ফ্রিটজ ওয়াল্টারের অবিশ্বাস্য গল্প
ফাইল ছবি

বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে কিছু গল্প আছে যা শুধুই খেলার গল্প নয়। সেগুলো হয়ে ওঠে বেঁচে থাকা, ফিরে আসা আর অসম্ভবকে জয় করার কাহিনি। ফ্রিটজ ওয়াল্টারের জীবন তেমনই এক গল্প। যে মানুষটি একসময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সৈনিক ছিলেন, যুদ্ধশেষে বন্দি হিসেবে কাটিয়েছেন অনিশ্চিত দিন- সেই মানুষই পরে নেতৃত্ব দিয়েছেন জার্মানির প্রথম বিশ্বকাপজয়ী দলকে। যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে ফুটবলের সবুজ মাঠে ইতিহাস লেখা এই কিংবদন্তির নাম তাই আজও জার্মান ফুটবলে শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়।

১৯২০ সালের ৩১ অক্টোবর জার্মানির কাইজারস্লটার্নে জন্ম ফ্রিটজ ওয়াল্টারের। ফুটবলের সঙ্গে তার সম্পর্ক যেন জন্ম থেকেই। বাবা কাজ করতেন কাইজারস্লটার্ন ফুটবল ক্লাবের রেস্টুরেন্টে। ছোটবেলার বেশিরভাগ সময়ই কেটেছে ক্লাবের আশপাশে। ফলে ফুটবলের প্রেমে পড়তে সময় লাগেনি। মাত্র আট বছর বয়সেই ক্লাবের যুব প্রোগ্রামে যোগ দেন তিনি।

অসাধারণ প্রতিভার কারণে খুব দ্রুতই নজরে চলে আসেন ওয়াল্টার। মাত্র ১৭ বছর বয়সে কাইজারস্লটার্নের মূল দলে অভিষেক হয় তার। তিন বছর পরই ডাক পান জাতীয় দলে। জার্মান কোচ সেপ হারবারজার তরুণ এই অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারকে দলে নিতে ভুল করেননি। ১৯৪০ সালে রোমানিয়ার বিপক্ষে জাতীয় দলের হয়ে প্রথম ম্যাচ খেলেন ওয়াল্টার। অভিষেক ম্যাচেই করেন হ্যাটট্রিক। তখনই বোঝা গিয়েছিল, জার্মান ফুটবল নতুন এক তারকার জন্ম পেয়েছে।

কিন্তু ফুটবলের সেই উড়ান থেমে যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতায়। ১৯৪২ সালে জার্মানির হয়ে যুদ্ধে যোগ দেন ফ্রিটজ ওয়াল্টার। যুদ্ধ শেষে ১৯৪৫ সালে তাকে যুদ্ধবন্দি হিসেবে নিয়ে যাওয়া হয় রাশিয়ায়। জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করতে হয় তখন। অনিশ্চয়তা, ভয় আর বন্দিদশার অন্ধকারে হারিয়ে যেতে পারতেন তিনি। কিন্তু ভাগ্য যেন অন্য গল্প লিখতে চেয়েছিল। অলৌকিকভাবে বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে ১৯৪৫ সালেই জার্মানিতে ফিরে আসেন ওয়াল্টার।

ফিরেই আবার যোগ দেন নিজের প্রিয় ক্লাব কাইজারস্লটার্নে। যুদ্ধবিধ্বস্ত জার্মানিতে ফুটবল তখন মানুষের নতুন আশার জায়গা। সেই আশার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন ওয়াল্টার। তার নেতৃত্বে ১৯৫১ থেকে ১৯৫৩ পর্যন্ত টানা তিনবার বুন্দেসলিগার শিরোপা জেতে কাইজারস্লটার্ন। দুর্দান্ত এই পারফরম্যান্সে আবারও জাতীয় দলের দরজা খুলে যায় তার জন্য। ১৯৫১ সালে অধিনায়ক হিসেবেই জার্মান দলে প্রত্যাবর্তন করেন তিনি।
১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপ ছিল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় আসর। সে সময় হাঙ্গেরিকে ধরা হতো বিশ্বের সেরা দল হিসেবে। ফেরেঙ্ক পুসকাসের নেতৃত্বে তারকাখচিত সেই দল গ্রুপ পর্বে জার্মানিকে ৮-৩ গোলে উড়িয়ে দিয়েছিল। সবাই ধরে নিয়েছিল, ফাইনালেও সহজেই জিতবে হাঙ্গেরি। কিন্তু ফুটবল কখনও কখনও অলৌকিক গল্পও লেখে।

ফাইনালে সব হিসাব বদলে দেয় জার্মানি। অধিনায়ক ফ্রিটজ ওয়াল্টারের নেতৃত্বে হাঙ্গেরিকে ৩-২ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জেতে জার্মানি। সেই ম্যাচে ওয়াল্টারের সঙ্গে খেলেছিলেন তার ভাই ওতমার ওয়াল্টারও। বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো ফাইনালে জয়ী দলের হয়ে দুই ভাই একসঙ্গে খেলেছিলেন সেবার।

১৯৫৮ সালে সুইডেনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপেও খেলেন ওয়াল্টার। তবে এরপর ইনজুরির কারণে ১৯৫৯ সালে ফুটবলকে বিদায় জানান তিনি। জাতীয় দলের হয়ে ১৯৪০ থেকে ১৯৫৮ পর্যন্ত খেলেছেন। এই সময়ে ৬১ ম্যাচে করেছেন ৩৩ গোল। ফরোয়ার্ড ও অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার—দুই ভূমিকাতেই ছিলেন সমান কার্যকর।

ফ্রিটজ ওয়াল্টারের জীবনের আরেকটি বড় স্বপ্ন ছিল নিজ শহর কাইজারস্লটার্নে বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখা। ১৯৭৪ সালে জার্মানিতে বিশ্বকাপ হলেও তার শহরে কোনো ম্যাচ হয়নি। তাই ২০০৬ সালের বিশ্বকাপের দিকে তাকিয়ে ছিলেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্নপূরণ হওয়ার আগেই ২০০২ সালের ১৭ জুন, ৮১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন এই কিংবদন্তি।

অদ্ভুত এক কাকতালীয় ঘটনা, তার মৃত্যুর পরদিনই কাইজারস্লটার্নে বিশ্বকাপের ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইতালি। সেই ম্যাচে ফ্রিটজ ওয়াল্টারের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। যেন পুরো ফুটবল বিশ্ব দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছিল সেই মানুষটিকে, যিনি যুদ্ধের ভয়াবহতা পেরিয়ে ফুটবলের মাঠে জার্মানির পুনর্জন্মের গল্প লিখেছিলেন।

একনজরে
নাম: ফ্রিটজ ওয়াল্টার
জন্ম: ৩১ অক্টোবর, ১৯২০; কাইজারয়টার্ন, জার্মানি 
মৃত্যু: ১৭ জুন, ২০০২
জাতীয় দলে: ১৯৪০-১৯৫৮ 
পজিশন : ফরোয়ার্ড/অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার 
ম্যাচ: ৬১ 
গোল: ৩৩