আরিফুল হক বিজয়: প্রায় ১০০ বছরের ইতিহাসে ফিফা বিশ্বকাপ এমন সব ফলাফল উপহার দিয়েছে, যা কাঁপিয়ে দিয়েছে পুরো পৃথিবীকে। কোথাও ভেঙে গেছে কোটি সমর্থকের হৃদয়, কোথাও আবার জন্ম নিয়েছে অসম্ভবকে সম্ভব করা এক নতুন কিংবদন্তি। ফুটবলের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্যই হলো এর অনিশ্চয়তা। আর বিশ্বকাপের মঞ্চ যেন বারবার সেই অনিশ্চয়তারই সবচেয়ে নাটকীয় রূপ দেখিয়েছে। কখনও ডেভিড হারিয়েছে গোলিয়াথকে, কখনও আবার ফুটবল পরাশক্তির পতনে স্তব্ধ হয়ে গেছে পুরো বিশ্ব। দেখে নেওয়া যাক বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য ১০টি অঘটনের গল্প—
পূর্ব জার্মানি ১-০ পশ্চিম জার্মানি (১৯৭৪)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিভক্ত জার্মানির দুই অংশের একমাত্র আন্তর্জাতিক লড়াই ছিল এটি। ইউরো চ্যাম্পিয়ন পশ্চিম জার্মানি ছিল স্পষ্ট ফেবারিট। ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার ও গার্ড মুলারের মতো তারকায় ভরা দলটিকে হারানোর কথা কেউ কল্পনাও করেনি। কিন্তু ৭৮ মিনিটে ইয়ুর্গেন স্পারভাসারের গোল ইতিহাস বদলে দেয়। পূর্ব জার্মানি জিতে নেয় অবিশ্বাস্য এক ম্যাচ। যদিও পরে এই হারই পশ্চিম জার্মানিকে তুলনামূলক সহজ পথে ফাইনালে পৌঁছাতে সাহায্য করে এবং শেষ পর্যন্ত তারা বিশ্বকাপও জেতে।
আর্জেন্টিনা ১-২ সৌদি আরব (২০২২)
কাতার বিশ্বকাপে ৩৬ ম্যাচ অপরাজিত থেকে এসেছিল লিওনেল স্কালোনির আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম দাবিদার ছিল তারা। লিওনেল মেসির পেনাল্টি গোলে শুরুতে এগিয়েও যায় আলবিসেলেস্তেরা। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই সব ওলটপালট হয়ে যায়। সালেহ আল-শেহরি সমতা ফেরানোর পর সালেম আল-দাওসারির দুর্দান্ত বাঁকানো শট স্তব্ধ করে দেয় পুরো ফুটবল বিশ্বকে। বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটন ঘটিয়ে সৌদি আরব জিতে নেয় ২-১ ব্যবধানে।
স্পেন ১-৫ নেদারল্যান্ডস (২০১৪)
২০১০ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন এসেছিল নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে। জাভি-ইনিয়েস্তাদের টিকি-টাকা ফুটবল তখনও ছিল বিশ্ব ফুটবলের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। জাবি আলোনসোর পেনাল্টি গোলে এগিয়েও গিয়েছিল স্পেন। কিন্তু এরপর শুরু হয় ডাচ ঝড়। রবিন ফন পার্সির সেই বিখ্যাত ‘ফ্লাইং হেডার’ বদলে দেয় ম্যাচের গতিপথ। আরিয়েন রোবেনের গতির সামনে অসহায় দেখায় স্প্যানিশ ডিফেন্সকে। শেষ পর্যন্ত ৫-১ গোলের অপমানজনক হার বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিদায়ের ঘণ্টা বাজিয়ে দেয়।
ইতালি ০-১ উত্তর কোরিয়া (১৯৬৬)
বিশ্বকাপে নিজেদের হারানো গৌরব ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন দেখছিল ইতালি। কিন্তু ইংল্যান্ডের মাটিতে ঘটে যায় মহাবিপর্যয়। কোয়ার্টার ফাইনালে যেতে ইতালির প্রয়োজন ছিল শুধু একটি ড্র। প্রতিপক্ষ বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়া উত্তর কোরিয়া। কিন্তু পাক দুয়েকের গোল ইতালিকে স্তব্ধ করে দেয়। বদলি খেলোয়াড় ব্যবস্থার আগের যুগে ইনজুরির কারণে ১০ জন নিয়ে খেলতে হওয়া ইতালি আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। বিশ্ব ফুটবল অবাক হয়ে দেখেছিল এশিয়ার এক দেশের অবিশ্বাস্য জয়।
পশ্চিম জার্মানি ৩-২ হাঙ্গেরি (১৯৫৪)
