মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির চাপে বাড়ছে ডলারের দর। একই সঙ্গে রেমিট্যান্স কমে যাওয়া ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
মাত্র এক মাসে ব্যাংকগুলোর ডলার কেনার দাম প্রায় এক টাকা বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্যাংকগুলোর ট্রেজারি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী মে মাসে গড়ে প্রতি ডলার কেনা হয়েছিল ১২২ টাকা ৪৫ পয়সায়। জুনে তা ধাপে ধাপে বেড়ে এখন কয়েকটি ব্যাংক ১২৩ টাকা ৯০ থেকে ৯৫ পয়সা পর্যন্ত দামে ডলার কিনছে।"
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৯ দশমিক ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ ব্যয় ছিল ৪ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে এ খাতে আমদানি ব্যয় ৮৫ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। এর মধ্যে অপরিশোধিত (ক্রুড) পেট্রোলিয়াম আমদানিতে ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
আরও পড়ুন...
হঠাৎ ডলারের দাম বাড়ার নেপথ্য কী?
২০২৫-২৬ অর্থবছরে অপরিশোধিত তেল আমদানির ব্যয় প্রায় ৯৩ শতাংশ এবং পেট্রোলিয়াম ও লুব্রিক্যান্ট আমদানির ব্যয় ৮৪ শতাংশ বেড়েছে। যদিও শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও ভোগ্যপণ্যের আমদানি কমেছে, তবুও জ্বালানি আমদানি বেড়ে ১০ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ফলে জ্বালানি খাতে ডলারের চাহিদা বেড়ে বাজারে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে।
ডলারের বাজারে চাপ বাড়ার আরেকটি কারণ রেমিট্যান্স কমে যাওয়া। টানা ছয় মাস ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এলেও জুনে তা নেমে আসে ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে। রিজার্ভ এখনও ৩১ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার থাকলেও, ডলারের চাপ দীর্ঘস্থায়ী হলে তা ধরে রাখা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বিলাসপণ্য আমদানি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সরকারি ব্যয়েও কমানো প্রয়োজন।, ডলারের বাজারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে আইএমএফও। অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন ঋণ পেতে বাজারভিত্তিক বিনিময় হার বজায় রাখা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি হস্তক্ষেপ সীমিত রাখার শর্ত মানতে হতে পারে।"
আরও পড়ুন...
পে স্কেল কার্যকর হলে বকেয়া বেতন কীভাবে পাবেন?
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘বাংলাদেশের রিজার্ভ সীমিত। তাই বাজার নিয়ন্ত্রণে ডলার বিক্রি করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। বরং বর্তমান রিজার্ভ ধরে রাখাই উচিত। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে ডলারের ওপর চাপ বাড়লে বিনিময় হারকে বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দুই থেকে তিন টাকা পর্যন্ত অবমূল্যায়নের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।এছাড়া প্রয়োজনে নীতি সুদহার বৃদ্ধির কথাও ভাবা যেতে পারে বলে তিনি মনে করেন। যদিও গত বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়েছে।
ডলারের চাপ সামলাতে বিভিন্ন দেশ ভিন্ন কৌশল নিয়েছে। ভারত রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করলেও, মিসর ও পাকিস্তান বাজারভিত্তিক বিনিময় হার গ্রহণ করে মুদ্রার অবমূল্যায়নের পথ বেছে নিয়েছে। তবে ভারতের মতো বড় রিজার্ভ না থাকায় বাংলাদেশের জন্য একই কৌশল অনুসরণ করা সহজ নয়।
তাই ডলারের বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে বৈশ্বিক পরিস্থিতির উন্নতির পাশাপাশি কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপের দিকেই তাকিয়ে আছে দেশ।