যেভাবে শুরু ফুটবল ও বিশ্বকাপের রোমাঞ্চকর যাত্রা
ছবি সংগৃহীত

ইশতিয়াক ইফতি: আজকের পৃথিবীতে ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, এটি আবেগ, সংস্কৃতি এবং বৈশ্বিক ঐক্যের প্রতীক। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের হৃদস্পন্দনের সঙ্গে মিশে আছে এই খেলা। তবে আধুনিক ফুটবলের এই অবস্থানে পৌঁছানোর পেছনে রয়েছে হাজার বছরের দীর্ঘ ইতিহাস, নানা সভ্যতার অবদান এবং অসংখ্য পরিবর্তনের গল্প।

ফুটবলের উৎপত্তি নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। বিভিন্ন সময় বিশ্বের নানা সভ্যতায় বল দিয়ে পা ব্যবহার করে খেলার প্রচলন ছিল। প্রাচীন মিসর, পারস্য, ব্যবিলন, গ্রিস ও চীনে ভিন্ন ভিন্ন নামে এমন খেলার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। যদিও আধুনিক ফুটবলের বিকাশ ঘটেছে ইংল্যান্ডে, তবু এর শিকড় ছড়িয়ে আছে বহু প্রাচীন সভ্যতায়।

ধারণা করা হয়, খ্রিষ্টপূর্ব ৩৫০ অব্দের দিকে প্রাচীন গ্রিক ও রোমানরা বল দিয়ে বিভিন্ন ধরনের খেলা খেলত। এর মধ্যে কিছু খেলায় পায়ের ব্যবহার ছিল। গ্রিক নাট্যকার অ্যান্টিফিনহাস এবং আলেকজান্দ্রিয়া তাদের লেখায় বল খেলার উল্লেখ করেছিলেন। সেই সময়ের ‘ইপিসকোরস’ নামের খেলাটিকে অনেকেই ফুটবলের আদি রূপ মনে করেন। চামড়ার থলের ভেতর বাতাস ভরে তৈরি করা হতো বল, যা দেখতে ছিল বেলুনের মতো। পরে রোমানদের ‘হারপাসটাম’ খেলাও এই গ্রিক খেলার প্রভাবেই গড়ে ওঠে।

তবে ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন অধ্যায়টি রচিত হয় চীনে। ফিফা প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলের প্রাচীনতম রূপ হিসেবে চীনের ‘কুজু’ খেলাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় ও দ্বিতীয় শতকে চীনা সেনাবাহিনীর সামরিক প্রশিক্ষণের অংশ ছিল এই খেলা। ‘কুজু’ শব্দের অর্থই হলো পা দিয়ে বলে আঘাত করা। সিল্কের কাপড় দিয়ে তৈরি ছোট একটি জালে বল প্রবেশ করানো ছিল এই খেলার মূল লক্ষ্য। হ্যান সাম্রাজ্যের সময়ে কুজুর নিয়ম-কানুন আরও সুসংগঠিত হয়।

চীন থেকে এই খেলা ছড়িয়ে পড়ে কোরিয়া ও জাপানে। জাপানে এর নাম ছিল ‘কেমারি’। কয়েকজন খেলোয়াড় বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে বলকে মাটিতে পড়তে না দিয়ে লাথি মারতেন। কোরিয়ায় একই ধরনের খেলার নাম ছিল ‘চুক-গুক’। পৃথিবীর অন্য প্রান্তেও ফুটবল সদৃশ খেলার প্রচলন ছিল। গ্রিনল্যান্ডের ইনুট জনগোষ্ঠী, অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী এবং নিউজিল্যান্ডের মাওরিদের মধ্যেও বল নিয়ে পায়ে খেলার বিভিন্ন রূপ দেখা যায়।

আধুনিক ফুটবলের ভিত্তি তৈরি হয় ইংল্যান্ডে। মধ্যযুগে সেখানে ‘মব ফুটবল’ নামে এক ধরনের খেলা জনপ্রিয় ছিল। এই খেলায় খেলোয়াড়ের সংখ্যা নির্দিষ্ট থাকত না। একেকটি গ্রাম বা শহরের মানুষ দল বেঁধে বলকে শক্তি প্রয়োগ করে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করত। সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসবেও এই খেলা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল।