‘মিরাকল অব বার্ন’ নামে ইতিহাসে অমর হয়ে আছে এই ম্যাচ। চার বছর ধরে অপরাজিত ছিল হাঙ্গেরি। ফেরেঞ্চ পুসকাসদের সেই দলকে অনেকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা দল মনে করেন। ফাইনালের প্রথম আট মিনিটেই ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে গিয়েছিল হাঙ্গেরি। মনে হচ্ছিল আরেকটি সহজ জয় অপেক্ষা করছে। কিন্তু অসম্ভব এক প্রত্যাবর্তনে ম্যাচে ফেরে পশ্চিম জার্মানি। শেষ পর্যন্ত ৩-২ জিতে বিশ্বকাপ ছিনিয়ে নেয় তারা। এই জয় যুদ্ধ-পরবর্তী জার্মান সমাজে নতুন আত্মবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছিল।
আর্জেন্টিনা ০-১ ক্যামেরুন (১৯৯০)
বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা যখন ইতালিয়া ১৯৯০ শুরু করছিল, তখন কেউ ভাবেনি ক্যামেরুন তাদের হারাতে পারে। ডিয়েগো ম্যারাডোনার দল ছিল স্পষ্ট ফেবারিট। কিন্তু আফ্রিকার দলটি অবিশ্বাস্য শারীরিক ও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেছিল। ফ্রাঁসোয়া ওমাম-বিয়িকের হেড গোলরক্ষক নেরি পাম্পিদোর হাত ফসকে জালে ঢুকে গেলে ইতিহাস গড়ে ক্যামেরুন। শেষ পর্যন্ত কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছে প্রমাণ করে, এটি কোনো দুর্ঘটনা ছিল না।
ফ্রান্স ০-১ সেনেগাল (২০০২)
১৯৯৮ বিশ্বকাপ ও ইউরো ২০০০ জয়ী ফ্রান্স ছিল বিশ্বের সেরা দল। অন্যদিকে সেনেগালের এটি ছিল প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচ। তবুও ভয়ডরহীন ফুটবল খেলেছিল আফ্রিকার দলটি। জিনেদিন জিদান ইনজুরিতে না থাকায় কিছুটা ছন্দহীন ছিল ফরাসিরা। ৩০ মিনিটে পাপা বুবা দিওপের গোল স্তব্ধ করে দেয় বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের। বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় অঘটন উপহার দেয় সেনেগাল।
ইংল্যান্ড ০-১ যুক্তরাষ্ট্র (১৯৫০)
ফুটবলের জন্মদাতা ইংল্যান্ড নিজেদের বিশ্বের সেরা দল ভাবত। তাদের প্রতিপক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের দলে ছিল আধা-পেশাদার ফুটবলারও। কিন্তু অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসই কাল হয়ে দাঁড়ায় ইংল্যান্ডের জন্য। জো গায়েটজেন্সের হেডে এগিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র। এরপর অসংখ্য সুযোগ পেয়েও গোল করতে পারেনি ইংল্যান্ড। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এটিকে অনেকেই সবচেয়ে বিস্ময়কর ফলাফলগুলোর একটি মনে করেন।
ব্রাজিল ১-২ উরুগুয়ে (১৯৫০)
‘মারাকানাজো’—একটি শব্দ, যা আজও ব্রাজিলিয়ান ফুটবলে দুঃস্বপ্ন হয়ে আছে। মারাকানা স্টেডিয়ামে প্রায় দুই লাখ দর্শক অপেক্ষা করছিল ব্রাজিলের শিরোপা উৎসব দেখার জন্য। ড্র করলেই বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হতো সেলেসাওরা। কিন্তু উরুগুয়ে ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটন ঘটায়। দ্বিতীয়ার্ধে ঘুরে দাঁড়িয়ে ২-১ জিতে নেয় ম্যাচ। শেষ বাঁশির পর পুরো ব্রাজিল নেমে যায় শোকের নীরবতায়। ব্রাজিলের ফুটবলের ইতিহাসে যা আজও অন্যতম ট্র্যাজেডি হিসেবেই খোদাই করা আছে।
ব্রাজিল ১-৭ জার্মানি (২০১৪)
বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য স্কোরলাইন। নিজেদের মাটিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে শিরোপার স্বপ্ন দেখছিল ব্রাজিল। নেইমার ছিলেন সেই স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু ইনজুরিতে সেমিফাইনালে তাকে ছাড়াই নামতে হয় সেলেসাওকে। জার্মানি সেই দুর্বলতাকে নির্মমভাবে কাজে লাগায়। মাত্র ২৯ মিনিটেই ৫-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় জার্মানরা। ব্রাজিলিয়ান সমর্থকেরা হতবাক হয়ে দেখছিল নিজেদের দলের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ পতন। মিরোস্লাভ ক্লোসে এই ম্যাচেই ভেঙেছিলেন রোনালদোর বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড। শেষ পর্যন্ত ৭-১ গোলের এই হার শুধু একটি ম্যাচ নয়, বরং ব্রাজিল ফুটবলের ইতিহাসে এক গভীর ক্ষতের নাম হয়ে আছে।