কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি: কিশোরগঞ্জে টানা বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলে বেশিরভাগ নদ-নদীর পানি গত ২৪ ঘণ্টায় বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এতে জেলার হাওরাঞ্চলে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এরই মধ্যে প্রায় ৭ হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে।
শনিবার (২ মে) সকাল ৯টায় কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে জানানো হয়, ইটনা পয়েন্টে ধনু-বৌলাই নদীর পানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩.০৬ মিটার, যা আগের দিনের তুলনায় ৫ সেন্টিমিটার বেশি। চামড়াঘাটে মেঘনা নদীর পানি ২.৭৩ মিটার, বেড়েছে ১০ সেন্টিমিটার। অষ্টগ্রামে কালনী নদীর পানি ২.৪৫ মিটার, যা ১৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে।
অন্যদিকে ভৈরব বাজার পয়েন্টে মেঘনা নদীর পানি কিছুটা কমে ১.৮০ মিটারে দাঁড়িয়েছে, যা গতকালের তুলনায় ৭ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, সবকটি নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বিভিন্ন পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ১০৯ থেকে ৪০০ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে।
তবে উজানের ঢল ও বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে নদীর পানি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে হাওরাঞ্চলের ফসলে আরও ক্ষয়ক্ষতির শঙ্কা রয়েছে।
কিশোরগঞ্জের নিকলী আবহাওয়া অফিসের সিনিয়র অবজারভার আক্তার ফারুক জানান, শনিবার (২ মে) দুপুর ৩টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৪৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগে শুক্রবার (১ মে) দুপুর পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৩৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। এর আগে বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) দুপুর ১২টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, হাওর অঞ্চলের হাজার হাজার হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। ফলে ধান ঘরে তোলা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তারা। শুক্রবার রোদ থাকলেও শনিবার সকাল থেকেই বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে। এতে খলায় রাখা ধান শুকাতে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। ধান শুকাতে না পারলে ধানে পচন ধরবে। ধান শুকাতে না পারায় অনেক ধানে চারাগাছ জন্মেছে।
নিকলী উপজেলার পাচরুখী এলাকার কৃষক কফিল উদ্দিন জানান, তারা বুক সমান পানিতে নেমে ধান কাটছেন। কিন্তু ভেজা ধান ঘরে তুলে শুকানোর উপায় নেই। রোদ না উঠলে ধান পচে যাবে। এ দুশ্চিন্তায় দিশাহারা তারা।
নিকলী উপজেলার কুর্শা হাওরের কৃষক সেলিম মিয়া বলেন, ‘একদিকে বজ্রপাত, অন্যদিকে বৃষ্টি, আমাদের সব শেষ। জীবনের ঝুঁকি নিয়েই পানিতে নেমে ধান কাটছি। না কাটলে আমাদের আর কিছুই থাকবে না, তাই যত কষ্টই হোক, এ ধানই আমাদের সারা বছরের ভরসা, তাই সব ঝুঁকি নিচ্ছি।
জেলার হাওরের প্রায় সব এলাকায় একই অবস্থা। কোথাও ধান কাটার শেষ চেষ্টা, কোথাও সব ছেড়ে দিয়ে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছেন কৃষক। টানা বৃষ্টিতে জেলার প্রায় সব হাওরের ফসল তলিয়ে গেছে। সোমবার থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টিতে ফসলের মাঠ জলমগ্ন হলেও রাতের টানা বৃষ্টিতে ফসল তলিয়ে গেছে ফসল।
কৃষক শহীদ মিয়া বলেন, আমার সব শেষ হয়ে গেল, একমাত্র বোরো ফসলের ওপর নির্ভরশীল আমার পরিবার। ধারদেনা করে জমি চাষাবাদ করেছিলাম, এখন সারাবছর কীভাবে চলব! তাঁর ধারণা, কমপক্ষে দেড়-দুই হাজার হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে।
আরেক কৃষক জালাল উদ্দিন বলেন, ‘৬৭৫ টাকা দরে ২০০ মণ ধান বিক্রি করেছি। উৎপাদন খরচ তুলতেই কষ্ট হচ্ছে। প্রতি মণ ধান উৎপাদনে খরচ পড়ছে প্রায় ৮৫০ থেকে ৯০০ টাকা। সরকার ১,৪৪০ টাকা দরে ধান কেনার ঘোষণা দিলেও সাধারণ কৃষকরা সেই সুবিধা পাচ্ছেন না।’
কৃষকদের দাবি, সরকার ঘোষিত মূল্য যেন প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছায়, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে কৃষকরা ধান চাষে আগ্রহ হারাতে পারেন।
নিকলী উপজেলা কৃষি অফিসের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম মামুন জানান, বিগত কয়েকদিনের অতি ভারি বৃষ্টির ফলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। জলাবদ্ধতার কারণে অনেক জমি তলিয়ে গেছে। আবহাওয়া যদি অনুকূলে থাকে, রোদ উঠে তাহলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনা যাবে। নিকলী উপজেলায় ১৫ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে।ইতিমধ্যেই ৫০-৫৫ শতাংশ জমির ধান কর্তন করা হয়েছে। নিচু জমি গুলি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষকদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। এর আগেই দ্রুত ধান কেটে ঘরে তোলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।
কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান জানান, বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত মাঠপর্যায়ের তথ্যমতে ৬ হাজার ৭৬৮ হেক্টর জমি পানিতে তলিয়ে গেছে, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ইটনা ও অষ্টগ্রাম উপজেলায়। এবার জেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত জেলায় ৫৪ শতাংশ জমির বোরো ফসল কাটা হয়েছে। জেলায় প্রায় সাড়ে ৬ হাজারের উপর হেক্টর জমির বোরো ফসল পানিতে নিমজ্জিত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ড.সাদিকুর রহমান আরও জানান, আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে আমরা গত কয়েকদিন ধরে কৃষকদেরকে মাইকিং করে ও মসজিদে মসজিদে বলে দিয়েছি যেসকল পাকা ধান অর্ধনিমজ্জিত আছে সেগুলি ৮০ শতাংশ পাকলেই দ্রুত ধান কাটার জন্য। আমাদের কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। কৃষকদের দ্রুত পাকা ধান নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং ভুট্টা সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
—জা.অর্থনীতি/এএইচএ
