রেকর্ড বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম: প্লাবিত নগর, পাহাড়ধসে দুই শিশুর মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক: টানা তিন দিনের ভারী বর্ষণের পর বৃষ্টি কিছুটা কমলেও কমেনি দুর্ভোগ। বরং জলাবদ্ধতা ও বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে চট্টগ্রামে। নগরের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি জেলার প্রায় সব উপজেলায় দেখা দিয়েছে বন্যা। পৃথক দুটি পাহাড়ধসের ঘটনায় দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। রেকর্ড বৃষ্টিপাতে সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে, শিক্ষা কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে এবং পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে বিভিন্ন এলাকায় সতর্কতা জারি রাখা হয়েছে।

বুধবার (০৮ জুলাই) সকাল পর্যন্ত নগরের চকবাজার, কাতালগঞ্জ, আগ্রাবাদ, হালিশহর, চান্দগাঁও, মোহরা, কুয়াইশ, অক্সিজেনসহ বিভিন্ন নিচু এলাকার সড়ক, অলিগলি, ভবনের নিচতলা ও দোকানপাট পানিতে তলিয়ে যায়। পানি ঢুকেছে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। অনেক পরিবারের রান্নাঘর ও চুলা ডুবে যাওয়ায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে।

নগরের বাইরে হাটহাজারী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, বোয়ালখালী, সাতকানিয়া, সীতাকুণ্ডসহ প্রায় সব উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সন্দ্বীপের সঙ্গে নৌযোগাযোগও প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

জলাবদ্ধতার কারণে কয়েকটি স্থানে মহাসড়ক ডুবে গেছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথের একটি অংশ পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। ষোলশহরে আটকে পড়া কক্সবাজারগামী একটি ট্রেনের যাত্রাও বাতিল করা হয়েছে।

দুর্যোগের কারণে বুধবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করেছে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড। পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা ও শ্রেণি কার্যক্রমও স্থগিত করেছে। এতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে।

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস জানায়, বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ২৩৭ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগে মঙ্গলবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৪১২ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়, যা গত ৪২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে ২০০৭ সালের ১১ জুন ৪০৮ মিলিমিটার এবং ১৯৮৩ সালের ৪ আগস্ট ৫১১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছিল।

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ বিশ্বজিৎ চৌধুরী জানান, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রয়েছে। একই সঙ্গে ভারী বর্ষণের কারণে জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকির সতর্কতাও জারি আছে।

এদিকে টানা বৃষ্টির মধ্যে পৃথক দুটি পাহাড়ধসের ঘটনায় দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বুধবার সকালে সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরের বাগানবাড়ি এলাকার ৬ নম্বর সমাজে পাহাড়ধসে ১০ মাস বয়সী আশরাফুল ইসলাম ওরফে তানভীর মারা যায়। একই ঘটনায় আহত হন তার মা লামিয়া আক্তার। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।

সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম জানান, কয়েকদিন ধরেই পাহাড়ধসের আশঙ্কায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং করে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হচ্ছিল। নিহত শিশুর পরিবারের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে ২৫ হাজার টাকার সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে নগরের চশমা হিলের মেয়র গলি এলাকায় দুপুরে পাহাড়ধসে চাপা পড়ে ১৩ বছর বয়সী সামিয়া ইসলামের মৃত্যু হয়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করেন।

দুর্যোগ মোকাবিলায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিস যৌথভাবে কাজ করছে। পাহাড়ধসপ্রবণ এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ বসতি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে যেতে নিয়মিত মাইকিং করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ১০১ সদস্যের একটি কুইক রেসপন্স টিম গঠন করেছেন। জলাবদ্ধতা নিরসনে বিভিন্ন স্থানে চসিক ও সিডিএর কর্মীরা পানি নিষ্কাশনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

অন্যদিকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রতিকূল আবহাওয়া সত্ত্বেও বুধবার পর্যন্ত বিমানবন্দরের সব অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে। কোনো ফ্লাইট বাতিল, বিলম্ব বা অন্যত্র অবতরণের ঘটনা ঘটেনি।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জলাবদ্ধতার ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে নগরবাসী তাদের দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরছেন। অনেকে জলাবদ্ধতা নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন ব্যক্তি ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রান্না করা খাবার ও শুকনো খাদ্য বিতরণ করে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে।

—জা.অর্থনীতি/আইবিএম