৬ বছরে উধাও ৬৫০ কোটি টাকা

পুঁজিবাজারে আপনার কষ্টার্জিত টাকা কি সত্যিই নিরাপদ? নাকি চোখের সামনেই ব্যাক অফিস সফটওয়্যারের আড়ালে গায়েব হয়ে যাচ্ছে আপনার পোর্টফোলিওর শেয়ার? গত ৬ বছরে এমনই এক ভয়াবহ জালিয়াতিতে ৪৫ হাজার বিনিয়োগকারীর সাড়ে ৬ শত কোটি টাকা উধাও হয়ে গেছে! কীভাবে ঘটল এই নজিরবিহীন অর্থ আত্মসাৎ?

২০১৯ থেকে ২০২৫- এই ৬টি বছর যেন শেয়ারবাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য ছিল এক নিঃশব্দ বিপর্যয়ের নাম। ব্রোকারেজ হাউসগুলোর অনিয়ম আর ভুয়া ব্যাক অফিস সফটওয়্যারের ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হয়েছেন বহু মানুষ।

অনিয়মের তালিকায় সবচেয়ে এগিয়ে মশিউর সিকিউরিটিজ, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে সর্বোচ্চ ১৬১ কোটি টাকা আত্মসাথের। পিছিয়ে নেই তামহা সিকিউরিটিজও, তাদের দখলে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা। এছাড়া শালতা ক্যাপিটাল ১০০ কোটি টাকার বেশি, ক্রস্ট সিকিউরিটিজ প্রায় ৮০ কোটি এবং ব্যাংকস সিকিউরিটিজ আত্মসাৎ করেছে ৬৬ কোটি টাকারও বেশি।

কৌশলটি ছিল খুবই নিখুঁত। ব্রোকারেজ হাউসগুলো ভুয়া ব্যাক অফিস সফটওয়্যার ব্যবহার করে সিডিবিএল-এ থাকা গ্রাহকের আসল মোবাইল নম্বর সরিয়ে নিজেদের নম্বর বসিয়ে দিত। এর ফলে শেয়ার কেনাবেচা হলেও আসল বিনিয়োগকারী কোনো এসএমএস বা আপডেট পেতেন না। উল্টো তাদের পাঠানো হতো ভুয়া স্টেটমেন্ট। আর পেছনে পেছনে গোপনে পোর্টফোলিওর শেয়ার বিক্রি করে সম্পূর্ণ টাকা পকেটে পুরত চক্রটি।

এই ভয়াবহ জালিয়াতি ঠেকাতে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ডিএসই ও সিএসসির সব ব্রোকারেজ হাউসকে বিএসইসি অনুমোদিত সফটওয়্যার চালুর কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তা বাস্তবায়ন হয়নি বললেই চলে।

ডিএসইর প্রতিবেদন বলছে, ২৮০টি ব্রোকারেজ হাউস নতুন সফটওয়্যার নিলেও এখনো কার্যক্রম শুরু করেনি। ২৪টি প্রতিষ্ঠান সরাসরি পুরনো সফটওয়্যারই চালিয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো- ১৩টি প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের দৈনিক পোর্টফোলিও পাঠায় না এবং ১২২টি ব্রোকারেজ হাউস লেনদেনের কোনো এসএমএস বা ইমেইলই দিচ্ছে না!

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যর্থতার কারণেই এই অনিয়ম থামানো যাচ্ছে না। শুরুতেই সব ব্রোকারেজ হাউসের ব্যাক অফিস কমপ্লায়েন্স যাচাই করা উচিত ছিল। বর্তমানে যেসব ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে, তার বাইরেও আরও অনেক ব্রোকারেজ হাউসে এমন ঘাটতি রয়েছে—যা অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি টাকা এনে সাময়িকভাবে ম্যানেজ করে রাখছেন।

যদি ব্রোকারেজ হাউসগুলো থেকে সঠিক তথ্য না পাওয়া যায় এবং এভাবে অর্থ আত্মসাৎ চলতে থাকে, তবে দেশের পুঁজিবাজারের ওপর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অবশিষ্ট আস্থাও পুরোপুরি শূন্যের কোঠায় গিয়ে ঠেকবে।

"৬ বছরে পুঁজিবাজার থেকে গায়েব সাড়ে ৬ শত কোটি টাকা! ভুয়া সফটওয়্যার ব্যবহার করে ৪৫ হাজার বিনিয়োগকারীকে নিঃস্ব করেছে একশ্রেণীর ব্রোকারেজ হাউস। সিডিবিএল-এ আপনার নম্বর বদলে পাঠাতো ভুয়া স্টেটমেন্ট, আর আড়ালে বিক্রি হয়ে যেত শেয়ার! মশিউর সিকিউরিটিজ, তামহা, শালতার মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর এই জালিয়াতিতে বাজারের আস্থা এখন তলানিতে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার কড়া নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও ১২২টি হাউস আজও দেয় না লেনদেনের কোনো মেসেজ!"