ড. মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক। একইসঙ্গে তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং স্কলার এবং ভিজিটিং অধ্যাপক হিসেবে কাজ করছেন। স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের সদস্য ছিলেন। তিনি দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্কের ব্যর্থতার কারণ ও ভবিষ্যতে একটি কার্যকর আঞ্চলিক সংগঠন হিসেবে এর সম্ভাবনা নিয়ে দৈনিক জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দিদারুল হক।
জাতীয় অর্থনীতি: ৪০ বছর পর একটি আঞ্চলিক সংগঠন হিসেবে সার্ককে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
ড. মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম: আপনি জানেন, বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে সার্ক গঠনের প্রস্তাব দেন। কিন্তু শুরু থেকেই সার্কের অগ্রগতি নানা আঞ্চলিক বিরোধে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা জটিলতার সঙ্গে সার্কের সীমাবদ্ধতা গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিশ্ব রাজনীতিতে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থান থাকা সত্ত্বেও সার্ক সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারেনি। ফলে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এটি অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে রয়েছে। দুঃখজনকভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও সার্কের কার্যক্রমে নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সার্কের এই ধীরগতির পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে ভারত-পাকিস্তান বিরোধ এবং সার্ক অঞ্চলে ভারতের ‘বিগ ব্রাদার’ মনোভাব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
আপনি জানেন, আয়তন ও জনসংখ্যার বিচারে ভারত দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি। ফলে অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রগুলো ভারতের প্রতি সন্দেহপ্রবণ থাকে এবং আস্থার অভাব দেখা যায়। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই অনাস্থা সার্কের কার্যকারিতাকে দুর্বল ও অনিশ্চিত করে তোলে। এই বৈপরীত্য ভারতের আঞ্চলিক সহযোগিতা পরিচালনার সক্ষমতাকেও ক্ষুন্ন করে, যেখানে প্রভাব বিস্তার সবসময় গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বে রূপ নেয় না। সার্কের মতো প্ল্যাটফর্মকে শক্তিশালী করতে হলে ভারতের উচিত আধিপত্য প্রতিষ্ঠার মানসিকতা থেকে সরে এসে আস্থা গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দেওয়া। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমতার ভিত্তিতে অংশীদারিত্ব গড়ে উঠলে তবেই প্রকৃত সহযোগিতা সম্ভব হবে। মূলত অর্থনৈতিক বাস্তবতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক অবিশ্বাস-এই তিনটি কারণ সার্কের কার্যকারিতা কমিয়ে দিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় আন্তঃরাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে জনগণের মধ্যে প্রতিশ্রুতির অভাব রয়েছে। সর্বপরি, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি স্পষ্ট, যা বিরোধ নিষ্পত্তি করে পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার মাধ্যমে আঞ্চলিক অগ্রগতির পথে এগোনোর ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জাতীয় অর্থনীতি: সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অভিন্ন স্বার্থ রক্ষায় সার্ক কীভাবে এগোতে পারে?
ড. মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম: দক্ষিণ এশিয়া বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল, যেখানে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সার্কভুক্ত দেশগুলোতে দুই বিলিয়নেরও বেশি মানুষ বসবাস করছে। কার্যকরভাবে কাজ করতে হলে সার্কের জন্য পারস্পরিক ঐকমত্য অপরিহার্য। বিশেষ করে, দুই বৃহৎ সদস্য রাষ্ট্র যদি দ্বিপাক্ষিক বিরোধ থেকে আঞ্চলিক সহযোগিতাকে আলাদা করে দেখার রাজনৈতিক সদিচ্ছা না দেখায়, তাহলে সার্কের অগ্রগতি সম্ভব নয়।
আপনি জানেন, সার্কের মূল লক্ষ্য হচ্ছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা, সামাজিক অগ্রগতি ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা এবং জনগণের কল্যাণ সাধন করা। পাশাপাশি, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও বোঝাপড়া জোরদার করাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য। কিন্তু বাস্তবতা হালো, সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক পরিপূরকতার ঘাটতি রয়েছে। বরং এসব দেশ প্রায় একই ধরনের পণ্য যেমন মসলা, তুলা, পাট ইত্যাদি রপ্তানি করে, যা তাদের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পরিণত করেছে। এর পাশাপাশি, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আন্তঃআগালিক বাণিজ্যও অত্যন্ত কম, যা অর্থনৈতিক একীকরণের পথে বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিন এশিয়ার মোট বাণিজ্যের মাত্র ৫ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলার অঞ্চলটির অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য থেকে আসে। অন্যদিকে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন মানুষের আবাসস্থল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১১টি দেশের জোট আসিয়ানের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ২৫ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো যদি বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা কমাতে পারে, তাহলে তারা প্রায় ৬৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি-রপ্তানি করতে পারবে, যা বর্তমান বাণিজ্যের প্রায় তিনগুণ।
আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা, জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ এবং বাণিজ্য সহজীকরণ-এসব ক্ষেত্রকে অন্তর্ভুক্ত করে সার্ককে এমন অবস্থানে যেতে হবে, যেখানে পুরো অঞ্চল উপকৃত হতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও সহজগম্যতা নিশ্চিত করা। শুধু সড়ক বা সেতু নয়, সমুদ্রপথ, রেলপথ, টেলিযোগাযোগসহ সব ধরনের সংযোগব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ভৌগোলিক নৈকট্য বিবেচনায় সীমান্ত-পার সহযোগিতা অনিবার্য। যদি সংঘাত কমানো, সন্ত্রাসবাদের হুমকি মোকাবিলা করা এবং পারস্পরিক বিনিময় সহজ করা দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানদের লক্ষ্য হয়, তাহলে এই সহযোগিতা জোরদার করা ছাড়া বিকল্প নেই।
জাতীয় অর্থনীতি: ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার কারণে সার্ক যদি নীরবে ভেঙে পড়ে, তাহলে ত্রিপক্ষীয় কৌশলগত সম্পর্কের সম্ভাবনা কী?
