মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের পুরুলিয়া থেকে আসা ভীম রুদ্রপালের স্বপ্ন আজও বেঁচে আছে। প্রতিদিন ভোরে মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার বিনন্দপুর গ্রামের একটি মাটির রান্নাঘর থেকে ধোঁয়া ওঠে। দৃশ্যটি নতুন নয়। প্রায় ৮০ বছর ধরে একইভাবে জ্বলছে সেই উনুন। আর সেই উনুনেই প্রতিদিন রান্না হয় ৫০ জন মানুষের জন্য। এরা অতিথি নন, কোনো উৎসবের সমাগমও নয়। তারা সবাই একই পরিবারের সদস্য—একটি নাম, একটি ছাদ আর একটি সংসার ভাগ করে নেওয়া মানুষ। ৯ ভাই, ৫০ সদস্য, ১০ বিঘা জমি, এক হাঁড়ির ভাত!
উপজেলার পূর্ব জুড়ী ইউনিয়নের বিনন্দপুর গ্রামের রুদ্রপাল পরিবার আজও টিকিয়ে রেখেছে একান্নবর্তী পরিবারের সেই ঐতিহ্য, যা দেশের অধিকাংশ এলাকায় এখন প্রায় বিলুপ্ত। যখন একক পরিবারই সামাজিক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে এবং যৌথ পরিবার ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছে, তখন রুদ্রপাল পরিবারের জীবনযাপন যেন অন্য সময়ের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
গ্রামের ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে একটি শান্ত সবুজ পুকুর। তার পাশে ফলদ গাছ, ফুলের ঝোপ আর মৌসুমি সবজির বাগান। চারদিকে টিনের চালার কয়েকটি ঘর ঘিরে তৈরি হয়েছে প্রশস্ত একটি উঠান। উঠানের মাঝখানে খড়ের ছাউনি দেওয়া মাটির রান্নাঘর। পরিবারের সব সদস্যের খাবার রান্না হয় সেখানেই।
স্থানীয়দের কাছেও পরিবারটি বিশেষ পরিচিত। পূর্ব জুড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ওবায়দুল ইসলাম বলেন, আশপাশের এলাকায় এমন পরিবার আর নেই। বিনন্দপুর দিয়ে গেলে আমি প্রায়ই তাদের বাড়িতে যাই। এই পরিবার আমাদের গর্ব।
পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা ভীম রুদ্রপাল জন্মেছিলেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়ায়। ব্রিটিশ শাসনামলে কাজের খোঁজে তিনি তৎকালীন পূর্ববাংলায় আসেন এবং ধামাই চা বাগানে শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। দেশভাগের কিছু আগে তিনি বিনন্দপুর পাহাড় এলাকায় অল্প দামে জমি কিনে বসতি গড়েন। সেই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে আজকের রুদ্রপাল পরিবার।
ভীম রুদ্রপাল, তার দুই ছেলে মুরারি ও কেশব—কেউই আজ বেঁচে নেই। তবে তাদের গড়ে দেওয়া পরিবার টিকে আছে আগের মতোই। মুরারি ও কেশবের মোট নয় ছেলে ছিলেন। সেই নয় ভাই, তাদের স্ত্রী, সন্তান ও নাতি-নাতনিরা এখনও একই ছাদের নিচে বসবাস করছেন।
বর্তমানে পরিবারের দায়িত্ব পালন করছেন মুরারির বড় ছেলে পলাশ রুদ্রপাল। প্রায় ষাট বছর বয়সী পলাশ পরিবারের আয়-ব্যয়, সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও সার্বিক সিদ্ধান্ত দেখভাল করেন।
পলাশ বলেন, বাবা-কাকার সময় থেকেই আমরা একসঙ্গে আছি। এখনও একই হাঁড়িতে রান্না হয়, সবাই একসঙ্গে খাই। আলাদা হওয়ার কথা কখনও ভাবিনি।
পরিবারের বড় বধূ নীলিমা রুদ্রপাল বলেন, তিন পালায় তিনবেলা রান্না হয়। সবাই যার যার দায়িত্ব পালন করে। কাজ নিয়ে বা অন্য কোনো বিষয় নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ হয় না বললেই চলে।
প্রবীণ সদস্য সোহাগী রুদ্রপাল বলেন, ছেলে, বউমা আর নাতি-নাতনিদের নিয়ে ভালোই আছি। ভগবানের কাছে শুধু এই প্রার্থনা করি, সবাই যেন সবসময় এভাবেই একসঙ্গে থাকে।
এই দীর্ঘস্থায়ী ঐক্যের পেছনে শুধু পারিবারিক বন্ধন নয়, রয়েছে সুসংগঠিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা। পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত। নয় ভাইয়ের মধ্যে একজন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, একজন বেসরকারি চাকরিজীবী, একজন গ্রাম্য পশুচিকিৎসক এবং একজন প্রবাসে কর্মরত। বাকিরা কৃষিকাজ ও পারিবারিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় যুক্ত আছেন।
স্থানীয় দুর্গাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অশোক রঞ্জন রুদ্রপাল মনে করেন, এই পরিবার সমাজের জন্য একটি ইতিবাচক উদাহরণ।
তিনি বলেন, একটি পরিবার যখন ঐক্যবদ্ধ থাকে, তখন সদস্যরা একে অপরের কাছ থেকে শক্তি ও সাহস পায়। নতুন প্রজন্ম শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার শিক্ষা পায়। রুদ্রপাল পরিবার সেই উদাহরণই তৈরি করেছে।
সময়ের সঙ্গে বদলেছে সমাজ, বদলেছে পারিবারিক কাঠামোও। কিন্তু বিনন্দপুরের রুদ্রপাল পরিবার এখনও ধরে রেখেছে একসঙ্গে থাকার সেই পুরোনো সংস্কৃতি। আশি বছর পেরিয়ে গেলেও উঠান, পুকুর, গাছপালা আর সেই মাটির রান্নাঘর আজও সাক্ষী হয়ে আছে একটি বিরল পারিবারিক ঐক্যের।
প্রতিদিন সন্ধ্যায় যখন রান্নাঘরের চুলায় আগুন জ্বলে ওঠে, তখন সেই ধোঁয়ার সঙ্গে যেন ভেসে ওঠে আশি বছরের এক গল্প—এক চুলা, পঞ্চাশ মুখ আর অটুট এক সংসারের গল্প।
—জা. অর্থনীতি/এনজে
