কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি: কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের দানবাক্সের তহবিলে বর্তমানে মোট ১১৪ কোটি ১৩ লাখ ৭ হাজার ৩৫২ টাকা জমা রয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক ও পাগলা মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি সোহানা নাসরিন।
পাগলা মসজিদের ১৩টি দানবাক্স শনিবার (২৭ জুন) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে খোলার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এ তথ্য জানান।
জেলা প্রশাসক বলেন, দেশ-বিদেশে অবস্থানরত অসংখ্য ধর্মপ্রাণ মুসল্লি ও দাতাদের অনুদান সহজে গ্রহণের লক্ষ্যে পাগলা মসজিদের নিজস্ব ওয়েবসাইট চালু করা হয়েছে। এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে অনলাইনে এবং মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে নিরাপদ ও সহজ উপায়ে দান পাঠানো যাচ্ছে।
তিনি আরও জানান, সম্প্রতি ওয়েবসাইটের বাংলা সংস্করণও চালু করা হয়েছে। এ পর্যন্ত অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ২৪ লাখ ৭৬ হাজার ৮৮২ টাকা অনুদান এসেছে। ডিজিটাল মাধ্যমে অনুদানের এই প্রবণতা প্রযুক্তিনির্ভর দান কার্যক্রমে মানুষের আগ্রহ বৃদ্ধিরই প্রমাণ।
এদিকে কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের ১৩ টি দানবাক্স গুলি ৬ মাস পর খুলে এবার রেকর্ড ৪৩ বস্তা ভর্তি টাকা পাওয়া গেছে। সাথে পাওয়া গেছে বৈদেশিক মুদ্রা ও সোনার গয়না। এখন চলছে গণনার কাজ। গণনায় অংশ নিয়েছেন প্রায় ৩৫০ জনের একটি দল।
এর আগে শনিবার (২৭ জুন) সকাল সাড়ে ৭টায় ৬ মাস ১৩ দিন পর এ দানবাক্সগুলো খোলা হয়।
কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও পাগলা মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি সোহানা নাসরিন ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুস সাকিব খানের উপস্থিতিতে দানবাক্সগুলো খোলা হয়। এছাড়াও পাগলা মসজিদ কমিটির সদস্য সচিব ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কামরুল হাসান মারুফ সহ এ সময় বিপুল সংখ্যক পুলিশ, র্যাব ও আনসার সদস্য উপস্থিত ছিলেন।
পাগলা মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন জানান, কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদ ও ইসলামিক কমপ্লেক্সের ১০টি স্থায়ী সিন্দুক এবং ৩টি অস্থায়ী ট্রাংক দানবাক্স হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ৬ মাস পর শনিবার সকাল ৭টায় সিন্দুকগুলো খোলা হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর দানবাক্স খুলে ১১ কোটি ৭৮ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩৮ টাকা পাওয়া যায়, যা রূপালী ব্যাংকে পাগলা মসজিদের হিসাবে জমা করা হয়। এছাড়া উদ্ধার হওয়া স্বর্ণ, রৌপ্য ও বৈদেশিক মুদ্রা সিলগালা করে জেলা ট্রেজারিতে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
তিনি জানান, বর্তমানে পাগলা মসজিদের তহবিলে মোট ১১৪ কোটি ১৩ লাখ ৭ হাজার ৩৫২ টাকা জমা রয়েছে। অনলাইনে দান গ্রহণের জন্য www.paglamosque.org ওয়েবসাইট চালু করা হয়েছে এবং এর বাংলা সংস্করণও চালু রয়েছে। এ পর্যন্ত অনলাইনের মাধ্যমে ২৪ লাখ ৭৬ হাজার ৮৮২ টাকা অনুদান পাওয়া গেছে।
জেলা প্রশাসক বলেন, পাগলা মসজিদের আধুনিক ইসলামিক কমপ্লেক্স নির্মাণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এ লক্ষ্যে মসজিদ কমপ্লেক্স ও কবরস্থানের মধ্যবর্তী ৫৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ জমি মসজিদের নামে ক্রয় করা হয়েছে। বর্তমানে নান্দনিক নকশা প্রণয়নের কাজ চলছে। পাশাপাশি মুসল্লিদের সুবিধার্থে মসজিদের বাইরে পাবলিক টয়লেট নির্মাণের কাজও এগিয়ে চলছে।
তিনি জানান, পাগলা মসজিদের তহবিল থেকে কমপ্লেক্সের মাদ্রাসার ১৩০ জন এতিম ও অসহায় শিক্ষার্থীর লেখাপড়া ও ভরণপোষণের ব্যয় বহন করা হয়। এছাড়া ৩৫ জন কর্মচারী ও ১০ জন আনসার সদস্যের বেতন, মসজিদের বিদ্যুৎ বিল ও উন্নয়নমূলক ব্যয় মেটানো হয়। একই সঙ্গে তহবিলের লভ্যাংশ থেকে কিশোরগঞ্জ জেলার দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসা সহায়তাও প্রদান করা হয়।
তিনি আরও বলেন, দানবাক্সের টাকা গণনার কাজে জামিয়া ইমদাদিয়া মাদ্রাসার ৩০০ জন শিক্ষার্থী, পাগলা মসজিদ মাদ্রাসার ১০৬ জন শিক্ষার্থী, রূপালী ব্যাংকের ১৩০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী, পাগলা মসজিদের ৩৫ জন স্টাফ এবং জেলা প্রশাসনের ১৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী অংশ নিয়েছেন। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সভাপতিত্বে সাত সদস্যের একটি উপকমিটি পুরো কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