ড. মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম: ভারত ও পাকিস্তানের টানাপোড়েনের কারণে যদি সার্ক কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে, তাহলে ত্রিপক্ষীয় কৌশলগত সম্পর্কের সম্ভাবনা জোরালো হয়ে ওঠে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি এই প্রেক্ষাপটে চীনের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম গণতন্ত্র ও অর্থনীতির দেশ হিসেবে ভারতের উচিত দীর্ঘদিনের ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে এসে সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করা। একই সঙ্গে নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ ক্রমেই উপলব্ধি করছে যে, নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করা জরুরি।
আমরা দেখতে পাচ্ছি, পাকিস্তান ভারতের বাইরে বিকল্প পথ ধরে দক্ষিণ এশিয়াকে সংযুক্ত করার কূটনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে এগিয়ে যাচ্ছে। একদিকে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে পাকিস্তান কূটনৈতিকভাবে সক্রিয় অবস্থানে পৌঁছেছে। এই দ্বিমুখী কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা ইসলামাবাদকে আঞ্চলিক কূটনীতিতে পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ফিরে আসার আত্মবিশ্বাস ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা দিয়েছে। বর্তমান দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপট বেশ উদ্বেগজনক। অনেক দেশ অর্থনৈতিক সংকট বা রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক সংযোগ, মানুষে মানুষে যোগাযোগ এবং কার্যকর বাণিজ্য সম্প্রসারণের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করা প্রয়োজন। পুরো অঞ্চলে সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। এর মধ্যে রেল, সড়ক, টেলিযোগাযোগ ও সামুদ্রিক অবকাঠামোসহ সব ধরনের খাত অন্তর্ভুক্ত। ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সীমান্ত পার সহযোগিতা অপরিহার্য। বিশেষ করে সংকট কমানো, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা এবং যোগাযোগ উন্নত করার ক্ষেত্রে।
জাতীয় অর্থনীতি: সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করতে বাংলাদেশ কি শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারবে?
ড. মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম: কিছু প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ বিশ্বাস করে যে, আঞ্চলিক একীকরণের জন্য সার্কের সাফল্য এখনও সম্ভব। নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ সার্ককে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয় এবং এটিকে একটি প্রাণবন্ত আঞ্চলিক সংগঠন হিসেবে দেখতে চায়। সার্ক সনদের নীতি ও উদ্দেশ্যের প্রতি বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সার্ককে সক্রিয় রাখতে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনুস কার্যকর সার্ক নিয়ে বেশ আশাবাদী ছিলেন। তিনি প্রায়ই সার্কের স্থবিরতার সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাফল্যের তুলনা করতেন এবং বলতেন যে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে। তার মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো সহযোগিতামূলক কাঠামোই ইউরোপকে সফল করেছে। যদি কোনো দেশের সঙ্গে সমস্যা থাকে, বিকল্প সমাধান খুঁজে বের করা সম্ভব। কিন্তু সার্কের কার্যক্রম বন্ধ থাকা উচিত নয়। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যা ২০১৬ সাল থেকে অনেকটাই স্থবির। বাংলাদেশ চায় আসিয়ান এবং সার্কের মধ্যে সংযোগসূত্র হিসেবে কাজ করতে। আসিয়ানে যুক্ত হয়ে অর্থনৈতিক সংযোগ ও শিক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে সার্ক অঞ্চলের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে চায় বাংলাদেশ। রাজনৈতিক টানাপোড়েন সংস্থাটিকে দুর্বল করে দিয়েছে। তা উপলব্ধি করে বাংলাদেশ বাণিজ্য, সংযোগ ও প্রযুক্তির মতো অরাজনৈতিক ও কম বিতর্কিত খাতে গুরুত্ব দিয়ে আস্থা ও সহযোগিতা পুনর্গঠনের পক্ষে। ১৭ বছর পর একটি অবাধ, সুষ্ঠু, বিশ্বাসযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিজয় অর্জন করে সরকার গঠন করেছে। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে অর্জিত এই বিজয় নতুন আশার দ্বার খুলে দিয়েছে। আমরা আশা করি, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত ধরে চলমান রাষ্ট্র সংস্কার প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী হবে এবং তার রাষ্ট্রগঠন পরিকল্পনার মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্ব পরিসরে আরও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান অর্জন করবে।
সার্ক প্রতিষ্ঠার দূরদর্শী উদ্যোগের জন্য জিয়াউর রহমানকে কৃতিত্ব দেওয়া হয়। নির্বাচনি ইশতেহারে তারেক রহমান সার্ককে কার্যকর করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিলেন। নির্বাচন-পরবর্তী সময়েও তারেক রহমান সেই একই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তারেক রহমানের সরকার সার্ক পুনরুজ্জীবনকে ‘কোনো একক দেশের ওপর নির্ভরতা কমানো’-এর একটি কৌশল হিসেবে দেখছে, যা আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক। তাদের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি ‘বন্ধু হ্যাঁ, প্রভু নয়’ এবং ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ এর অংশ হিসেবে সার্ককে শক্তিশালী করা এবং আসিয়ানে সদস্যপদ লাভের চেষ্টা করা। এক্ষেত্রে নবগঠিত বাংলাদেশ সরকার সার্ক সচিবালয়ের কাছে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করতে পারে, যেখানে সার্কভুক্ত দেশগুলোর সাবেক কূটনীতিক ও বিশেষজ্ঞ অধ্যাপকদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হবে, যা সংস্থাটিকে পুনরুজ্জীবিত করার পথ খুঁজে বের করবে।
জাতীয় অর্থনীতি: একজন একাডেমিক হিসেবে, ভবিষ্যতে কার্যকর সার্ক নিয়ে আপনি কি আশাবাদী?
