আর্থিক শৃঙ্খলা এবং সরকারি ব্যয়ের স্বচ্ছতা গড়ে তুলতে হবে : ড. ফাহমিদা খাতুন

ড. ফাহমিদা খাতুন : সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক। তিনি ২০০৮-১১ সাল পর্যন্ত জনতা ব্যাংকের পরিচালক ছিলেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের গবেষক হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। তিনি জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির পরিবেশ বিশেষজ্ঞ (ইউএনডিপি) এবং বাংলাদেশের ইউএসএআইডি মিশনের অর্থনীতিবিদ। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, রাজস্ব ঘাটতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, ঋণের চাপ, বিনিয়োগের অভাবসহ অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় নতুন সরকারের নানা চ্যালেঞ্জ নিয়ে কথা বলেছেন জাতীয় অর্থনীতি’র সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. সানজিদুল ইসলাম

জাতীয় অর্থনীতি : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষে নতুন সরকারের অর্থনৈতিক কী চ্যালেঞ্জ রয়েছে?
ড. ফাহমিদা খাতুন : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। এই সরকারের প্রথম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা। মানুষের জীবনযাত্রার মান একটা সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। মানুষের জীবনযাত্রাকে সহনীয় পর্যায়ে আনতে হলে সমন্বিত মুদ্রানীতি, আর্থিক নীতি এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে। বাজার ব্যবস্থাপনা ও বাজার মনিটরিং করতে হবে। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে সমন্বিত কর্মসূচি দরকার যাতে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী চাপ কমানো যায়। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির চাপটা যাতে সহনীয় পর্যায়ে আসে সেজন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার বলেছে, তারা বিভিন্ন ধরনের সামাজিক সুরক্ষা হাতে নেবে এবং সেগুলোকে বাস্তবায়ন সচেষ্ট হবে।

জাতীয় অর্থনীতি : বাংলাদেশের ব্যাংক খাত কিছুটা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ব্যাংক খাতকে কীভাবে স্থিতিশীল পর্যায়ে নিয়ে আসা যায়?
ড. ফাহমিদা খাতুন : বাংলাদেশের ব্যাংক খাত অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। আমাদের ব্যাংক খাতের সংস্কার দরকার এবং সেই সংস্কারগুলোকে চলমান রাখতে হবে। কারণ ব্যাংক খাতে খেলাপিঋণ এত পরিমাণে বেড়েছে যা ব্যাংক খাতকে দুর্বল করে দিয়েছে। দেশে সুশাসনের ঘাটতি রয়েছে। ফলে দেশ আর্থিক দিক দিয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। সেটাকে পুনরুদ্ধার করতে হবে যাতে কিনা আমাদের আর্থিক খাতে মানুষের আস্থা ফিরে আসে এবং পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়।
তাছাড়া আমাদের বাহ্যিক খাতেও অনেক ঝুঁকি আছে। যদিও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ছে কিন্তু এটা আরও দ্রুত বাড়াতে হবে। কারণ আমরা আমদানি কমিয়ে দিয়েছি। যদি আমাদের বিনিয়োগ বাড়াতে চাই তাহলে মূলধনি যন্ত্রপাতি এবং মধ্যবর্তী উৎপাদনের জন্য কাঁচামাল আরও বেশি পরিমাণ আমদানি করতে হবে। বিনিয়োগ বাড়াতে হলে আমদানি বাড়ানো অব্যাহত রাখতে হবে। আমাদের রেমিট্যান্স প্রবাহ যেটা আছে তা যেন বৃদ্ধি পায় সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। রেমিট্যান্স যেন ফরমাল চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থাৎ ব্যাংকিং চ্যানেলে আসে সেই দিকে নজর দিতে হবে। রপ্তানির প্রবৃদ্ধিটাকে ধরে রাখতে হবে কারণ রপ্তানির প্রবৃদ্ধি এখন খুবই দুর্বল অবস্থায় আছে।