জেলা প্রশাসক জানান, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ১৩ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, ৪০ জন পুলিশ সদস্য, ৮ জন র্যাব সদস্য এবং ২০ জন আনসার সদস্য সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন।
মসজিদের খতিব, এলাকাবাসী ও দূর-দূরান্ত থেকে আসা লোকজন সূত্রে জানা যায়, এ মসজিদে মানত করলে মনের আশা পূর্ণ হয়। এমন ধারণা থেকে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই এ মসজিদে দান করে থাকেন।
মসজিদ পরিচালনা কমিটি সূত্রে জানা গেছে,শনিবার সকাল ৭ টার দিকে কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুস সাকিব খান,সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কামরুল হাসান মারুফ এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে মসজিদের ১৩ টি দানবাক্স খোলা হয়েছে। দানবাক্সগুলো খুলে ৪৩টি বস্তায় ভরে টাকাগুলো মসজিদের দোতলায় আনা হয়েছে গণনার জন্য। এখনো চলছে টাকা গণনার কাজ।
টাকা গণনার কাজে কিশোরগঞ্জের জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি), রূপালী ব্যাংকের সহকারী মহাব্যবস্থাপকসহ (এজিএম) মাদরাসার ২৫৭ জন ছাত্র, ব্যাংকের ৭০ জন স্টাফ, মসজিদ কমিটির ৩৪ জন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১০ জন সদস্য অংশ নিয়েছেন।
দানবাক্স খোলার সময় জেলা প্রশাসক ও পাগলা মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি সোহানা নাসরিন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুস সাকিব খান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো.ইশতিয়াক ইমন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ নাহিদ হাসনা খান, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. এরশাদুল আহমেদ, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কামরুল হাসান মারুফসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং মসজিদ পরিচালনা কমিটির প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
জনশ্রুতি আছে, এক সময় এক আধ্যাত্মিক পাগল সাধকের বাস ছিল কিশোরগঞ্জ পৌর শহরের হারুয়া ও রাকুয়াইল এলাকার মাঝ দিয়ে প্রবাহিত নরসুন্দা নদের মধ্যবর্তী স্থানে জেগে ওঠা উঁচু টিলাকৃতির স্থানটিতে। মুসলিম-হিন্দু নির্বিশেষে সব ধর্মের লোকজনের যাতায়াত ছিল ওই সাধকের আস্তানায়। পাগল সাধকের দেহাবসানের পর তার উপাসনালয়টিকে কামেল পাগল পীরের মসজিদ হিসেবে ব্যবহার শুরু করে এলাকাবাসী।
কিন্তু ওই সাধকের দেহাবসানের পর থেকে আশ্চর্যজনকভাবে এলাকা এমনকি দেশের দূর-দূরান্তের লোকজনের ভিড় বাড়তে থাকে। মানত কিংবা দান খয়রাত করলে মনোবাসনা পূরণ হয় এমন বিশ্বাস থেকে বিভিন্ন বয়সের হিন্দু-মুসলিমসহ বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণের নারী-পুরুষ মানত নিয়ে আসেন এ মসজিদে। তারা নগদ টাকা-পয়সা, স্বর্ণ ও রুপার অলঙ্কারের পাশাপাশি গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি এমনকি বৈদেশিক মুদ্রাও দান করেন।
বর্তমানে কিশোরগঞ্জ শহরের ঐতিহাসিক স্থাপনার মধ্যে পাগলা মসজিদ অন্যতম। শহরের পশ্চিমে হারুয়া এলাকায় নরসুন্দা নদীর তীরে মাত্র ১০ শতাংশ জমির ওপর মসজিদটি গড়ে উঠলেও বর্তমানে মসজিদ কমপ্লেক্সটি ৩ একর ৮৮ শতাংশ জায়গা আছে। এ মসজিদের পরিধির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে এর খ্যাতি ও ঐতিহাসিক মূল্য।
এরই মধ্যে দেশের অন্যতম আয়কারী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত মসজিদটিকে পাগলা মসজিদ ইসলামি কমপ্লেক্স নামকরণ করা হয়েছে। এছাড়া মসজিদের আয় থেকে বিভিন্ন সেবামূলক খাতে অর্থ সাহায্য করা হয়।
মসজিদের দান থেকে পাওয়া এসব অর্থ সংশ্লিষ্ট মসজিদসহ জেলার বিভিন্ন মসজিদ, মাদরাসা ও এতিমখানার পাশাপাশি বিভিন্ন সমাজকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় হয়। এছাড়া করোনাকালে রোগীদের সেবায় নিয়োজিত শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৮০ জন স্বেচ্ছাসেবককেও অনুদান দেওয়া হয়েছিল এ দানের টাকা থেকে।
পাগলা মসজিদ পরিচালনা কমিটি সূত্রে জানিয়েছে, ঐতিহ্যবাহী পাগলা মসজিদে আন্তর্জাতিক মানের দৃষ্টিনন্দন ইসলামিক কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দ্রুতই এর কাজ শুরু হবে। যার নামকরণ হবে পাগলা মসজিদ ইসলামিক কমপ্লেক্স। এটি নির্মাণে প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে ১১৫ কোটি টাকা। সেখানে ৩০ হাজার মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারবেন।
—জা. অর্থনীতি/এনজে