ড. মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম: নানা সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও আমি মনে করি সার্ক পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়নি। তবে এটিও নিশ্চিত করতে হবে যে, সার্কের অগ্রগতি বা উন্নয়ন যেন আঞ্চলিক কৌশলগত কার্যক্রমের সঙ্গে সংঘাত তৈরি না করে। এ ক্ষেত্রে এখনও অনেক কাজ বাকি। তবুও যৌক্তিক ও কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে দ্বন্দ্বকে সুযোগে রূপান্তর করা সম্ভব। দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম দেশ হিসেবে সার্ককে সফল করার মতো ভারতের পর্যাপ্ত সক্ষমতা ও সম্পদ রয়েছে। জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার বিচারে ভারত অঞ্চলটির সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ।
তাই পক্ষপাতদুষ্ট অবস্থান থেকে সরে এসে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে উন্মুক্ত ও সহযোগিতামূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা উচিত। উল্লেখ্য, সার্কভুক্ত অনেক দেশের সঙ্গে ভারতের সরাসরি ভৌগোলিক সীমান্ত রয়েছে, যা সহযোগিতার সুযোগকে আরও বাস্তবসম্মত করে তুলতে পারে।
বিতর্কিত ইস্যুগুলোর সমাধান আপাতত স্থগিত রেখে সহযোগিতা জোরদার করার যে কৌশল তা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য লাভজনক হতে পারে। আঞ্চলিক বাস্তবতা ও নতুন ত্রিপক্ষীয় অংশীদারিত্বের সম্ভাবনা বিবেচনায় এই পদ্ধতি কার্যকর হতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ায় নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে হলে ভারতকে উন্মুক্ত মন নিয়ে এগোতে হবে এবং প্রতিবেশীদের উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা রাখতে হবে।
আঞ্চলিক বাস্তবতা বিবেচনায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য একটি বাস্তবসম্মত পথ হলো, এই মুহূর্তে বিতর্কিত বিষয়গুলো এড়িয়ে গিয়ে সার্কের মাধ্যমে সহযোগিতা বাড়ানো। ভারত-পাকিস্তান বৈরিতার প্রসঙ্গে বলা যায়, দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বিরোধ যেন সার্কের অন্যান্য উপ-অঞ্চলে সহযোগিতার অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত না করে। বরং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাফল্যের দৃষ্টান্ত অন্যদের অনুপ্রাণিত করতে পারে এবং ধীরে ধীরে সার্ককে একটি কার্যকর আঞ্চলিক সংগঠনে পরিণত করতে পারে।
সবশেষে, দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি, স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি হলো আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধি। মনে রাখতে হবে, সার্ক কেবল অর্থনৈতিক সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সাংস্কৃতিক বিনিময়, মানুষে-মানুষে যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক সম্পদের যৌথ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রশ্ন হলো, দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ কেন এই সম্ভাবনা থেকে বঞ্চিত থাকবে?
তাই সার্ককে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো কার্যকর কাঠামোয় রূপান্তরিত করা প্রয়োজন, যেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন খাতে সদস্য দেশগুলো সর্বোচ্চ সুবিধা পাবে। একক ভিসা ব্যবস্থা, অভিন্ন মুদ্রা, সার্ক ব্যাংক, সার্ক পার্লামেন্টসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। দক্ষিণ এশিয়ার নেতাদের উচিত পারস্পরিক বিরোধ, আধিপত্য ও একচেটিয়াবাদের পরিবর্তে আঞ্চলিক স্বার্থ এবং জনগণের চাহিদাকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
[প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া, চিঠিপত্রে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। এগুলোর সঙ্গে জাতীয় অর্থনীতির সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সর্বদা মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে জাতীয় অর্থনীতি কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ।]