পরবর্তীকালে ইংরেজ ক্রীড়াবিদ জে সি থ্রিং ফুটবলের প্রথম দিককার নিয়ম তৈরি করেন। এর পর ১৮৪৮ সালে কেমব্রিজে ফুটবল খেলোয়াড়দের এক সভায় নতুন বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়। যদিও তখনও খেলোয়াড় সংখ্যা নির্দিষ্ট ছিল না। ১৮৭০ সালে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, প্রতিটি দলে গোলরক্ষকসহ ১১ জন খেলোয়াড় থাকবে। এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই মূলত আধুনিক ফুটবলের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।

১৮৭২ সালে ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডের মধ্যকার ম্যাচটিকে প্রথম স্বীকৃত আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচ হিসেবে ধরা হয়। ম্যাচটি গোলশূন্য ড্র হয়েছিল। এর পর ধীরে ধীরে ফুটবলে যুক্ত হতে থাকে নতুন নিয়ম। ১৮৭৫ সালে গোল পোস্টে আড়ার ব্যবহার শুরু হয়। ১৮৭৭ সালে খেলার সময় নির্ধারণ করা হয় ৯০ মিনিট। ১৮৯০ সালে প্রথম গোলজাল ব্যবহার করা হয় এবং ১৮৯১ সালে চালু হয় পেনাল্টি কিক।

বিশ্বব্যাপী ফুটবলকে সংগঠিত রূপ দেয় ফিফা। ১৯০৪ সালের ২১ মে প্রতিষ্ঠিত হয় এই সংস্থা। প্রথমদিকে অলিম্পিকে ফুটবল প্রদর্শনী খেলা হিসেবে থাকলেও ১৯০৮ সালের অলিম্পিকে এটি আনুষ্ঠানিক খেলার মর্যাদা পায়। তখন কেবল অপেশাদার খেলোয়াড়রাই অংশ নিতে পারতেন।

বিশ্বকাপ ফুটবলের ধারণা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে। ১৯০৯ সালে স্যার থমাস লিপটনের উদ্যোগে বিভিন্ন দেশের ক্লাব নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হয়। অনেকে এটিকেই বিশ্বকাপের প্রাথমিক রূপ মনে করেন। তবে আলাদা বৈশ্বিক টুর্নামেন্ট আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয় ফিফা ১৯২৮ সালে।

অবশেষে ১৯৩০ সালে ইতিহাসের প্রথম ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পায় উরুগুয়ে। ১৩ জুলাই শুরু হওয়া সেই আসরে চ্যাম্পিয়নও হয় স্বাগতিক উরুগুয়ে। বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম গোলটি করেছিলেন লুসিয়েন লরাঁ, মেক্সিকোর বিপক্ষে। সেই শুরু, এরপর ফুটবল বিশ্বকাপ হয়ে ওঠে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়া আয়োজনগুলোর একটি।

সময়ের সঙ্গে ফুটবল বদলেছে, বদলেছে নিয়ম ও প্রযুক্তি। জার্সিতে নম্বর সংযোজন, খেলোয়াড়ের নাম লেখা, বুটের ব্যবহার-সব মিলিয়ে ফুটবল আজ আধুনিকতার চূড়ায় পৌঁছেছে। অথচ এর শিকড় লুকিয়ে আছে হাজার বছরের পুরোনো সভ্যতার ইতিহাসে। কুজু, কেমারি কিংবা মব ফুটবল পেরিয়ে আজকের বিশ্বকাপ তাই শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়, মানবসভ্যতার সাংস্কৃতিক বিবর্তনেরও এক অনন্য দলিল।

একনজরে-

# ফিফা চীনের ‘কুজু’কে ফুটবলের প্রাচীনতম রূপ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

# প্রাচীন গ্রিস ও রোমে ‘ইপিসকোরস’ ও ‘হারপাসটাম’ নামে বল খেলার প্রচলন ছিল।

# আধুনিক ফুটবলের বিকাশ ঘটেছে ইংল্যান্ডে।

# ১৮৭০ সালে প্রতি দলে ১১ জন খেলোয়াড় রাখার নিয়ম চালু হয়।

# ১৮৭২ সালে ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ড ম্যাচকে প্রথম আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচ।

# ১৮৯১ সালে প্রথমবারের মতো পেনাল্টি কিক চালু হয়।

# ফিফা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯০৪ সালের ২১ মে।

# ১৯০৮ সালের অলিম্পিকে ফুটবল প্রথম আনুষ্ঠানিক খেলার মর্যাদা পায়।

# প্রথম ফুটবল বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে।

# প্রথম বিশ্বকাপের প্রথম গোল করেন লুসিয়েন লরাঁ।

# ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে।

# ২০২৬ বিশ্বকাপ হবে ইতিহাসের ২৩তম আসর