জাতীয় অর্থনীতি : বিগত সরকারের সময়ে বিদেশি ঋণ এবং ব্যাংক খাত থেকে দেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে তার অর্থনৈতিক চাপকে আপনি কিভাবে দেখছেন।
ড. ফাহমিদা খাতুন : আমাদের সরকারের যে ঋণ, বিশেষ করে বিদেশি ঋণ এবং ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেওয়া দেশি ঋণ দুটিই নতুন সরকারের সামনে চ্যলেঞ্জ হিসেবে থাকবে। কিন্তু সরকার এগুলোকে কিভাবে ফেরত দেবে সেটাই এখন চিন্তার বিষয়। সেজন্য অর্থের ব্যবহারটা যথাযথভাবে করতে হবে এবং অপচয় ও দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। দেশের ব্যাংক থেকে যে ঋণ নিয়েছে তা ফেরত দেওয়ার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারের বিদেশি ঋণ ফেরত দেওয়ার জন্য বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে হবে। দেশি ঋণ ফেরত দেওয়ার জন্য সরকারের যে ব্যাংক নির্ভরতা রয়েছে তা কমাতে হবে। অর্থাৎ ব্যাংক থেকে যে ঋণ নিচ্ছে সেটার পরিমাণ কমাতে হবে। সেজন্য সরকারকে রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। দেশের রাজস্ব আয় জিডিপি অনুপাতে এখনও অনেক কম। কিন্তু অন্যদিকে আমরা জানি, ব্যয়ের অনেক চাপ আছে। ব্যয়ের চাপ বলতে বেতন-ভাতা থেকে শুরু করে সামাজিক সুরক্ষা ও ঋণ পরিশোধের বিষয় রয়েছে। এছারাও আরও বিভিন্ন ধরনের ভর্তুকি রয়েছে। সব মিলেই কিন্তু এই ব্যয়ের চাপটা অনেক বেশি। অন্যদিকে ব্যয়ের তুলনায় আমাদের আয় অনেক কম। সবসময় আমাদের বাজেট ঘাটতি থাকে। বাজেটের ঘাটতির একটা অংশ বিদেশ থেকে ঋণ করতে হয়। বাজেট ঘাটতি যাতে না বাড়ে সেজন্য রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। সরকার নিজেই এই ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেয়। এই ঋণের কারণে বাজেট ঘাটতিটা যেন আর না বাড়ে এবং সেটার জন্য রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। এর জন্য রাজস্ব সংস্কারটাই হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এর আগে দেখেছি যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাজস্ব সংস্কারের জন্য কিছু উদ্যোগ নিয়েছিল। রাজস্ব সংস্কারের জন্য প্রশাসন এবং কর আদায় দুটোকে আলাদাভাবে ভাগ করা হয়েছিল। এখন আসলে এই সংস্কারটাকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করতে হবে যাতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআরের সক্ষমতাটা বাড়ে। আমাদের প্রত্যক্ষ করের পরিধিটা বাড়াতে হবে। আমরা তো বেশির ভাগ সময়েই পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরশীল। প্রত্যক্ষ কর বাড়াতে হলে কর ফাঁকি দেওয়া বন্ধ করতে হবে। তারপরে সরকারের ব্যয়ের ক্ষেত্রেও দক্ষতা বদ্ধি করতে হবে। দুর্নীতি এবং অপচয় বন্ধ করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জটা হচ্ছে, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং সরকারি ব্যয়ের স্বচ্ছতা গড়ে তোলা। তাছাড়া নতুন সরকার উন্নয়নের যে প্রতিশ্রুতিগুলো দিয়েছে সেগুলো পূরণ করা সম্ভব না।

জাতীয় অর্থনীতি : বাংলাদেশ-জাপান যে বৈদেশিক বাণিজ্য চুক্তিগুলো হয়েছে তা বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে কতটুকু প্রভাব ফেলবে বলে আপনি মনে করেন?
ড. ফাহমিদা খাতুন : জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের যে বৈদেশিক বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে এটা খুবই আশাব্যঞ্জক। এই চুক্তি বাস্তবায়ন করতে আমাদের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। চুক্তিটি দুই দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা, বিনিয়োগ ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য সমন্বিত ও টেকসই পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে। শুধু বাণিজ্যিক নয়, এটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ককেও দৃঢ় করবে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমাদের নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানো খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং বাজার বহুমুখীকরণ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এগ্রিমেন্ট করতে হবে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা যেহেতু ভালোমতো কাজ করছে না। সে কারণে এক দেশ আরেক দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করছে। অর্থাৎ এক দেশ আরেক দেশের বাজারে শিল্পমুক্ত প্রবেশাধিকার এবং সুযোগ সুবিধা পাবে। আমাদেরকে সেই সুবিধার মধ্যে দিয়ে দেশের বানিজ্যকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

জাতীয় অর্থনীতি : নতুন সরকারকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কী কী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হবে বলে মনে করেন?
ড. ফাহমিদা খাতুন : অতীতেও বাংলাদেশে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার নানা ঘটনা ঘটেছে। এবার সহিংসতা বন্ধে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছ থেকে স্পষ্ট বার্তা যেতে হবে যেকোনো ধরনের সহিংসতা বা সংখ্যালঘু নির্যাতন যাতে না হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্রুত ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও উসকানি প্রতিরোধে কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা করা। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় নেতাদের সহিংসতা প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
নতুন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার মাধ্যমে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা। দেশের অর্থনীতি ব্যাপক চাপের মধ্যে রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, রাজস্ব ঘাটতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, ঋণের চাপ, বিনিয়োগের অভাব ইত্যাদি অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় দ্রুত একটি অর্থনৈতিক রোডম্যাপ ঘোষণা করা প্রয়োজন। তাছাড়াও প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে ইতিবাচক যোগাযোগ স্থাপন করা জরুরি।