নেতা তৈরি হয়, নাকি জন্ম নেয়-এই বিতর্ক বহু পুরোনো! কেউ বিশ্বাস করেন নেতৃত্ব শেখানো যায়, আবার কেউ মনে করেন কিছু মানুষ জন্মগতভাবেই নেতা হয়ে পৃথিবীতে আসে। ড্যানিয়েল আলবার্তো প্যাসারেলাকে দেখলে দ্বিতীয় মতটিই সত্যি বলে মনে হয়। যেন জন্ম থেকেই তার জন্য লেখা ছিল নেতৃত্বের গল্প।
যারা তার সঙ্গে খেলেছেন কিংবা কাছ থেকে দেখেছেন, তারা প্রায় সবাই একবাক্যে স্বীকার করেছেন-প্যাসারেলা ছিলেন তাদের দেখা অন্যতম সেরা ফুটবল অধিনায়ক। মাঠে তার উপস্থিতি, আত্মবিশ্বাস, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আর দলের সবাইকে এক সুতোয় বেঁধে রাখার দক্ষতা তাকে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।
এমন একজন মানুষের হাতে বিশ্বকাপ ট্রফি না থাকলে হয়তো ইতিহাসই অসম্পূর্ণ থেকে যেত। সৌভাগ্যক্রমে সেই আফসোস নিয়ে তাকে অবসরে যেতে হয়নি। বরং আর্জেন্টিনার ইতিহাসে প্রথম বিশ্বকাপ ট্রফিটি এসেছিল তার হাত ধরেই।
১৯৭৮ সালের আগে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ইতিহাস ছিল হতাশা আর অপূর্ণতার গল্প। ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপেই ফাইনালে উঠেছিল তারা। কিন্তু এর পর দীর্ঘ সময় ধরে ব্যর্থতা পিছু ছাড়েনি। কখনও দেশের সেরা ফুটবলাররা অন্য দেশের নাগরিকত্ব নিয়ে খেলেছেন, কখনও ক্লাবের চাপে জাতীয় দলে খেলতে পারেননি, আবার কখনও রাজনৈতিক অস্থিরতা ফুটবলকে দুর্বল করে দিয়েছে।
এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে ১৯৭৮ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে নানা উদ্যোগ নেয় আর্জেন্টিনার সামরিক সরকার। নিজেদের মাটিতে বিশ্বকাপ আয়োজনের সুযোগও আসে। তবে শুধু স্বাগতিক সুবিধা দিয়ে সেই সাফল্য ব্যাখ্যা করলে সবচেয়ে বেশি অবমূল্যায়ন করা হবে প্যাসারেলার অবদানকেই।
সমকালীন অনেকের চোখে তিনি ছিলেন বিশ্বের সেরা ডিফেন্ডারদের একজন, আবার একইসঙ্গে একজন প্রকৃত নেতা। আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতানোর পেছনে তার পরিকল্পনা, নেতৃত্ব আর মানসিক দৃঢ়তার কথা আলাদা করে মনে রাখতে হয়।
প্যাসারেলার জন্ম ১৯৫৩ সালের ২৫ মে, আর্জেন্টিনার চাকাবুকোতে। উচ্চতা মাত্র ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি। কিন্তু মাঠে তার ব্যক্তিত্ব এতটাই বিশাল ছিল যে, উচ্চতার সীমাবদ্ধতা কখনও চোখে পড়েনি।
মাত্র ২০ বছর বয়সেই ক্লাব রিভার প্লেটের অধিনায়ক হয়ে যান তিনি। এত অল্প বয়সে এমন নেতৃত্ব দেখে দেশজুড়ে তার নতুন নাম হয়ে যায়—‘এল গ্রান ক্যাপতেন’, অর্থাৎ ‘দ্য গ্রেট ক্যাপ্টেন’। মাত্র ২৩ বছর বয়সে তার হাতে তুলে দেওয়া হয় আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের অধিনায়কত্ব।
তবে আন্তর্জাতিক মহলে প্যাসারেলা প্রথম আলোচনায় আসেন তার গোল করার অসাধারণ ক্ষমতার কারণে। পজিশনে তিনি ছিলেন ডিফেন্ডার, কিন্তু গোল করার সহজাত প্রবণতা ছিল অবিশ্বাস্য। বিশেষ করে স্পট কিক থেকে গোল করার দক্ষতা তাকে এনে দেয় আলাদা পরিচিতি।
এক সময় ক্লাব ফুটবলে সবচেয়ে বেশি গোল করা ডিফেন্ডার ছিলেন প্যাসারেলা। রিভার প্লেট, ফিওরেন্টিনা ও ইন্টার মিলানের হয়ে ৪৪৭ ম্যাচে করেছেন ১৪০ গোল। ইতালিয়ান সিরি আ’তে ফিওরেন্টিনা ও ইন্টার মিলানের হয়ে তার ৩৫ গোল এখনও কোনো ডিফেন্ডারের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত হয়।
জাতীয় দলেও সেই ধারাবাহিকতা ছিল। আর্জেন্টিনার হয়ে ৭০ ম্যাচে করেছেন ২২ গোল, যা অনেক স্ট্রাইকারের জন্যও ঈর্ষণীয়।
