বঙ্গোপসাগরে কমছে মাছ, দেশে বাড়ছে ক্ষতির শঙ্কা (ভিডিও)
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: বঙ্গোপসাগরে মাছ আছে, কিন্তু সেই মাছ কি ক্রমেই কমে যাচ্ছে? দেশের মানুষের আমিষের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ এখন জলবায়ু পরিবর্তন ও অতিরিক্ত আহরণের চাপে। এর প্রভাব পড়তে পারে মানুষের পুষ্টি, জনস্বাস্থ্য এমনকি জাতীয় অর্থনীতিতেও। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক-এডিবির সতর্কতা, সামুদ্রিক খাবারনির্ভর পুষ্টির ক্ষতির কারণে বাংলাদেশের জিডিপির শূন্য দশমিক ২ শতাংশ পর্যন্ত অর্থনৈতিক ক্ষতির শঙ্কা রয়েছে।

দেশের মানুষের প্রাণিজ আমিষের চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ পূরণ করে মৎস্য খাত। গত পাঁচ বছরে সামগ্রিক মাছের উৎপাদন বাড়লেও সামুদ্রিক মাছের উৎপাদনে দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। জলবায়ু পরিবর্তন এবং অতিরিক্ত আহরণের কারণে কমছে সামুদ্রিক মাছের জোগান।

 

সম্প্রতি প্রকাশিত ‘এশিয়া-প্যাসিফিক ক্লাইমেট রিপোর্ট ২০২৬: কোস্টাল রিস্কস অন দ্য রাইজ—অ্যাকশনস ফর এ রেজিলিয়েন্ট ফিউচার’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব ঝুঁকির বিষয় তুলে ধরেছে এডিবি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে অণুপুষ্টি বা মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের চাহিদা পূরণে সামুদ্রিক খাবারের ওপর নির্ভরতা প্রায় ৯ শতাংশ। জলবায়ু পরিবর্তনের মাঝারি মাত্রার একটি ভবিষ্যৎ পরিস্থিতিতে সামুদ্রিক খাবারনির্ভর পুষ্টির ক্ষতি দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রায় শূন্য দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে।

এডিবির বিশ্লেষণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলঙ্কায় সামুদ্রিক খাবারনির্ভর পুষ্টির হার সবচেয়ে বেশি-৬০ শতাংশ। সেখানে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ক্ষতির শঙ্কা জিডিপির শূন্য দশমিক ৫৫ শতাংশ। ভারতে পুষ্টিনির্ভরতা ৩ থেকে ৪ শতাংশ এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির শঙ্কা শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ। পাকিস্তানে পুষ্টিনির্ভরতা ১ শতাংশ হলেও সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ক্ষতি শূন্য হিসেবে দেখানো হয়েছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মালয়েশিয়ায় সামুদ্রিক খাবারনির্ভর পুষ্টির হার ৪৪ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ায় ৪৩ শতাংশ, ফিলিপাইনে ৩৬ শতাংশ এবং থাইল্যান্ডে ৩৪ শতাংশ। এসব দেশে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ক্ষতির হার যথাক্রমে শূন্য দশমিক শূন্য ৫, শূন্য দশমিক ৩৭, শূন্য দশমিক ৩৭ এবং শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ। মিয়ানমারে পুষ্টিনির্ভরতা ২৭ শতাংশ হলেও প্রতিবেদনে অর্থনৈতিক ক্ষতির শঙ্কা শূন্য শতাংশ দেখানো হয়েছে।

এদিকে, মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে সামুদ্রিক মাছের উৎপাদনও ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে সর্বোচ্চ আহরণের পর পরবর্তী বছরগুলোতে উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সামুদ্রিক মৎস্য উৎপাদন নেমে এসেছে ৫ লাখ ৬৮ হাজার মেট্রিক টনে, যা গত পাঁচ অর্থবছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিকস বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী আহসান হাবীব মনে করেন, প্রায় ২০ কোটি মানুষের আমিষের চাহিদা পূরণে বঙ্গোপসাগরের মৎস্যসম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। তার মতে, ইঞ্জিনচালিত ও আর্টিশনাল নৌযানের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ মাছ আহরণ করা হলেও এসব নৌযানের সঠিক সংখ্যা এখনো নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।

তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগরকে অসীম সম্পদের উৎস ভাবার সুযোগ নেই। সমুদ্রে প্রতিবছর প্রকৃতপক্ষে কত মাছ উৎপাদিত হয় এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে কতটা আহরণ করা সম্ভব, তা নির্ধারণে মাছের মজুতের সঠিক হিসাব জরুরি।

সামুদ্রিক মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ার এই প্রবণতা তাই শুধু মৎস্য খাতের সমস্যা নয়; পুষ্টি, জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।  

—জা. অর্থনীতি/এলএটি