মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে প্রাকৃতিক সম্পদ বালু এখন এক ভয়ংকর ও অনিয়ন্ত্রিত কোটি টাকার অবৈধ অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। এই বিশাল সাম্রাজ্য থেকে সরকার পাচ্ছে সামান্য রাজস্ব, আর কোটি কোটি টাকার লুটের অর্থ জমা হচ্ছে প্রভাবশালী এক সিন্ডিকেটের পকেটে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রশাসনের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় অবস্থিত মোট ২৮টি বালুর কোয়ারি ও মহালের মধ্যে মাত্র ২টি সাধারণ বালুমহাল নিয়মানুযায়ী ইজারা দেওয়া হয়েছে। বাকি ২৬টি সিলিকা বালুর কোয়ারি সম্পূর্ণ ইজারার বাইরে রয়েছে। ফলে মাত্র ২টি স্থানে বৈধভাবে বালু উত্তোলনের সুযোগ থাকলেও বাস্তবে প্রতিদিন সরকারি ইজারা ছাড়া অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও বিক্রি চলছে ২৬টি পয়েন্ট থেকে।
সরকারি নথি অনুযায়ী, চলতি বছরের আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত তিন মাসে শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন পয়েন্টে পরিচালিত মোট ১৬টি অভিযানে সরকার জরিমানা আদায় করতে পেরেছে মাত্র ১ লাখ টাকা। অন্যদিকে অভিযানকালে জব্দ করা বালু প্রকাশ্যে নিলামে বিক্রি করে রাজস্ব পাওয়া গেছে ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা।
অথচ সাম্প্রতিক কয়েকটি অভিযানের চিত্রে ধরা পড়েছে বালু লুটের ভয়াবহ ব্যাপ্তি। গত ৩১ অক্টোবর রায়পরান পশ্চিমপাড়া থেকে ১৬ হাজার ঘনফুট এবং ২ নভেম্বর মুড়াছড়া ও বৌলাছড়া থেকে ১০ হাজার ঘনফুট-অর্থাৎ মাত্র দুটি অভিযানেই জব্দ করা হয়েছে প্রায় ২৬ হাজার ঘনফুট বালু। প্রতিদিন যদি এই বিপুল পরিমাণ বালু অবৈধভাবে উত্তোলন করা হয়, তবে বছরে লুটের মোট পরিমাণ কত এবং এর বাজারমূল্য কত কোটি টাকা-তার সুনির্দিষ্ট কোনো হিসাব কোনো সরকারি দপ্তরের কাছে নেই।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শ্রীমঙ্গলে চলমান এই অনিয়ন্ত্রিত বালু লুটের কারণে তিন স্তরে চরম ক্ষতির শিকার হচ্ছে রাজ্য ও জনগণ:
১. সরকারের বিপুল রাজস্ব ক্ষতি: বৈধ ইজারা না দিয়ে অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকার বালু তোলায় সরকার হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।
২. কৃষি ও পরিবেশের বিনাশ: পাহাড়, ছড়া ও আশপাশের কৃষিজমি অবাধে কেটে বালু তোলায় বিনষ্ট হচ্ছে শত শত একর ফসলি জমি। একই সঙ্গে নদী ও ছড়ার তীরভাঙনে ভিটেমাটি হারাচ্ছে স্থানীয় মানুষ।
৩. জনগণের সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি: অপরিকল্পিতভাবে বালু বহনের কাজে নিয়োজিত ভারী ড্রাম ট্রাকের কারণে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ সড়ক ও সেতু, যা পরবর্তীতে মেরামতে আবার জনগণের করের টাকাই ব্যয় করতে হচ্ছে।
বালু খেকোদের এই তাণ্ডবে প্রতিনিয়ত ঘটছে মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনাও। সম্প্রতি শ্রীমঙ্গলে দ্রুতগতির বালুবাহী গাড়ির চাপায় অটোরিকশা ও টমটমের ড্রাইভারসহ অন্তত ৬ জন গুরুতর আহত হন। এ ঘটনার পর ক্ষুব্ধ ও উত্তেজিত জনতা ঘাতক গাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়।
এ বিষয়ে শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান জানান, "অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং নিয়মিত অভিযান চালিয়ে জেল-জরিমানা করা হচ্ছে। তবে আইনি ফাঁকফোকরে অপরাধীরা জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও একই অবৈধ কারবারে জড়িয়ে পড়ছে।"
এদিকে স্থানীয় পরিবেশবিদ ও সচেতন মহলের মতে, প্রশাসনিক সাময়িক অভিযান চালিয়ে এই সুবিশাল অবৈধ অর্থনীতির লাগাম টানা সম্ভব নয়। যতদিন না এর শেকড় কাটা হবে, ততদিন লুটপাট অব্যাহত থাকবে। ইজারা প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করা, জব্দকৃত বালুর সঠিক হিসাব রাখা এবং এই অবৈধ সিন্ডিকেটের অর্থের আসল উৎস বন্ধ করাই এখন প্রশাসনের প্রধান চ্যালেঞ্জ। শ্রীমঙ্গলের পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করতে হলে শুধু অভিযান নয়, বরং কঠোর অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা জরুরি।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি
