাতীয় অর্থনীতি: বর্তমানে জাহাজ ভাঙা ব্যবসা কেমন যাচ্ছে?
আমজাদ চৌধুরী: গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন জাহাজ ভাঙা হয়েছে। আপনি পরিসংখ্যান দেখলে দেখবেন আমরা ২০১৬ সালে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি জাহাজ ভেঙেছি। সময় ৩৪ লাখ টনের বেশি আমরা লোহার স্ক্র্যাপ পেয়েছি। অথচ ২০২৫ সালে সেই জায়গা হয়েছে মাত্র ৭ লাখ টন। এমনকি করোনা মহামারি সময়েও অনেক ভালো করেছি। মূলত ২০২২ সালের শুরু থেকে আমাদের জাহাজ ভাঙা ডলার সংকটের কারণে সংকোচন হচ্ছিল। আর এখন শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডগুলো গ্রিন ইয়ার্ডে রূপান্তর না হওয়ার কারণে ভয়াবহ রকমের কমছে।
জাতীয় অর্থনীতি: বর্তমানে জাহাজ ভাঙা শিল্প খাতের চ্যালেঞ্জগুলো কি কি?
আমজাদ চৌধুরী: জাহাজ ভাঙার কম হওয়ার মূল কারণ চাহিদা কম। আর গ্রিন শিপইয়ার্ড না করলে স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি করতে পারবে না। আর এ আইন কার্যকর হওয়ার পর থেকেই বড় ধরনের সংকটে পড়েছে দেশের জাহাজ ভাঙা শিল্প খাত। এরই মধ্যে ইয়ার্ড আধুনিকায়ন করতে না পেরে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন অনেকে। অন্যদিকে ইয়ার্ড বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে শ্রমিকদের বড় একটি অংশ। প্লটের আয়তন ভেদে ৩০ থেকে ৭০ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। এ টাকা সংস্থান করা সবার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। কারণ ব্যাংক ইয়ার্ডের জন্য ঋণ দিচ্ছে না। কিন্তু জাহাজ কাটার জন্য ঋণ দিচ্ছে।। কথা হলো ইয়ার্ড না থাকলে জাহাজ কীভাবে কাটবে! সেইটা বোঝানো যাচ্ছে না। মাঝে জাইকার একটা ঋণ সহযোগিতা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তরের তালিকায় লাল শ্রেণিতে থাকার কারণে সেই সুবিধাও আটকে যায়। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাই গ্রিন শিপইয়ার্ডের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সুবিধা দেওয়ার জন্য। কারণ বাংলাদেশ জাহাজ ভাঙা শিল্পে বিশ্বের শীর্ষ একটি দেশ। পাশের দেশ ভারতেও তাদের সরকার ও জাইকার সহযোগিতায় ১০০টির মতো গ্রিন শিপইয়ার্ড নির্মাণ হচ্ছে। সরকারি সহযোগিতা পেলে আমাদের ৫০টির অধিক গ্রিন শিপইয়ার্ড রূপান্তর হবে। বর্তমানে এ শিল্পের কার্যক্রম আগের তুলনায় অনেক উন্নত, মেকানাইজড, পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ হয়েছে। আর যখন ইয়ার্ডগুলোকে উন্নত পরিবেশবান্ধব ও উন্নত করছেন। সে মুহূর্তে জাহাজ ভাঙা শিল্পকে পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা-২০২৩ এ ‘লাল শ্রেণিভুক্ত’ করা হয়েছে, যা দেশের শিল্পায়ন এবং বিদ্যমান শিল্পের অগ্রগতির ক্ষেত্রে অন্তরায়। এ শিল্পকে ‘লাল শ্রেণিভুক্ত’ করার ফলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। শিল্প সেক্টরে বিদ্যমান ইয়ার্ডগুলোর মধ্যে বর্তমানে প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি ইয়ার্ড পরিবেশবান্ধব করার ক্ষেত্রে আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে পিছিয়ে পড়েছে। এ শিল্পকে ‘লাল শ্রেণিভুক্ত’ করার কারণে ইয়ার্ডগুলোকে উন্নত করার জন্য ব্যাংক বা অন্য কোনো সংস্থা থেকে লোনও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। আর লাল শ্রেণিভুক্ত করায় বিভাজনের আগে প্রতিটি জাহাজের জন্য মহাপরিচালকের (পরিবেশ অধিদপ্তর, ঢাকা) দপ্তর হতে পরিবেশগত ছাড়পত্র গ্রহণের বাধ্যবাদকতা আরোপ করায় একটি জাহাজের বিভাজন অনুমতি পেতে অতিরিক্ত দেড় থেকে দুই মাস বা কিছু কিছু ক্ষেত্রে আরও অধিক সময়ক্ষেপণ হচ্ছে। এছাড়া এ ব্যবস্থা আরোপের ফলে অহেতুক জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে এবং ইয়ার্ড মালিকদের হয়রানি বেড়েছে। তাছাড়া জাহাজ সৈকতায়নের পর কাটিংয়ের পূর্বে পরিবেশগত ছাড়পত্র গ্রহণের জটিলতা ও বিলম্বের কারণে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জাহাজ বিভাজন করতে না পারায় ইয়ার্ড মালিকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং এ শিল্প প্রসারের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।
জাতীয় অর্থনীতি: জাহাজ ভাঙা শিল্প খাতে সংকট উত্তরণে কেমন পদক্ষেপ প্রত্যাশা করেন?
