শেরপুর প্রতিনিধি: ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে ৪ আগস্ট উত্তপ্ত শেরপুর জেলা শহরে প্রাণ হারান তিন কলেজ শিক্ষার্থী। আহত হন আরও অনেকে। এসব পরিবারের সদস্যদের আহাজারি আর বিচার প্রত্যাশা নিয়ে দুই বছর অতিবাহিত হলেও কোন মামলারই বিচার সম্পন্ন হয়নি। চার্জশিট দাখিল আর তদন্তেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে এসব মামলা।
নিহত ৩ জনের একজন গুলিবিদ্ধ হয়ে ও অপর ২ জন মারা যায় ম্যাজিস্ট্রেটের গাড়ি চাপায়।
গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু
শ্রীবরদী উপজেলার রূপাপাড়া গ্রামের এইচএসসি পরীক্ষার্থী সবুজ মিয়া (১৮) বাবার অসুস্থতার কারণে লেখাপড়ার পাশাপাশি ওষুধের দোকানে কাজ করে সংসার চালাতেন। ৪ আগস্ট বিকেলে শেরপুর শহরের কয়েক জায়গায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীরা জড়ো হোন। সবুজও সেদিন বন্ধুদের সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দিতে শহরে গিয়েছিল। খরমপুর-কলেজমোড় সড়কে বিপরীত দিক থেকে আসা আওয়ামী লীগের একাংশের মিছিল থেকে ছোড়া গুলি সবুজের মাথার ডান পাশে লাগলে মুহূর্তেই লুটিয়ে পড়েন তিনি। দ্রুত তাকে জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।
আরও পড়ুন: ছেলেকে হারিয়ে অন্ধকার জীবনে শহীদ মিরাজের মা
সবুজের মা সমেজা বেগম বলেন, দুই বছর ধইরা পোলা হারাইছি। কত জায়গায় গেলাম বিচার পাইলাম না। আমার স্বামীও অনেকদিন ধরে অসুস্থ, ছেলের মৃত্যুর পর থেকে অবস্থা আরও খারাপ। বর্তমানে অনেক মানসিক চাপে আছি।
এ সময় ছেলে হত্যার বিচার চেয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন তিনি।
ম্যজিস্ট্রেটের গাড়ি চাপায় মৃত্যু
৪ আগস্টই সবুজের মৃত্যুর আধা ঘণ্টা পর বিকেল সোয়া ৫টার দিকে খরমপুর সড়কে আবার মিছিল বের করেন ছাত্র-জনতা। মিছিলের পেছন দিক থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর যৌথ টহলের মধ্যে থাকা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে বহনকারী একটি গাড়ি চাপা দেয় কয়েকজন আন্দোলনকারীকে।
শেরপুর জেলা প্রশাসনের তৎকালীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তরিকুল ইসলাম শাকিলের নির্দেশে চালক হারুনুর রশীদ আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর দ্রুতগতিতে গাড়ি চালিয়ে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান সদর উপজেলার চৈতনখিলা এলাকার বাসিন্দা ও শেরপুর সরকারি কলেজের সম্মান প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী মাহবুব আলম (২১) এবং ঝিনাইগাতী উপজেলার পাইকুড়া-জড়াকুড়া এলাকার বাসিন্দা ও সেকান্দর আলী ডিগ্রি কলেজের সম্মান প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী শারদুল আশীষ সৌরভ (২১)। আহত হন আরও কয়েকজন।
অসুস্থ বাবার পাশে দাঁড়াতে ফ্রিল্যান্সিং করে সংসারের হাল ধরেছিলেন মাহবুব। একই কাজ করতেন সৌরভও।
মাহবুবের ভাই মাজাহারুল ইসলাম বলেন, ভাইয়ের কথা মনে হলে চোখের পানি ধরে রাখতে পারি না। আমার ভাই হত্যার প্রকৃত আসামিদের দ্রুত বিচার চাই আমরা।
আরও পড়ুন: জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার মাস্টারপ্ল্যান যেভাবে উল্টে দেয় জুলাই আন্দোলন
সৌরভের বাবা ছোরহাব আলী বলেন, ‘ছেলের কথা মনে হইলে ঠিক থাকবার পারি না। মামলা করছিলাম বিচারের আশায়, কোন অগ্রগতি দেহি না। পোলা হত্যার বিচার দেখতে দেখতে হয়তো আমিই কবরে চলে যামু।’
শেরপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসমা বিনতে রফিক দৈনিক জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, নিহত মাহবুবের পরিবারসহ জুলাই আন্দোলনে এই উপজেলার অন্যান্য আহত-নিহত পরিবারকে আমাদের পক্ষ থেকে সবসময় বিভিন্ন অনুদান ও সরকারি সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। তারা কোন সমস্যার কথা জানালে সাথে সাথে আমরা সমাধান করে দেওয়ার চেষ্টা করি। এছাড়া জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মাহবুব হত্যার বিচারের বিষয়টা আদালতে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
শ্রীবরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনীষা আহমেদ দৈনিক জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, আমরা নিহত সবুজ মিয়ার মা এবং তার পরিবারের নিয়মিত খোঁজ নিচ্ছি। সবুজ ছাড়াও অন্যান্য আহত-নিহত সকল পরিবারকে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা ও অনুদান দেওয়া হচ্ছে। জুলাই সংক্রান্ত বিভিন্ন কর্মসূচি আমরা তাদেরকে সাথে নিয়ে পালন করে থাকি।
আরও পড়ুন: জুলাইযোদ্ধা আজিজুরের রক্ত ঝরানোর গল্প শুনলেন প্রধানমন্ত্রী
জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতদের স্বজনরা শেরপুর সদর থানায় পৃথক ৩টি মামলা করেছিলেন। গেল বছরের ৩০ জুন পুলিশ ৫০৫ জনকে আসামি করে ৩ মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেয়। চার্জশিটে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক, ৪ সাবেক হুইপ ও এমপি, ৬ উপজেলা চেয়ারম্যান, চার মেয়র, একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও তার জিপচালকসহ অনেকের নাম রয়েছে।
এইসব হত্যা মামলার দ্রুত রায় ঘোষণা ও বাস্তবায়নের দাবি নিহতদের স্বজনদের এবং স্থানীয় সাধারণ মানুষের।
—জা.অর্থনীতি/এনজে
