৮৯০০ মেগাওয়াটের নিচে নামে বিদ্যুৎ সরবরাহ

বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা: দেশের বেশ কয়েকটি বড় কয়লা ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেলা পৌনে ১টার দিকে গ্রিড বিপর্যয় নামে। এর আগে দুপুর ১২টায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ ছিল ১৩ হাজার ৯৪৩ মেগাওয়াট। যদিও সে সময় চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৮৯ মেগাওয়াট। তবে গ্রিড বিপর্যয়ের ১৫ মিনিট পর বেলা ১টায় বিদ্যুৎ সরবরাহ নামে ৮ হাজার ৯০০ মেগাওয়াটের নিচে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ সরবরাহ ৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি কমে যায়।

যদিও জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে আকস্মিক বিপর্যয় নিয়ে নানা রকম লুকোচুরি ছিল গতকাল সারা দিন। গ্রিড বিপর্যয় শুরুর পরই দুপুরে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। দুপুর ২টার পর বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে। যদিও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত (রাত ৮টা) পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। তবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) জানিয়েছে, রাত ১০টার মধ্যে পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে।

বিপিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম জাতীয় অর্থনীতিকে জানান, বন্ধ হয়ে যাওয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া চলছে এবং উৎপাদন ধীরে ধীরে বাড়ানো হচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে রাত ১০টার মধ্যে পরিস্থিতি একটি সহনশীল পর্যায়ে পৌঁছাবে। বেশ কয়েকটি ইউনিট ইতোমধ্যে উৎপাদনে ফিরেছে এবং কিছু কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনের দিকে এগোচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তিনি আরও জানান, গ্রিড বিপর্যয়ের সুনির্দিষ্ট কারিগরি কারণ এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। জাতীয় গ্রিড পরিচালনার দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত সঞ্চালন সংস্থা ‘পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি’ এটি তদন্ত করে জানাবে। গ্রিড পরিচালনাকারীরা বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে ব্যস্ত থাকায় দুপুর ৩টার পর আর প্রতি ঘণ্টার তথ্য হালনাগাদ করা সম্ভব হয়নি। তবে দুপুর ৩টায় বিদ্যুৎ উৎপাদন দাঁড়িয়েছিল ১০ হাজার ৮২৫ মেগাওয়াটে।

সূত্র জানায়, বেলা ১টায় বিদ্যুৎ সরবরাহ নামে ৮ হাজার ৮৯৯ মেগাওয়াটে। সে সময় চাহিদা ছিল ১৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। এ হিসাবে লোডশেডিং হওয়ার কথা ৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। যদিও লোডশেডিং কম দেখাতে সে সময় বিদ্যুতের চাহিদা দেখানো হয়েছে মাত্র ১০ হাজার ৮৮০ মেগাওয়াট। এতে সরকারি হিসাবে বেলা ১টায় লোডশেডিং ছিল ১ হাজার ৯৮১ মেগাওয়াট। বেলা ২টায় তা বেড়ে হয় ২ হাজার ৩৫৬ মেগাওয়াট। যদিও সে সময় লোডশেডিং ৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি ছিল।

বেলা ২টায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বেড়ে দাঁড়ায় ৯ হাজার ৩৮১ মেগাওয়াট। এর পর থেকে পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করে। বেলা ৩টায় উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ১০ হাজার ৫৪২ মেগাওয়াট। সে সময় লোডশেডিং হয় ৩ হাজার ৪৪৪ মেগাওয়াট। আর বেলা ৪টায় বিদ্যুৎ সরবরাহ আরও বেড়ে হয় ১১ হাজার ৩০২ মেগাওয়াট। সে সময় লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ১৫৪ মেগাওয়াট।

গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধস
গ্রিড বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ওপর। দুপুর ১২টায় এসব কেন্দ্র থেকে ৪ হাজার ৩৮২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হলেও দুপুর ১টায় তা নেমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৭৩৪ মেগাওয়াটে। ফলে উৎপাদন কমেছে ২ হাজার ৬৪৮ মেগাওয়াট বা প্রায় ৬০ দশমিক ৪ শতাংশ। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনেও বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। দুপুর ১২টায় কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ছিল ৪ হাজার ৮৬৩ মেগাওয়াট, যা এক ঘণ্টা পর কমে দাঁড়ায় ২ হাজার ৯৪৭ মেগাওয়াটে। এতে উৎপাদন হ্রাস পায় ১ হাজার ৯১৬ মেগাওয়াট বা প্রায় ৩৯ দশমিক ৪ শতাংশ।

এই দুই ধরনের জ্বালানিভিত্তিক কেন্দ্র থেকেই বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে ৪ হাজার ৫৬৪ মেগাওয়াট। বাকি ঘাটতি তৈরি হয়েছে অন্যান্য উৎস থেকে উৎপাদন হ্রাস পাওয়ায়। এক ঘণ্টার মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন ৫ হাজার ৩৭০ মেগাওয়াট কমে যাওয়া সামগ্রিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে দেখা দিয়েছে। ঠিক কী কারণে এমন বিপর্যয়ের সূত্রপাত হয়েছিল, তাৎক্ষণিকভাবে তা নিশ্চিত হওয়া না গেলেও উৎপাদনের ওপর এর সরাসরি বড় প্রভাব পড়েছে।

উৎপাদনে ফিরছে বিবিয়ানা-৩ ও আরএনপিএল ইউনিট-১
বিপিডিবি জানিয়েছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পুনরায় চালু করা এবং সেগুলোকে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে নেওয়ার কাজ চলছে। মো. জহুরুল ইসলাম জানান, বিদ্যুৎ উৎপাদন পুনরুদ্ধারে বিবিয়ানা-৩ এবং আরএনপিএল ইউনিট-১ উৎপাদনে ফেরার প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখছে।

বিপিডিবির এই কর্মকর্তা জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পর্যায়ক্রমে উৎপাদনে ফেরায় পরবর্তী ৪ থেকে ৫ ঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হবে। তবে ঠিক কতগুলো বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়েছিল কিংবা রাত ১০টার মধ্যে কোন কোন কেন্দ্র পুরোপুরি উৎপাদনে ফিরবে, সে বিষয়ে তিনি কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেননি। সঞ্চালন ব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখতে গ্রিড অপারেটরের সাথে সমন্বয় করে ধাপে ধাপে উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি জানিয়েছে, এই বিপর্যয়ের ফলে রাজধানীর পূর্বাঞ্চল— বিশেষ করে ভুলতা, হরিপুর, সিদ্ধিরগঞ্জ, গুলশান, রামপুরা, উলন ও মতিঝিল এলাকার আওতাধীন স্থানসমূহ এবং চট্টগ্রামের বিভিন্ন অংশে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

বিপিডিবি জানিয়েছে, এ ঘটনার পেছনে সুনির্দিষ্ট কী কারিগরি ত্রুটি ছিল তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি, তবে কারণ অনুসন্ধানে কাজ চলছে। বর্তমানে ন্যাশনাল লোড ডেসপ্যাচ সেন্টারের (এনএলডিসি) সরাসরি নিয়ন্ত্রণে প্রকৌশলীরা ধাপে ধাপে সঞ্চালন লাইন চালুর কাজ করে যাচ্ছেন।

উল্লেখ্য, মঙ্গলবার দুপুর আনুমানিক ১২টা ৪৩ মিনিটের দিকে জাতীয় গ্রিডে এ বিপর্যয়ের ঘটনাটি ঘটে।