আমজাদ চৌধুরী: অবস্থায় জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে বিনিয়োগকারী ইয়ার্ড মালিকদের আর্থিক ক্ষতি ও শিল্পের ভাবমূর্তি রক্ষার্থে জাহাজ ভাঙা শিল্পকে ‘লাল শ্রেণি’ থেকে আগে মতো ‘কমলা শ্রেণিভুক্ত’ করা আবশ্যক। যতদিন শ্রেণিগত পরিবর্তনের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন থাকবে এই সময়ে আমদানিকৃত স্ক্র্যাপ জাহাজের পরিবেশগত ছাড়পত্র মহাপরিচালক, পরিবেশ অধিদপ্তর, ঢাকার পরিবর্তে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক অফিস থেকে প্রদান করা বাঞ্ছনীয় এবং সমীচীন হবে বলে মনে করি।
জাতীয় অর্থনীতি: এ খাতে সম্ভাবনা কেমন?
আমজাদ চৌধুরী: আগামী ১০ বছরের আইএমও’র হিসাবে সাড়ে ৫ হাজার জাহাজ পরিত্যক্ত হবে। এসব জাহাজের বেশির ভাগ যদি আমরা কিনতে পারি তাহলে আবারও এ খাতে কর্মব্যস্ততা বাড়বে। সবার ব্যবসা হবে। আমাদের চলতি বছর ও আগামী বছরে কমপক্ষে ৪০ থেকে ৪৫টির মতো গ্রিন শিপইয়ার্ড রেডি হবে। তাহলে বিনিয়োগ বাড়বে। সব মিলিয়ে আমাদের সামনে ভালো দিন আসন্ন। এতে সরকারি সংস্থা ও ব্যাংকগুলোর সহযোগিতা লাগবে।
জাতীয় অর্থনীতি: ব্যবসা ও বাণিজ্যে চট্টগ্রাম পিছিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কেন? আপনার মতামত কি
আমজাদ চৌধুরী: বহুমাত্রিক কারণে চট্টগ্রাম পিছিয়ে গেছে। এরমধ্যে অন্যতম কারণ ঢাকাকেন্দ্রিক সব কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায়। এতে আঞ্চলিক বৈষম্য। অথচ ঢাকা প্রশাসনিক রাজধানী হলে বাণিজ্যিক কেন্দ্র চট্টগ্রাম হতে পারত। কারণ দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম থাকার ফলে দেশের সব ধরনের আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যেত। পাশাপাশি ভারী শিল্প তথা ইস্পাত, সিমেন্ট, সিরামিক, বড় বড় তেল রি-ফাইনারি, জাহাজ নির্মাণ শিল্প, পোশাক কারখানা, জাহাজ ভাঙাসহ সব শিল্প এখানে বিশেষ বিশেষ অঞ্চলে হতে পারত। তখন সত্যিকারের বাণিজ্যিক রাজধানীতে পরিণত হতো। অথচ শিল্প কারখানাগুলো দেশের ভিন্ন অঞ্চলে বিচ্ছিন্নভাবে গড়ে উঠেছে। ফলে বহু ধরনের সমস্যাও হচ্ছে।
—জা.অর্থনীতি/জেআরটি