১৯৭৮ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার নেতৃত্বে ছিলেন এই গোলস্কোরিং ডিফেন্ডার। যদিও পুরো আসরে মারিও কেম্পেসের নৈপুণ্য সবচেয়ে বেশি আলো কাড়ে, তবু প্যাসারেলার অবদান ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণ। রক্ষণভাগে তিনি ছিলেন এক অদম্য প্রাচীর। পাশাপাশি মাঠে তার নেতৃত্ব আর গুরুত্বপূর্ণ সময়ে গোল করে দলকে বাঁচিয়ে তোলার ক্ষমতা আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে নিয়েছিল শিরোপার পথে।
শেষ পর্যন্ত ২৫ জুন বুয়েনস আয়ার্সে মাথার ওপরে বিশ্বকাপ ট্রফি তুলেছিলেন প্যাসারেলা। সফল হয়েছিল ‘দ্য গ্রেট ক্যাপ্টেন’-এর যাত্রা।
এই বিশ্বকাপ জয়ের পর জার্মান কিংবদন্তি ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারের সঙ্গে মিলিয়ে আর্জেন্টিনায় তাকে ‘এল কাইজার’ বলেও ডাকা শুরু হয়। অনেকে বিশ্বাস করেছিলেন, বেকেনবাওয়ারের মতোই আরও বড় ইতিহাস লিখবেন তিনি। বয়সও ছিল তার পক্ষে। মাত্র ২৫ বছর বয়সে বিশ্বকাপ জয় করেছিলেন।
১৯৮২ বিশ্বকাপেও খেলেছেন প্যাসারেলা। আরও অবাক করা তথ্য হলো, ১৯৮৬ বিশ্বকাপ জয়ী আর্জেন্টিনা দলেও তিনি ছিলেন। কিন্তু ডিয়েগো ম্যারাডোনা এবং কোচ কার্লোস বিলার্দোর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হওয়ায় মেক্সিকো বিশ্বকাপে একটি ম্যাচেও মাঠে নামতে পারেননি তখনকার ইনফর্ম মিলান তারকা। এ কষ্ট নিশ্চয়ই সহজে ভোলার মতো ছিল না।
তবে ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার পর কোচিংয়ে এসে নতুনভাবে নিজেকে প্রমাণের চেষ্টা করেন তিনি। প্রথমে পাঁচ বছর ছিলেন রিভার প্লেটের কোচ। এর পর ১৯৯৪ বিশ্বকাপের বিপর্যয়ের পর আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয় তার হাতে। ১৯৯৮ বিশ্বকাপ পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
যদিও বড় সাফল্য আসেনি, তবু নানা কারণে সে সময় আলোচনায় ছিলেন প্যাসারেলা। বিশেষ করে গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা ও হুয়ান সেবাস্তিয়ান ভেরনদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব ব্যাপক আলোচিত হয়। তিনি ফ্যাশন সচেতন খেলোয়াড়দের চুল ছোট রাখতে, দুল ও গহনা না পরতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। তার বিখ্যাত মন্তব্য ছিল—‘এটা জাতীয় দল, কোনো সোপ অপেরার জায়গা নয়।’
তার এই কঠোর ব্যক্তিত্ব হয়তো তাকে আরও বড় নায়ক বানিয়ে রাখত, যদি কোচ হিসেবেও একটি বিশ্বকাপ এনে দিতে পারতেন। কিন্তু ম্যারাডোনা-উত্তর আর্জেন্টিনা ১৯৯৮ বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় কোয়ার্টার ফাইনালে হেরে। ফলে ‘কাইজার’ হয়ে ওঠার স্বপ্ন পূর্ণতা পায়নি।
এর পর উরুগুয়েকে নিয়ে ২০০২ বিশ্বকাপে যাওয়ার সুযোগও পেয়েছিলেন। দলকে বাছাইপর্ব পার করালেও টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই ফেডারেশনের সঙ্গে দ্বন্দ্বে চাকরি ছেড়ে দেন। পরে পারমা, ব্রাজিলের করিন্থিয়ান্স এবং আবারও রিভার প্লেটের দায়িত্ব পালন করেন।
দীর্ঘ কোচিং ক্যারিয়ারে বড় কোনো শিরোপা না জিতলেও আর্জেন্টিনার মানুষ তাকে ভুলে যায়নি। ভুলে যাওয়ার কথাও নয়। কারণ আর্জেন্টিনার ইতিহাসে প্রথম বিশ্বকাপ এনে দেওয়া মানুষটির নাম ড্যানিয়েল প্যাসারেলা।
তিনি শুধু একজন ডিফেন্ডার নন, শুধু একজন অধিনায়কও নন। তিনি ছিলেন নেতৃত্বের প্রতীক। সত্যিকারের ‘দ্য গ্রেট ক্যাপ্টেন’।
একনজরে
পুরো নাম ড্যানিয়েল আলবার্তো প্যাসারেলা
জন্ম: ২৫ মে, ১৯৫৩
জন্মস্থান; চাকাবুকো দেশ: আর্জেন্টিনা
উচ্চতা: ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি
পজিশন ডিফেন্ডার
ক্লাব রিভার প্লেট, ফিওরেন্টিনা, ইন্টার মিলান
