মাধ্যমিকে শিক্ষক নেই, শিক্ষার্থীও কমছে! (ভিডিও)
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: দেশের মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থায় বড় সংকট! সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের ছয় হাজারের বেশি পদ শূন্য। কোথাও একজন শিক্ষককে সামলাতে হচ্ছে ৫০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী। আবার বহু বিদ্যালয়ে নেই নিয়মিত প্রধান শিক্ষক। শিক্ষকসংকট, বিষয়ভিত্তিক পাঠদানের ঘাটতি আর শিক্ষার মান নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। এর মধ্যেই এক বছরে সাধারণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমেছে চার লাখেরও বেশি। কেন এমন পরিস্থিতি? কী বলছে সরকারি পরিসংখ্যান?

মাধ্যমিক শিক্ষার বাস্তব চিত্রটি সামনে এসেছে কয়েকটি বিদ্যালয়ের তথ্যেই।

 

পুরান ঢাকার পগোজ ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রায় এক হাজার ৬০০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন ৪৪ জন। অর্থাৎ প্রতি শিক্ষকের বিপরীতে শিক্ষার্থী প্রায় ৩৬ জন। বিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষকসংকট থাকায় কর্মরত শিক্ষকদের বাড়তি ক্লাস নিতে হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটিতে নিয়মিত প্রধান শিক্ষকও নেই।

অন্যদিকে, সদরঘাটের ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে প্রায় এক হাজার ৯৮০ শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষক মাত্র ৩৫ জন। বিদ্যালয়টির ৩৪টি শাখা পরিচালিত হয় প্রভাতি ও দিবা-দুই পালায়। এখানে প্রতি শিক্ষকের বিপরীতে শিক্ষার্থী প্রায় ৫৭ জন। পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় পাঠদান, রুটিন তৈরি এবং পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নেও সমস্যা হচ্ছে। কোনো কোনো শিক্ষককে সপ্তাহে নিতে হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০টি ক্লাস।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশের ৭০২টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের মোট পদ ১৬ হাজার ১৪১টি। এর মধ্যে কর্মরত আছেন ১০ হাজার ৯৩ জন। শূন্য রয়েছে ছয় হাজার ৪৮টি পদ, যা মোট পদের প্রায় ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ।

প্রধান শিক্ষকের ৫৭২টি পদের মধ্যে শূন্য ৩৭৯টি। আর সহকারী প্রধান শিক্ষকের ৭০২টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১৭৫ জন। অর্থাৎ এই পদে শূন্যতার হার প্রায় ৭৫ শতাংশ।

মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল জানিয়েছেন, পিএসসির মাধ্যমে নন-ক্যাডার পদে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার কারণে শিক্ষক নিয়োগ ব্যাহত হচ্ছে। বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে তুলে ধরা হয়েছে।

শুধু শিক্ষকসংকট নয়, নিয়মিত প্রধান শিক্ষক না থাকার সমস্যাও বিস্তৃত। ব্যানবেইসের ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাধ্যমিক স্তরের ২০ হাজার ৭৬৭টি বিদ্যালয়ের মধ্যে তিন হাজার ৫৯৩টিতে দায়িত্ব পালন করছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও ৬৩৪টির মধ্যে ২৭১টিতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রয়েছেন। তবে বিভিন্ন সরকারি সূত্রে বিদ্যালয়ের সংখ্যায় পার্থক্য রয়েছে।

বিষয়ভিত্তিক শিক্ষার ঘাটতিও উদ্বেগজনক। ব্যানবেইসের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইংরেজি পড়ান এমন ৯ হাজার ৯৮২ জন শিক্ষক স্নাতক পর্যায়ে ইংরেজি বিষয়ে পড়েননি। গণিত পড়ান এমন ১০ হাজার ১৬৯ জন শিক্ষকের স্নাতক পর্যায়ের বিষয়ও গণিত নয়। এ ছাড়া প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষকের বিএড, এমএড বা বিপিএডের মতো পেশাগত প্রশিক্ষণ নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে, সাধারণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীও কমছে। ২০২৪ সালে শিক্ষার্থী ছিল ৭৮ লাখ ৪৭ হাজার ৫৪৬ জন। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭৪ লাখ ৩৯ হাজার ৩৯ জনে। এক বছরে কমেছে চার লাখ আট হাজার ৫০৭ জন, প্রায় ৫ দশমিক ২ শতাংশ। অথচ বিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে ৯৪টি।

অন্যদিকে, একই সময়ে দাখিল থেকে কামিল পর্যায়ের মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী বেড়েছে ৪৩ হাজারের বেশি। ইংরেজি মাধ্যমেও শিক্ষার্থী বেড়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিনুর রশিদের মতে, শিক্ষক নিয়োগে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিশ্চিত করা, উপযুক্ত বেতনকাঠামো এবং জবাবদিহি জরুরি। সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমা, প্রাইভেট পড়ার ওপর নির্ভরতা এবং শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধিও অভিভাবকদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে-শূন্য পদ পূরণ, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ এবং মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ কবে নেওয়া হবে? কারণ, শিক্ষকসংকটের সমাধান ছাড়া মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন বড় চ্যালেঞ্জ হয়েই থাকবে।  

—জা. অর্থনীতি/এলএটি