ইবি প্রতিনিধি: কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ‘জুলাই-৩৬’ আবাসিক হলের এক ছাত্রীর বিরুদ্ধে সহপাঠী ও রুমমেটদের 'ব্যক্তিগত ছবি’ তুলে যুক্তরাজ্য প্রবাসী প্রেমিকের কাছে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত তোবাউল জান্নাতী ঐশী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। এই ঘটনায় অভিযুক্তকে আবাসিক হল থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে এবং তার ব্যবহৃত দুটি মোবাইল ফোন জব্দ করেছে প্রক্টরিয়াল বডি। পাশাপাশি ঘটনা তদন্তে ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে হল কর্তৃপক্ষ।
বৃহস্পতিবার (৭ জুলাই) মধ্যরাতে বিষয়টি জানাজানি হলে হলের অন্য ছাত্রীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়।
ভুক্তভোগী ও হল সূত্রের অভিযোগ, হলে অবস্থানরত ১৫ থেকে ২০ জন ছাত্রীর ব্যক্তিগত ও গোপন ছবি তাদের অজান্তে সংগ্রহ করে যুক্তরাজ্যের প্রবাসী প্রেমিক আবিদের কাছে পাঠাতেন ঐশী। সম্প্রতি প্রেমিকের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হলে ওই প্রবাসী ব্যক্তি ছবিগুলো ভুক্তভোগী কয়েকজন শিক্ষার্থীর কাছে পাঠিয়ে দেন।
অভিযোগকারী ও ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা জানান, এখন পর্যন্ত অন্তত ১৫ জন শিক্ষার্থীর ছবি শনাক্ত করা গেছে। ঘটনার পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণাদি তাদের কাছে রয়েছে, যা তদন্ত কমিটির কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে আরও শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
প্রশাসনের কাছে তাদের দাবি, যেসব মাধ্যমে এসব ছবি রয়েছে, সেসব উৎস থেকে দ্রুত সব ছবি অপসারণের উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত ছবি সংগ্রহ ও অন্যের কাছে পাঠানোর ঘটনায় দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় এনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র জানায়, ঐশী ওই প্রবাসী প্রেমিকের কাছ থেকে বিয়ে ও অন্যান্য প্রলোভনে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থীর সঙ্গেও সম্পর্কে জড়িত ছিলেন। সম্পর্কের এই অম্লমধুর টানাপোড়েন থেকেই প্রবাসী প্রেমিক ছবিগুলো ফাঁস করে দেন।
অভিযোগের সত্যতা কিছুটা স্বীকার করলেও আক্রোশের বিষয়টি অস্বীকার করে অভিযুক্ত ঐশী জানান, “ছবিগুলো অন্য একজনকে দেওয়া আমার ভুল হয়েছে এবং তাদের অভিযোগ করার পূর্ণ অধিকার আছে। তবে কোনো ব্যক্তিগত আক্রোশ, মানহানি বা ছবি বিক্রি করার মতো বাজে উদ্দেশ্যে আমি কাজটা করিনি। আবিদের সাথে সম্পর্কের শুরুতে আমার বান্ধবীদেরও উৎসাহ ও সম্মতি ছিল; ফেসবুকে তাদের নিয়মিত যোগাযোগও হতো।”
তিনি আরও দাবি করেন, “কোথায় আছি বা কী করছি বোঝাতে গিয়ে সামনে থাকা বান্ধবীদের ছবি তুলে পাঠিয়েছিলাম। এটি বেআইনি ও অনুচিত তা তখন অনুধাবন করতে পারিনি। পরবর্তীতে আবিদ দেশে এসে বিয়ের জন্য চাপ দিলে আমি পড়ালেখার জন্য তা প্রত্যাখ্যান করি। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে এবং অন্য সম্পর্কে জড়ানোর মিথ্যা সন্দেহ থেকে সে প্রতিশোধ নিতে বান্ধবীদের কাছে ঐ ছবিগুলো পাঠায়।”
আর্থিক লেনদেনের ব্যাখ্যায় ঐশী বলেন, “ওর কাছে কোনো টাকা দেওয়ার অনুরোধ কখনো করা হয়নি; সে যা দিয়েছে তা নিজের ইচ্ছাতেই উপহার হিসেবে দিয়েছিল। পরবর্তীতে সম্পর্ক খারাপ হওয়ায় সে টাকা খরচের মিথ্যা দাবি তুলছে।”
নিজের ভুল স্বীকার করে ঐশী বলেন, “আমার ভুলের জন্য যেকোনো শাস্তি বা হল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত আমি মেনে নেব। কিন্তু আক্রোশ থেকে ক্ষতির অভিযোগটি অতিরঞ্জিত। অন্য কোনো গোপন সম্পর্কের অভিযোগও সত্য নয়; প্রয়োজনে ফোন পরীক্ষা করা যেতে পারে। শিক্ষক ও প্রশাসনের কাছে বিনীত অনুরোধ- আমার অপরাধের বিচার হোক, কিন্তু এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে যেন আমার শিক্ষাজীবন ও ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দেওয়া না হয়।”
অন্যদিকে প্রবাসী প্রেমিকের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলে তিনি আর্থিক লেনদেনের কিছু নথিপত্র দেখিয়ে দাবি করেন, “ঐশী বিয়ের কথা বলে আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছে। যা চেয়েছে আমি তা-ই দিয়েছি এবং ক্যাম্পাসে এসেও দেখা করেছি। আমি ছবি পাঠাতে বলিনি, সে নিজ উদ্যোগেই তার খালাতো বোনসহ বিভিন্ন মেয়ের ছবি পাঠাতো।”
ঘটনার বিষয়ে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আরিফা আক্তার জানান, গঠিত তদন্ত কমিটির উপস্থিতিতে অভিযুক্তের দুটি মোবাইল ফোন হস্তান্তরিত হয়েছে। দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
‘জুলাই-৩৬’ হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. শামছুল হক ছিদ্দিকী বলেন, “মধ্যরাতে অভিযোগ পেয়েই বিষয়টি মাননীয় উপাচার্যকে জানানো হয়। প্রাপ্ত প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে ওই শিক্ষার্থীকে হল থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে এবং আগামী রোববার পর্যন্ত লিখিত অভিযোগ দেওয়ার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। ৭ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যার ভিত্তিতে চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহিনুজ্জামান জানান, হল প্রশাসন প্রাথমিক ব্যবস্থা হিসেবে বহিষ্কারের পদক্ষেপ নিয়েছে। তদন্তে ঘটনার সত্যতা ও ভয়াবহতা নিশ্চিত হওয়া গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
উল্লেখ্য, সংশ্লিষ্ট ঘটনায় তিন সদস্যের কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে অধ্যাপক ড. আরিফা আক্তার, সদস্য হিসেবে সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক ড. মোহা. খাইরুল ইসলাম ও সদস্য সচিব হিসেবে অধ্যাপক ড. মুহা. কামরুজ্জামানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি